প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২২
বছরজুড়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে ১০ ডিসম্বরে যা ঘটাতে চেয়েছিল বা ঘটতে চলেছিল, তা পুরোপুরিই ব্যর্থ হলো। বিএনপির এই চমকবাজির কিছুই কার্যকর করতে পারল না। আমরা অবশ্য এমন ব্যর্থতাকেই সমর্থন করছি। উল্লেখযোগ্য কোনো সংঘাত ছাড়াই দিনটি শেষ হয়েছে। জানমালের কোনো ক্ষতি হয়নি। জনগণও স্বস্তি পেয়েছে। ১০ ডিসেম্বর ১০ দফা দাবির মধ্যেই আটকে গেছে। ভালো। বিএনপি এভাবেই আন্দোলন করুক, জনগণ তাই চায়। এ কথা উপলব্ধি করতে পারা যায়, বিএনপি ইচ্ছা করেই এমনটি করেছে অথবা তারা যা করতে চেয়েছিল তা করা সম্ভব হবে না বিধায় এমনটি করতে বাধ্য হয়েছে।
আগে থেকেই জানান দিয়েছিল, ১০ ডিসেম্বরের পর থেকে দেশে খালেদা জিয়ার শাসন চলবে। তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, ১০ ডিসেম্বরই বর্তমান সরকারের শেষ দিন। এই দিনে সরকারের পতন হবে। বিএনপির এই বক্তব্য নিয়ে দলীয় কর্মীরা একটু চাঙা হয়েছিল। বিএনপির নেতারাও বিশ্বাস করেননি যে, এমন কিছু ঘটবে। কিছু সাধারণ মানুষ হয়তো বা একটু আতঙ্কিত হয়েছিল, তবে অধিকাংশ মানুষই এটা বিশ্বাস করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত হলোও তাই। লন্ডন প্রবাসী এক নেতার নির্দেশ মতো এমনটা করতে বাধ্য হতে হয়েছে বলে গুঞ্জন আছে। মতের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত দুই মির্জা সাহেব কারগারে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বলেও গুঞ্জন আছে। ডা. জাফরুল্লাহ তো বলেই ফেললেন যে, লন্ডনে থেকে রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নিজেদের পছন্দ মতো স্থানে সমাবেশ করতে তো পারেইনি। তার ওপর ১ দফার আন্দোলন থেকেও সরে এসেছে। উত্তেজনা একটু হালকা করার জন্যই ১ দফা থেকে ১০ দফায় চলে গেছে। এখন দেখা যাক, ১০ দফার যৌক্তিকতা কতখানি। যদিও ১০ দফা বলতে যা বলা হয়েছে, তাতেও গোঁজামিল। প্রকৃত অর্থে ১ দফাকেই ১০ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দফাগুলো হলো- ১. সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। এ দাবি তো পুরোনো। এই এক দফা নিয়েই তো দলটি ব্যস্ত রয়েছে। ২. ১৯৯৬ সালের আদলে কেয়ারটেকার সরকার গঠন করতে হবে। বলা বাহুল্য যে, কেয়ারটেকার সরকার এ দেশ থেকে বিদায় নিয়েছে, আর কখনও ফিরে আসবে না। ৩. সরকারকে বদলে নতুন এক নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। এ দাবিও হাস্যকর। কারণ নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে নিয়ম অনুযায়ীই। সুতরাং নতুন করে আর গঠন করার দরকার নেই। ৪. খালেদা জিয়াসহ সব নেতাকর্মীর মামলা প্রত্যাহার। জেনেশুনেই এমন দাবি করা হয়েছে। কারণ সাজাপ্রাপ্ত কোনো আসামির মামলা প্রত্যাহার করা যায় না। মামলা হলে তা আইন দিয়েই মোকাবিলা করতে হয়। সুতরাং এটাও কোনো বৈধ দাবির মধ্যে পড়ে না। ৫. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সন্ত্রাস দমন আইন বাতিল করতে হবে। তবে কি তারা চান সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য কোনো আইন থাকবে না? এমন দাবি জাতির শত্রুরাই শুধু করতে পারে। ৬. নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে। হ্যাঁ, এটা একটা বৈধ দাবি হতে পারে। এই দাবিটির প্রতি জনগণের সমর্থন থাকবে। আমাদেরও আছে। ৭. নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে হবে। এই দাবিটিও সমর্থনযোগ্য। আমরাও সমর্থন করি। ৮. বিভিন্ন খাতের দুর্নীতি শনাক্ত করতে কমিশন গঠন করতে হবে। এই দাবিটিও আমরা সমর্থন করতে পারি। ৯. সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ে হামলাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এটা কোনো দাবি হতে পারে না। কারণ এমন ব্যবস্থা তো আছেই এবং আইন মতো কাজও হচ্ছে। নতুন করে দাবি করার কিছুই নেই। ১০. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থেকে কাজ করতে হবে। এই দাবিটিও আহাম্মকি। কেননা, প্রশাসন তো সরকারের নির্দেশনা মতোই চলবে। সব সরকারের সময়ই একইভাবে প্রশাসন কাজ করে থাকে। এই হলো ১ দফাকে ১০ ভাগে ভাগ করা। মনে হচ্ছে, এতে কর্মীরা খুব একটা খুশি হতে পারেননি। তবে নেতারা প্রকাশ্যে না বললেও ভেতরে ভেতরে খুশিই হয়েছেন। কোনো নেতাই কোনো সংঘর্ষে যেতে চান না। এতে যে কোনো লাভ হয় না, তা অতীত থেকে অভিজ্ঞতা হয়েছে সবার। অবাক কাণ্ড এই যে, নেতারা ইচ্ছা করলেও তাদের ইচ্ছামতো রাজনীতি করতে পারছেন না। কিন্তু এটা তো পারতে হবে। রাজনীতি করেইে দলকে টিকিয়ে রাখতে হবে এবং ক্ষমতায় যেতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এটা জানা সত্ত্বেও কেন বিএনপি সেদিকে এগুচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়।
এদিকে আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে। জনগণ তা গ্রহণও করেছে। বিএনপি আছে সরকারকে ঠেলে ফেলে দেয়ার চিন্তায়। সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করার বদলে নিজেরই পদত্যাগ করে চলে গেছেন। তারা পদত্যাগ করলে কী প্রতিক্রিয়া হবে, তারা কী ভেবেছিল- তা জানা যায়নি। তবে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। কারণ যাই থাক, তা কখনোই জানা যাবে না। যেমন এখনও জানা যায়নি যে, মহাসচিব ফখরুল সাহেব সংসদ সদস্য হয়েও কেন শপথ নেননি। বিএনপিতে যতসব আজগুবি আর অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে, যার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। সংসদে কোনো বিরোধী দল যদি সবাই মিলে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে, তাহলে একটা প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
কিন্তু বিএনপি তো সংসদে বিরোধী দল নয়। একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষুদ্রতম একটি অংশ। সংসদে বিরোধী দল তো জাতীয় পার্টি। বর্তমান সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এক আওয়ামী লীগের। সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিরও যদি সবাই পদত্যাগ করতেন, তাহলেও সরকারের কোনো ক্ষতি হতো না। এই অবস্থা জেনেও বিএনপির এই ক্ষুদ্রতম অংশ কেন পদত্যাগ করল, তা কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বুঝতে পারছেন না। এমন হতে পারে যে, যারা পদত্যাগ করেছেন তারা নিজেরাও জানেন না এর কারণ। লন্ডন থেকে নেতা বলে দিয়েছেন তাই করতে হবে। কারণ তারা জানেন না- নেতা জানেন। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে বিএনপির স্থানীয় নেতারা কী করবেন। কি-ই বা করার আছে তাদের? এই করাটা যতদিন তারা অর্জন করতে না পারবেন, ততদিন ভিডিও কলের নির্দেশে এভাবেই চলতে থাকবে। ১০ ডিসেম্বর যে ব্যর্থ হলো, তা কি মূল্যায়ন করা হবে? নাকি সবকিছুই লন্ডন যা বলবে তাই হবে?
বিএনপির ১০ ডিসেম্বর একটি বড় পরাজয়। এভাবে বলা যায় যে, বিজয়ের মাসে পরাজিত শত্রুদের আবার পরাজয়- তাহলে কি ভুল বলা হবে? এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, ১০ ডিম্বেরের এই পরাজয় কীভাবে পুষিয়ে নেবে? আদতে পুষিয়ে নিতে পারবে কি-না। মিছিল, সমাবেশ, বিক্ষোভ করে কতদূর এগোতে পারবে। যেখানে প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের মতো বিশাল একটি দল, যারা দেশের স্বাধীনতা এনেছে, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে। পরাজিত শত্রুরা বারবার পরাজিত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এইভাবে পরাজিত হতে হতে এক সময় দলটি নিঃশেষ হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে কেউ বলবে ‘বিএনপি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল ছিল। এখন যেমন অনেকে বলেন, ‘মুসলিম লীগ’ নামে এক সময় এদেশে একটি দল ছিল।
বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে জড়িত- এ কথা সবাই জানে। তারাও অস্বীকার করে না। জামায়াত স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি, সেই সঙ্গে বিএনপিও। এটা জানা সত্ত্বেও বিএনপি বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে বেছে নিয়েছিল কোনো অঘটন ঘটানোর জন্য। এটা জামায়াতের পরামর্শে করা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। বিএনপিও পুলকিত হয়ে প্রমাণ করতে পেয়েছিল যে, ডিসেম্বর মাস তাদেরও। কিন্তু পারল না তো ডিসেম্বরে কোনো কারিশমা দেখাতে। এখন কি হবে? বড় বড় সমাবেশ করে হম্বিতম্বি করে এই করব, ওই করব, শেষে কিছুই করতে পারল না। এখন তো আর তাদের কোনো কথাই কেউ বিশ্বাস করবে না। তাহলে তাদের পরবর্তী আন্দোলন কীভাবে এগোবে? এখনও সময় আছে। ডা. জাফরুল্লার কথা মতো রাজনীতি শুরু করুন। যারা এখানে আছেন তারা সবাই রাজনীতিতে পরিপক্ব। তাদের হাতে ছেড়ে দিন রাজনীতি। তাহলে আজ হোক কাল হোক, এক সময় তারা ক্ষমতায় আসতে পারবেন। আর বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে সে গুড়েবালি। বেশ কয়েকটি সমাবেশ করে যদি মনে করেন, দেশের মানুষ সবাই আপনাদের সঙ্গেই আছে, তাহলে ভুল হবে। আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে লোকসমাগম দেখেননি? আওয়ামী লীগের জনসভায় যে জনসমাগম হয়েছিল, নিশ্চয়ই তা হয়নি। তাহলে দেশের মানুষ তাদের সমর্থন দিচ্ছে সবাই তাদের সঙ্গেই আছে এসব অবাস্তব কথা বলে চমকবাজি করা যাবে জনগণকে সঙ্গে পাওয়া যাবে না। আর জনগণকে সঙ্গে না পেলে রাজনীতি করাও যায় না, ক্ষমতায় তো নয়ই। বিএনপিকে যদি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হয়- তাহলে তাকে রাজনীতি করতে হবে, সংসদও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে তার সব রীতিনীতি মেনে রাজনীতি করতে হবে। এতে যদি আরও ৫০ বছর ক্ষমতায় যেতে না পারে তবুও তাই করতে হবে।
কেননা, একটা সময় আসবে যখন জনগণই তাদের ক্ষমতায় বসাবে। এক্ষুনি বা যথন ইচ্ছা তখন যেভাবেই হোক ক্ষমতায় বসতে হবে, এ জন্য দেরি করা যাবে না, এমন চিন্তাধারা নিয়ে এগোলে কখনোই তা সফল হবে না। বিষয়গুলো বুঝতে হবে। তাছাড়া রাজনীতি করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো- দেশ ও দেশের মানুষের সেবা করা। সেটা ক্ষমতায় থেকেও করা যায়, ক্ষমতার বাইরে থেকেও করা যায়। কারণ বিরোধীদলে থেকেও দেশ ও দশের মঙ্গল করা যায়। এটাই হলো সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনীতি।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে বিএনপি কি করবে? এদিকে কয়েকজন সংসদে থাকলেও তারা সেখানে কথার তুবড়ি ছুড়তে পারত। তারা জানে না যে, বাইরে কথা বলার চেয়ে সংসদে কথা বলার গুরুত্ব অনেক বেশি। সেই গুরুত্বটাও হারাল। সবই যেন পাগলের রাজনীতি। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে লবিষ্ঠ নিয়োগ করেও তেমন লাভ করতে পারেনি। তারা টাকা খেয়েছে আর বিবৃতি দিয়েছে। পরে তদন্ত করে দেখেছে সবই মিথ্যা। শুরু থেকেই বিরোধীতাকারি দেশ যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কিছু কথায় সমর্থনের ইঙ্গিত দিলেই বিএনপি নেচে উঠে, এই বুঝি ক্ষমতায় চলে এলো। বিদেশি কূটনৈতিকদের দিয়ে কিছু কথা বলতে পারায় বেশ পুলকিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে কে কি হবে, তার ভাগবাটোয়ারা শুরু করে দিল। পরে কি হলো? সবই ভেস্তে গেল। কোনো কিছুতেই কিছুই হলো না। তাই এখন বিএনপিকে নিজেদের ওপর বিশ্বাস অর্জন করতে হবে- বিদেশিদের ওপর নয়। নিজেদের বিশ্বাস করতে হবে। নিজের দেশকে ভালোবাসতে হবে, যা করার নিজেদের জনগণ নিয়েই করতে হবে। পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন অচিরেই বিএনপিকে এই পথেই আসতে হবে। তবেই দেশে সুষ্ঠু রাজনীতির প্রভাব বাড়বে। সুষ্ঠু রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশবাসী শান্তিতে থাকতে পারবে। রাজনীতিবিদরাও রাজারমতোই দেশ ও দশের সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করবেন। এটাই হলো রাজনীতি, মানুষের জন্য রাজনীতি।