ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

আসুন প্রকৃত মানুষ হই

মারুফ হোসেন
আসুন প্রকৃত মানুষ হই

দিন দিন সমাজে অমানবিকতা বেড়েই চলছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে অবক্ষয়। অবক্ষয় আর অনিয়মের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন আমরা হাঁপিয়ে উঠছি! একটার পর একটা অমানবিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা বিবেকবান মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। কয়েকদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল- ‘প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যা, মা-বাবা কারাগারে’। সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও বিশ্বাসের জায়গা হলো তার বাবা-মা। কিন্তু সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছলে- সেই বাবা-মাই হয়ে ওঠে তার সন্তানের হত্যাকারী! পত্রিকাগুলো যেন এসব অমানবিকতার চরম সাক্ষী হয়ে প্রতিদিন আমাদের সামনে হাজির হয়। সংবাদমাধ্যম কিংবা পত্রিকায় চোখ বুলালে দেখা যায়, মেয়ে হচ্ছে তার বাবার নির্যাতনের শিকার। প্রতিবেশীর শিশু সন্তানের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছেন অন্য প্রতিবেশী। পরকীয়ার জেরে স্বামীর হাতে স্ত্রীর আবার স্ত্রীর হাতে স্বামীর প্রাণ যাচ্ছে। এভাবে আর কত! সমাজটা আজ যেন অবক্ষয়ের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

অনেক বিত্তবানকে দেখা যায়, বাড়ির কাজের লোকটির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে। কাজের মেয়েটিকে রোবটের মতো খাটাতে দেখা যায় অনেক বাড়িওয়ালিকে। কাজের মানুষটিও যে রক্ত মাংসে গড়া একজন মানুষ, এ বোধটুকু যেন তারা হারিয়ে ফেলে। কোনো কিছুতে সামান্য ভুল হলে অমনি তাদের ওপর নির্যাতন চালাতে পিছ পা হয় না কেউ কেউ। রাস্তা-ঘাটে, দোকানে কিংবা বাজারে, আমরা কতজনের সঙ্গেই তো খারাপ আচরণ করে বসি। ভিক্ষুককে ভিক্ষা না দিলেও তাদের সঙ্গে কটু ভাষায় ব্যবহার করেন অনেকে। চায়ের দোকানে বসে কতজনকে নিয়ে মন্দ কথা বলি, কতজনের গিবত করি, এভাবেই আমাদের দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। অথচ একবারও কি নিজের আত্মসমালোচনা করি? নিজেকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করি? সহজ উত্তর হলো- করি না। তাইতো আমাদের দ্বারাই সহজেই সংঘটিত হয়ে যাচ্ছে, যত সব অন্যায় কাজ।

পশুপাখির ওপর নির্দয় আচরণ করতেও পিছিয়ে নেই আমরা। শুধু তাই নয়, আমাদের চারদিকের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে নিজের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিপদ ডেকে নিয়ে আসছি। নদী-খাল, জলাশয়, পুকুরে পলিথিন কিংবা প্লাস্টিকের বর্জ্য ফেলে সেখানকার জলজপ্রাণীদের হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছি। পুকুর ভরাট করে গড়ে তুলছি স্থাপনা। গাছপালা কেটে শত শত পাখির আবাসস্থল ধ্বংস করছি। যে গাছ নিঃস্বার্থভাবে আমাদের এত উপকার করছে, তার বুকে পেরেক ঠুকে লাগাচ্ছি ব্যানার। গাছের ডালে পাখির বাসা ভেঙে অনেকে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করেন। খেতে বসে মাছের কাঁটা বিড়ালকে না দিয়ে ফেলে দেই হাত ধোয়ার পানিতে। অথচ বিড়ালের ম্যাও ম্যাও শব্দ যেন অনেকের কানেই যায় না! ক্ষুধার্ত প্রাণীকে আহার করানো একটি মহৎ কাজ হলেও আমরা কয়জনে সেটি করি?

বাবা-মায়ের সঙ্গে অনেক সন্তানকে অসদাচরণ করতে দেখা যায়। পিতা-মাতার ঋণ কখনও শোধ হওয়ার নয় জেনেও অনেক সাহেব বাড়িওয়ালির কথা মতো তাদের দূরে ঠেলে দেন। বৃদ্ধ বয়সে মানুষের সেবাযত্নের বেশি প্রয়োজন হয়। কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মাকে সেবাযত্ন দূরে থাক, অনেক সন্তান তাদের বোঝা ভাবেন। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে যত্নের পরিবর্তে অযত্ন, অবহেলায় তাদের দিনগুলো বড় কষ্টেই অতিবাহিত হয়। যা কখনও কাম্য নয়। আমরা জানি, ভাই-বোনের সম্পর্ক হয়, অত্যন্ত মজবুত ও সুদৃঢ়। যতই মনোমালিন্য, কথা কাটাকাটি কিংবা ঝগড়া হোক কেউ কাউকে ছেড়ে যেতে পারে না। দিনশেষে আবার সবাই সবকিছু ভুলে এক হয়ে যায়। কিন্তু সামান্য সম্পত্তির জন্য ভাই-বোনের মধ্যেও দূরত্ব সৃষ্টি হতে দেখা যায়। অনেক পরিবারেই আমরা দেখি জায়গাজমি নিয়ে ভাই-বোনের মধ্যে বিরোধ লাগতে। এ বিরোধের জেরে সংঘটিত হতে দেখা যায়, যতসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গেও আমরা নিষ্ঠুর আচরণ করে থাকি। প্রভাব-প্রতিপত্তির জেরে অন্য প্রতিবেশীর হাঁটার রাস্তা পর্যন্ত আটকে দিতে দেখা যায় অনেককে।

দিনদিন আমাদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা বেড়েই চলছে। নিজেকে নিয়ে বাঁচতে গিয়ে আজ আমরা এতটাই অমানবিক ও বেপরোয়া হয়ে উঠছি যে, নিজের অজান্তেই সংকটাপন্ন করে তুলছি ভালোভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ। মনুষ্যত্ব, মানবিকতা, মমতা, মানবিক মূল্যবোধ আজ বিপর্যস্ত। এভাবে অমানবিকতার প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে একসময় বসবাসযোগ্য সমাজই হারিয়ে যাবে। আমরা কি সেই অন্ধকারের দিকেই এগোচ্ছি?হ

শিক্ষার্থী

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত