সেন্সরশিপ আইন ও রাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক ক্ষত

এ এইচ এম শাহীন, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সিনেমায় সেন্সরশিপ নিয়ে দেশে সম্প্রতি নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। যদিও প্রসঙ্গ পুরোনো। বিষয়ের সংঘাত এবং মোকাবিলা থেমে থেমে হয় বলে আলোচনা যতবার সামনে আসে, ততবার নতুন লাগে। আলোচনার শুরুটা হয়েছে দুটি সিনেমাকে কেন্দ্র করে। সিনেমাগুলো হলো- দেশের খ্যাতনামা নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘শনিবার বিকেল’ এবং মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’। ‘বাংলা চলচ্চিত্র বা কনটেন্টে সেন্সরশিপ খড়গ, গল্প বলার স্বাধীনতা চাই’ শিরোনামে গত ২৫ আগস্ট ২০২২ তারিখে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র জগতের একদল পরিচিত নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ব্যতিক্রমী এক প্রতিবাদী সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিক আর আয়োজকের মাঝখানে ছিল কাঁটাতারের বেড়া। সংগত কারণে ব্যতিক্রমী বললাম। কাঁটাতার হলো প্রতীকী আইন বা নিয়ন্ত্রণ বা বাধা বা দূরত্ব। নির্মাতা মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর দাবি তার সিনেমা ‘শনিবার বিকেল’ ৩ বছর ধরে আটকে আছে আপিল বোর্ডে। প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের জন্য সেন্সর থেকে রিলিজ পায়নি। জানা গেছে, সিনেমাটির গল্প সাজানো হয়েছে ২০১৬ সালে গুলশান হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সন্ত্রাসবাদের ঘটনা নিয়ে। সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত-জার্মান তিন দেশের যৌথ প্রযোজনায়। ছবিটি মুক্তি না দেয়ার কারণ হিসেবে সেন্সর বোর্ডের সদস্য ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ জানিয়েছিলেন, ‘ছবিটিকে নিষিদ্ধও বলা যেতে পারে। এ ব্যাপারে সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যান আরও ভালো বলতে পারবেন। আমি এটুকু বলতে পারি, ছবিটি প্রদর্শিত হলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে’ (যায়যায়দিন, ১৯ জানুয়ারি ২০১৯)। শনিবার বিকেল নিয়ে নির্মাতা ফারুকী বিভিন্ন সময় বরাবরের মতো দাবি করেছিলেন তার সিনেমায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার মতো কোনো ইংগিত কিংবা দৃশ্য ছিল না। তিনি বলেছিলেন, সেন্সর বোর্ডের আচরণ সিনেমার প্রতি অন্যায্য এবং অবিচার। ‘হাওয়া’ সিনেমাটি দর্শক নন্দিত হওয়ায় সিনেমা প্রেমিদের কাছে প্রশংসার ঝড় তুলেছিল। কোনো কোনো সিনেমাবোদ্ধা ছবিটিকে বাংলা সিনেমার মোড় ঘুরানো ইতিহাসও বলতে চেয়েছেন। সে যাই হোক, আমার আলোচনা অন্য জায়গায়। সেন্সর কর্তৃপক্ষ সিনেমার সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ছাড় দেয় এবং প্রেক্ষাগৃহে দেদারসে প্রদর্শিত হয়। এবার আপত্তি উঠল অন্য জায়গায়। সিনেমার একটি দৃশ্যে আমরা দেখতে পাই, একটি শালিক পাখিকে খাঁচায় বন্দি করা হয়েছে। সিনেমায় গল্পের প্রয়োজনে দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২ লঙ্ঘনের অভিযোগে সিনেমার পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমনের নামে মামলা করে বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। মামলার অপরাধ দেখানো হয়েছে পাখিটিকে খাঁচায় বন্দি রাখা। মামলার সূত্র ধরে সিনেমার পরিচালক সাংবাদিকদের বলেছিলেন পাখিটিকে গল্পের খাতিরে সাময়িক সময়ের জন্য খাঁচায় বন্দি দেখানো হয়েছে। পরে অবমুক্ত করা হয়। মামলা নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এখানে উপহাসের একটা ব্যাপার থেকে যায়। সিনেমাটির চিত্রনাট্য, কারিগরি দিকসহ সব কিছু বিবেচনা করে ছাড়পত্র দিয়েছিল সেন্সর বোর্ড। মানে মধ্যস্ততায় বিশোধন হওয়া।

মামলার কোনো বিষয় থেকে থাকলে সেন্সর বোর্ড দায় এড়িয়ে পরিচালক কীভাবে স¤পূর্ণ দায় নিতে পারেন! হালে আলোচিত এ দুটি সিনেমা ছাড়াও আরেকটি সিনেমা নিয়ে নেটিজেন ও চলচ্চিত্র সমালোচক মহলে বিতর্ক ছিল। সিনেমার নাম হলো ‘মর থেঙ্গারি’। দেশের প্রথম চাকমা ভাষায় নির্মিত সিনেমা। বাংলা করলে সিনেমার নাম দাঁড়ায় ‘আমার বাইসাইকেল’। সিনেমাটি নিয়ে সেন্সর বোর্ডের আপত্তি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে মিলিটারি কর্তৃক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নানা পীড়নের চিত্র দৃশ্যায়ন করা বা গল্পে বাধা। সিনেমাটি সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র দেয়নি। এছাড়াও বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন চলচ্চিত্র নিয়ে সেন্সর বোর্ড বিতর্কের উপলক্ষ্য হয়েছিল।

চলচ্চিত্রে সেন্সর মানে সাধারণত আমরা জানি, সিনেমার ওপর প্রতিষ্ঠানের প্রত্যায়িত স্বীকৃতি। অর্থাৎ একজন নির্মাতা যখন কোনো সিনেমা বানান, তখন সিনেমাটির সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করা। বোর্ড তাদের ভাষায় এটাকে সিনেমার ‘শিল্পগুণ’ নামে চিহ্নিত করে। বোর্ডের কাছে এই শিল্পগুণের কিছু ক্রাইটেরিয়া থাকে। যেমন, সিনেমায় সহিংসতা, যৌনতা, ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মানহানি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, রাষ্ট্রদ্রোহিতা ইত্যাদি। এসব শর্তে উত্তীর্ণ হলে বাংলাদেশে সেন্সর বোর্ড যে কোনো সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের জন্য সনদ প্রদান করে। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে সেন্সর বোর্ড আছে। তবে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে সেন্সর এবং বোর্ডের কাজের মধ্যে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সেন্সর বোর্ডের মধ্যে কার্যপ্রণালীগত কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিতে সেন্সরশিপ মানে শুধু চাইল্ড পর্নোগ্রাফির ওপর প্রতিষ্ঠানের খবরদারি। সিনেমায় সেন্সর জিনিসটা এখানে গৌণ। মুখ্যত সিনেমাকে প্রিভিয়্যু গ্রেড দ্বারা প্রত্যায়িত করা। বাংলাদেশে সেন্সর বোর্ডের ইতিহাসের গোড়া ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন। তাই এখানকার সেন্সর বোর্ডের আদ্যোপান্ত তালাশ করতে গেলে আইনের কাঠামোগত আলাপ জরুরি। প্রজা-শাসনের সঙ্গে সংগতি রেখে ১৯১৮ সালে ব্রিটিশরা কলকাতা, মুম্বাই এবং রেঙ্গুনে প্রথম সিনেমাটোগ্রাফি আইন তৈরি করে। এই এক্টের অধীনে গঠিত হয়েছিল প্রথম বোর্ড। বোর্ড সিনেমার মানদণ্ড নির্ধারণ করত এভাবে- রাজার পোশাক কিংবা ব্রিটিশদের অনুগত প্রশাসন নিয়ে তাচ্ছিল্য করা যাবে না। ভায়োলেন্স শো করা যাবে না, অশ্লীলতা দেখানো যাবে না ইত্যাদি। ভারতে চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল, উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গতির সঙ্গে সমন্বয় করে। চলচ্চিত্রকে উপজীব্য করে, তখন রাজনীতি সচেতন নির্মাতারা সিনেমার মাধ্যমে গণমানুষের ভেতর প্রেরণা জোগানোর কাজ করছিল। মানে সিনেমার জনপ্রিয়তাকে প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্রিটিশ ভারতে সেন্সর বোর্ডের কাছে প্রথম আপত্তিকর সিনেমা ‘ভক্ত বিধূর’ (১৯২১)। সিনেমা নিয়ে অভিযোগ ছিল সিনেমার প্রধান চরিত্রের মাথায় ছিল গান্ধী টুপি এবং তিনি চরকা চালান।

‘সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তুষ্টি এবং জনগণকে অসহযোগী হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে’ তৎকালীন সিনেমাটোগ্রাফ কমিটির এই ছিল ভাষ্য। ১৯৩৩ সালে আরেকটা সিনেমা বাজারে আসে। নাম ‘কর্ম’। সিনেমায় দেখা যায় চুম্বনের দৃশ্য ছিল চার মিনিট। সিনেমাটি প্রদর্শনের জন্য কমিটি কোনোরকম অভিযোগ ছাড়া ছাড়পত্র দেয়। অর্থাৎ শ্লীলতা-অশ্লীলতার যত নিয়ম-কানুন এসব ছিল শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক বিবেচনার বিষয়। কোন সিনেমা প্রদর্শিত হবে আর কোন সিনেমা আটকে যাবে, উপনিবেশ ভারতে স্বাধীন চলচ্চিত্র ইতিহাসের যাত্রাটা শুরু হয়েছিল এরকম একটা রাজনৈতিক পরিবেশের ভেতর থেকে। প্রজাশাসন আইনের ন্যায় সিনেমা অ্যাক্ট ছিল, কলোনির ভেতর ব্রিটিশদের কর্তৃত্ব জারি রাখার আরেকটা অস্ত্র। তারপর ব্রিটিশ থেকে স্বাধীন হয়ে উপমহাদেশ বিভক্ত হলো। আমরা ভাগে পেলাম অখণ্ড পাকিস্তান। স্বাধীনতার ডামাডোলে অখণ্ড পাকিস্তান ব্রিটিশের রেখে যাওয়া অনেক কিছুর ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নামজারি করেছিল। তারমধ্যে ১৯১৮ সালের সিনেমাটোগ্রাফ অ্যাক্ট একটি। রাষ্ট্রকে শোষণের যন্ত্র থেকে অবমুক্ত করার বিশেষ প্রচেষ্টা যদি শাসকগোষ্ঠীর না থাকে, তবে সেই শাসকদের পক্ষে আইন হলো প্রধান অস্ত্র। সেজন্য ব্রিটিশের মতো পাকিস্তানকেও জনগণের আইন নিয়ে ভাবতে হয়নি। ব্রিটিশদের তৈরি করা আইনের লিগ্যাসি বহন করেছিল পাকিস্তান। শাসনের একই উদ্দেশ্য সামনে রেখে ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সরকার গঠন করে ইস্ট বেঙ্গল বোর্ড অব ফিল্ম সেন্সর। পাকিস্তান সরকার ১৯১৮ সালের সিনেমাটোগ্রাফি অ্যাক্টে কিছু ধারা সংযোজন করে। পরে যেটির নাম হয় সেন্সরশিপ অব ফিল্মস অ্যাক্ট। ১৯৬৩ সালে সেন্সরশিপ অব ফিল্মস অ্যাক্ট সমগ্র পাকিস্তানে কার্যকর হয়। ঢাকা ও লাহোরে শাখা করে বোর্ডের কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র অনুমোদন পর্ষদ গঠন করা হয়েছিল। এই অ্যাক্টের অধীনে পাকিস্তান আমলে অনেক সিনেমা সেন্সর বিতর্কে আটকা পড়ে। জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। যেটি অবশ্য পরে চড়াই-উৎরাই করে মুক্তি পায়। সেসময় বহু স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজনৈতিক সিনেমা বানাতে তটস্থ থাকতেন। জহির রায়হানদের মতো কিছু সাহসী নির্মাতা এগিয়ে আসলেও সংগ্রামের পথটা হতো কঠিন। ২৩ বছরের ব্যবধানে জনযুদ্ধের ভেতরে আবার একটা দেশ পেলাম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মৌলিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলাদেশ সরকার আইনের কিছু কিছু ধারা সংশোধন করে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানের চেয়ে আরও বেশি খবরদারি করতে চলচ্চিত্রের ওপর সেন্সরকে আরও বেশি শক্তিশালী করা হয়। আজকের বাংলাদেশে যে সেন্সর বোর্ডকে আমরা দেখি, সেটি ১৯৬৩ দ্য সেন্সরশিপ অব ফিল্মস ও ১৯৭৭ দ্য বাংলাদেশ সেন্সরশিপ রুলস অব ফিল্মস (সংশোধিত ২০০৬) আইনের সমন্বয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, দেশীয় সংস্কৃতির অবমাননা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন সংযোজন। গত ৫০ বছরে এই সেন্সরের ইতিহাস ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানের মতো করুণ। আইনের অধিনে বোর্ডের গঠন প্রক্রিয়াটা একটু খেয়াল করলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। নিয়ম অনুযায়ী সেন্সর বোর্ড গঠন হয়, ১৫ জন সদস্য নিয়ে। বোর্ডের চেয়ারম্যান হন বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব। সদস্য সচিব হন ভাইস চেয়ারম্যান। বাকিরা হলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি-১, আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি-১, চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব-১, তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব-১, সাংবাদিক-২, চলচ্চিত্র সমালোচক-১, চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির প্রতিনিধি-১, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব-২, সংগীত ব্যক্তিত্ব-১।

স্বাধীনতার পাঁচদশকে আমাদের কতিপয় মৌলিক ব্যর্থতার একটি হলো রাষ্ট্রকে আমলাতন্ত্রের দিকে নতজানু করে রাখা। এ সমস্যার গোড়াও; কিন্তু উপনিবেশ ভারতে। ব্রিটিশ সরকার খাজনা আদায়ের জন্য তার প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিল। সাংবিধানিক আইন দিয়ে তৈরি করা ব্রিটিশের কনফর্মিস্ট ক্লাস বাংলাদেশে আমলা নামে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলত: এখানে পলিটিক্সের সঙ্গে ব্যুরোক্রেসির সংঘাত পুরোনো। সেজন্য ক্ষমতা এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা আমাদের দেশের অনেক রাজনীতিবিদের আক্ষেপ করে বলতে শুনি, রাজনীতিটা আর রাজনীতিবিদের হাতে নেই! এরকম একটা আমলাতান্ত্রিক সংঘাতময় রাষ্ট্রব্যবস্থায় সেন্সর বোর্ড গঠন করা হয় উচ্চপদস্থ আমলাদের একচ্ছত্র আধিপত্য দিয়ে। শিল্পের নন্দনতত্ত্বের বিচার করেন আমলারা। দর্শক মূলধারায় যেসব সিনেমা দেখে সব আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশোধিত। অর্থাৎ তারা দেখতে দিয়েছে বলে আমরা দেখি। পৃথিবীর আর কোনো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে এমনটা ঘটে! বিদ্যমান সেন্সরশিপ আইনকে ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার নিজেদের পছন্দ মতো লোক বসিয়ে বোর্ড গঠন করেছে। ফলে যা হয়েছে শিল্পের গুণগত মান পর্যালোচনার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রধান হয়ে ওঠেছে। যে ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানের উত্তরাধিকার নিয়ে সেন্সর আইনটা জারি রাখা হয়েছে, তাদের দেশেও এখন সিনেমায় সেন্সর নামক রাষ্ট্রের এরকম ভয়ংকর খবরদারি ক্রিয়াশীল নয়। এটা ইতিহাসের পরিহাস!

পৃথিবীর সব বস্তু ও অবস্তু জগতের দুটি দিক আছে। ভালো ও মন্দ। সিনেমার ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। কোন সিনেমা ভালো, কোন সিনেমা মন্দ এই বিবেচনার এখতিয়ার থাকতে পারে, শুধু শিল্প নিবিড় মানুষের। সেন্সর বোর্ড নামক কিছু যদি থাকার প্রয়োজন হয়, তবে এটি হতে হবে, সেসব ব্যক্তি দিয়ে যারা অতিশয় শিল্পের সমঝদার। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ দিয়ে সিনেমা শিল্পের বিকাশের পথ সুগম করা যাবে না। বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। আমাদের সিনেমার অতীত সমৃদ্ধ। আমরা ধারণ করেছি ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায়, জহির রায়হান, আলমগীর কবির, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদসহ অসংখ্য গুণী চলচ্চিত্রকারদের। পথের পাঁচালি, মেঘে ঢাকা তারা, জীবন থেকে নেয়া, মেঘের অনেক রং। এসব ছবি আমাদের ইতিহাসের কথায় বলে। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো স্বাধীনতার পর চলচ্চিত্র শিল্পের যে বিকাশ হওয়া উচিত ছিল, বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা সেভাবে এগিয়ে যেতে পারিনি। সিনেমা শিল্পের বিকাশের পথে এখানে কতিপয় মৌলিক সংকটের কথা প্রায় সময় আমাদের সিনেমা জগতের মানুষরা বলে থাকেন। যেমন, বাজেটের সংকট, গল্পের সংকট, চরিত্রের সংকট, পরিবেশ সংকট ইত্যাদি। এসবের মধ্যে রাষ্ট্রের আরোপিত সেন্সর নামক খড়গ যদি সিনেমা শিল্পের ঘাড়ের উপর ঝুলতে থাকে, তথাপি সিনেমা ইন্ডাসট্রির কল্যাণকর ভবিষ্যৎ আশা করা যাবে না।

এটি চলচ্চিত্রকার হিসেবে একজন নির্মাতার পক্ষে যেমন ক্ষতি, তেমনি দর্শক হিসেবে আমাদের পক্ষেও সমান ক্ষতি। রাষ্ট্র্র ও দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ক্ষতি আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়বে না। কারণ তার জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক ক্ষতির ওপর তার ক্ষতি নিহিত। দুই দুইবার স্বাধীন হওয়া কোনো জনগোষ্ঠীর পক্ষে লজ্জাজনক বর্তমান হলো এই যে, তাকে এখনও টিকে থাকার লড়াইটা সমানে করে যেতে হচ্ছে, পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নতুন কায়দায়। আশা করতে পারি আইনের ঔপনিবেশিক ক্ষত মুছে আমাদের রাষ্ট্র সিনেমাসহ আর সব শিল্পের প্রতি যত্নবান হবে।