প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ নভেম্বর, ২০২২
কর্ণফুলী নদীর ভরা যৌবন দেখে প্রেমে পড়েনি এমন মানুষ নেই। কবি সাহিত্যক, সংগীতশিল্পী, প্রকৃতি বিশারদ থেকে শুরু করে সবাই। এই নদীর প্রেমে মাতোয়ারা হয়েছেন। এই নদীকে নিয়ে অনেকে রচনা করেছেন কবিতা, গান কিংবা গল্প-উপন্যাস। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদী এখন শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে মারাত্মক দূষণের শিকার। নদীরপাড় ও আশপাশে গড়ে ওঠা অসংখ্য অবৈধ বসতি এবং শিল্প-কারখানার বর্জ্য নদীতে পড়ায় কর্ণফুলীর পানি মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়ছে। শিল্পবর্জ্যে পানি দূষণের কারণে এ নদীর পরিবেশও বিপণ্য হওয়ার পথে।
নদীর দুপাড়ে গড়ে ওঠা তিন শতাধিক কলকারখানা আর মহানগরীর ময়লা-আবর্জনা দূষণের অন্যতম কারণ। নদী গবেষকরা বলছেন, দূষণের কারণে হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য। হারিয়ে গেছে অন্তত ৩০ প্রজাতির মাছ।
মৎস্য বিশেষজ্ঞের মতে, এক সময় কর্ণফুলী নদীতে প্রায় ১৪০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এর মধ্যে মিঠা পানির ৬০, মিশ্র পানির ৫৯ এবং সামুদ্রিক ১৫ প্রজাতির। কিন্তু দূষণের কারণে এরই মধ্যে মিঠা পানির মাছ বিলুপ্ত প্রায়। অবশিষ্ট মাছের মধ্যে ১০ থেকে ২০ প্রজাতি ছাড়া অন্য প্রজাতির মাছ এখন পাওয়া যায় না। মূলত শিল্প-কারখানার বর্জ্যে মারাত্মক দূষণের কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে কর্ণফুলী নদী। নাব্যতা হ্রাস এবং নদীর শাখা খাল ও কাপ্তাই লেকের স্লুইচ গেটের পানিপ্রবাহে বাধা পেয়ে নদীর স্বাভাবিকপ্রবাহ কমে গেছে। এছাড়াও নির্বিচারে গৃহস্থালি ও শিল্পবর্জ্য ফেলা, অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ দূষণ এবং নিরবচ্ছিন্ন দখলের কারণে ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জীবননালী কর্ণফুলী নদী।
একসময় কর্ণফুলী নদীতে ডলফিন লাফালাফি করত, এখন সেই ডলফিনের দেখা মেলে না। দূষণের পাশাপাশি একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকারও এ নদী।
অন্যদিকে শাহ আমানত সেতুর উত্তর অংশে ৪৭৬ মিটার নদী ভরাট হয়ে গেছে। ২০১৬ সালে নদী ভরাট করে গড়ে তোলা মাছবাজার, বরফকল, অবৈধ দখল ও ভেড়া মার্কেটের কারণে চাক্তাই খালের মোহনা এলাকায় কর্ণফুলী নদীর প্রবাহমান ধারা কমে দাঁড়ায় ৪৬১ মিটারে। মূলত কর্ণফুলী নদী অবৈধ দখলের কারণে এর প্রশস্ততা কমছে বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। চট্টগ্রাম নগরের ৩৬টি খাল দিয়ে দিনে প্রায় ৫ হাজার টন পয়ঃবর্জ্য ও গৃহস্থালির বর্জ্য পড়ছে কর্ণফুলীতে। পাশাপাশি রয়েছে শিল্প ও চিকিৎসাবর্জ্য। এর বাইরে নদীতে চলাচলকারী নৌযানগুলোর পোড়া তেলে কর্ণফুলীর দূষণ চরমে পৌঁছেছে। সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার নদীসংলগ্ন খালগুলো। এছাড়া জাহাজের তেল, কর্ণফুলী পেপার মিলের বর্জ্য, সিটি করপোরেশনের আবর্জনা ও কলকারখানার বর্জ্যে কর্ণফুলীর দূষণ বাড়ছে।
তাছাড়া নদীর পাড়ের শৌচাগারের মলমূত্র ও মরা জীবজন্তু এবং পলিথিন এসে মিশছে নদীতে। নদী গবেষকের মতে, দূষণের কারণে হারিয়ে গেছে অন্তত ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির মাছ।
ইউনিভার্সিটি অব হংকং, আরএমআইটি ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউটের এক যৌথগবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্ণফুলীতে শুধু সার কারখানাগুলোই প্রতিদিন ১৪৫ ঘনমিটার দূষিত পানি, ৩৫ মেট্রিক টন চায়না মাটি, ৪ মেট্রিক টন সেলুলোজ এবং সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড ফেলে।
ওই গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৩০ বছর ধরে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ক্রোমিয়াম, তামা, নিকেল, সীসা ও দস্তার মতো ভারি ধাতু জমে নদীর গভীরতা তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে। পানিতে ক্রোমিয়াম, তামা ও সীসার উপস্থিতি নিরাপদ সীমা অতিক্রম করায় নদীর বাস্তুসংস্থান ও আশপাশের জনজীবনে বিপর্যয় ঘটেছে বলেও প্রতিবেদনে উলে¬খ করা হয়। কর্ণফুলীর মাছের ওপর গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়ার মতে, কর্ণফুলীতে স্বাদু পানির ৬৬ প্রজাতির মধ্যে ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত, লবণাক্ত পানির ৫৯ প্রজাতির মধ্যে ১০ প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে। সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে ডলফিনসহ অন্যান্য জলজপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য।
তাই কর্ণফুলী নদী বাঁচাতে হলে দুইপাড়ের অবৈধ দখল অবশ্যই উচ্ছেদ করতে হবে। চট্টগ্রাম শহরের খালগুলো পুনরুদ্ধার করা জরুরি। শিল্প-কারখানার বর্জ্য, গৃহস্থালি এবং পয়ঃবর্জ্য নদীতে না ফেলা। যেখানে সেখানে প্লাস্টিকের বর্জ্য না ফেলা এর ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন ও কর্ণফুলীর নাব্যতা ফিরে পেতে গত পাঁচ বছরে যে চারটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার তার যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
সরকারের উচিত কর্ণফুলী নদীর ওপর নজর দেয়ার। নদী কমিশন করে তাদের ক্ষমতা দেয়া। যাতে নদী রক্ষায় কাজ করতে পারে। কর্ণফুলীকে রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যান করতে হবে এবং নদীর দখলদারদের দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে।
কারণ, দখলের কারণেই নদীর প্রশস্ততা কমে গেছে। পাশাপাশি নদীর দূষণ কমাতে পরিবেশ অধিদফতরকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আদালতের রায় অনুযায়ী কর্ণফুলী নদী রক্ষা করতে হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
নদী দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। দেশের সব নদ-নদী রক্ষায় সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
নদী দখল ও নাব্যতা হারানো যেমন- বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক তেমনি উচ্ছেদ অভিযান ও ড্রেজিং পদ্ধতি সারা বছর চলমান থাকা জরুরি। শুধু যৌথভাবে ও কঠোর পদক্ষেপ নিলে কর্ণফুলী নদী তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে।