ঢাকা ২১ জুলাই ২০২৪, ৬ শ্রাবণ ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

‘গণমুখী ব্যাংকিং’ শেখ হাসিনার অনবদ্য সাফল্য

রেজাউল করিম খোকন, লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও কলাম লেখক
‘গণমুখী ব্যাংকিং’ শেখ হাসিনার অনবদ্য সাফল্য

একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে সে দেশের ব্যাংকিংব্যবস্থা। অভ্যন্তরীণ লেনদেন থেকে শুরু করে বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার আদান-প্রদান, জনগণের সঞ্চয় প্রবণতা বৃদ্ধি এবং তা আমানত হিসেবে সুরক্ষা, গচ্ছিত আমানতের সদ্ব্যবহার তথা ঋণ প্রদান ও আদায়, বিনিয়োগ এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা রয়েছে। বলা যায়, কোনো দেশের অর্থনীতি কতটা উন্নত, তা সে দেশের ব্যাংকিংব্যবস্থা কতটুকু উন্নত, তা কতটা গণমুখী বা সে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার গভীরতা ইত্যাদি পরিসংখ্যান দেখে বোঝা যায়। বাস্তবিক অর্থেই উন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর খুবই বেশি মাত্রা নির্ভরশীল। মৌলিক ব্যাংকিংয়ের কথাই ধরা যাক, যেখানে জনগণের অর্থনৈতিক উন্নতি তথা আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার সুরক্ষা প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। এটিই সত্যি যে, মানুষ যা আয় করে তার পুরোটা সে একসঙ্গে একই সময়ে ভোগ করে না। ভবিষ্যৎ সুরক্ষা ও বিনিয়োগের জন্য তা সঞ্চয় হিসেবে গচ্ছিত রাখে। কালের পরিক্রমায় নানা ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও ব্যাংকিংব্যবস্থাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। মানুষ তাই তার কষ্টার্জিত আয় সুরক্ষার জন্য প্রথমেই ব্যাংকের কথাই মনে করে থাকেন। অন্যদিকে মানুষ বিনিয়োগের নিমিত্তে অতীতে অনানুষ্ঠানিক নানা উৎস থেকে ধার করলেও কালক্রমে তা সংকুচিত হয়ে এসেছে। অতীতে মানুষ কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগের জন্য পরিচিতজনের নিকট থেকে ধারদেনা করতেন। সমাজে অনানুষ্ঠানিক অনেকে যারা মহাজন হিসেবে কথিত, তারাও বিনিয়োগের ঘাটতি পূরণে অর্থায়ন করতেন। কিন্তু আধুনিক সময়ে বিনিয়োগের পরিধি, পরিমাণ ও ধরন সবকিছুই পরিবর্তিত হওয়ার কারণে অনানুষ্ঠানিক অর্থায়ন একেবারেই সংকুচিত হয়ে এসেছে। বর্তমানে তাই যে কেউই বিনিয়োগের ঘাটতি পূরণে আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের উৎস সন্ধান করে থাকেন। অপরদিকে অর্থনীতির প্রসারের কারণে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ বহুগুণে বেড়ে গেছে। বর্তমানে কোনো একটি দেশ এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কোনো দেশ তার উদ্বৃত্ত পণ্য ও সেবার প্রসার ও বিক্রয়ের জন্য অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি বৈদেশিক বাজারের সংস্থান করে থাকে। অপরাপর ঘাটতি উৎপাদনের দেশগুলোতে সেসব দেশ পণ্য ও সেবা রপ্তানি করে থাকে। যেসব দেশ পণ্য ও সেবা উৎপাদনে সমর্থ নয়, কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য তারা বৈদেশিক বাজার থেকে সেসব পণ্য ও সেবা আমদানি করে থাকে। কিন্তু আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের পুরো প্রক্রিয়াতেই আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভূমিকা অপরিসীম। বলতে গেলে আধুনিক আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন করতে চাহিদাপত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরবর্তী ধাপে মুদ্রার লেনদেন পর্যন্ত সব কাজ ব্যাংকের মাধ্যমেই সমাধা হয়। বৈদেশিক মুদ্রার আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও ব্যাংকিংব্যবস্থাই অগ্রগামী। এক দেশ থেকে অন্য দেশে বৈদেশিক মুদ্রার আদান-প্রদানে ব্যাংকিংব্যবস্থাই আস্থার প্রতীক। সে ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয় ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও সবাই ব্যাংকের নিকটই শরণাপন্ন হয়ে থাকেন।

সুতরাং বিস্তারিত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে যে, আধুনিক জীবন ব্যবস্থায় ব্যাংক মানুষের জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। এসব কারণে উন্নত অনেক দেশেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা জীবন ও গণমুখী। সেসব দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার গভীরতাও ব্যাপক। গণমুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থা বলতে কোনো দেশের সমাজ ও জীবন ব্যবস্থার কথা চিন্তা করে সে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কথা বোঝায়। কোনো দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা কতটুকু গণমুখী, তা নির্ধারণে বেশ কিছু মানদ- রয়েছে। গণমুখী ব্যাংকিংয়ের আরেকটি নির্ণায়ক হতে পারে কোনো দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগণের কত শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব রয়েছে। একটি গণমুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তাই সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সার্বিক অংশগ্রহণ পরিলক্ষিত হয়। এ রকম ব্যবস্থায় কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, মহিলা, পুরুষ, ছোট-বড়, কর্মক্ষম, বেকার, ধনী-গরিব সবাই কোনো না কোনোভাবে ব্যাংক এবং ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে থাকতে হয়।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব সময়ে স্বপ্ন দেখতেন একটি সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশের। তিনি স্বপ্ন দেখতেন বাংলার বুকে কোনো ক্ষুধা থাকবে না, থাকবে না ধর্ম-বর্ণের দোহাই দিয়ে শোষণ বঞ্চনা নির্যাতন, মমত্ববোধ এবং দেশপ্রেমের প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা। যার উজ্জ্বলতা, উত্তাপ এখনও দেদীপ্যমান। মৃত্যুকে পরোয়া না করে তিনি গোটা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। এনে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি শোষণের হাত থেকে জাতিকে মুক্ত করে বাংলাদেশ নামের নতুন একটি দেশের স্বাধীনতা। তার নির্দেশে গৃহীত বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেও গণমানুষের চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সমর্থনভিত্তিক মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নীতি কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল। জাতির পিতার সুদূর প্রসারী অর্থনৈতিক ভাবনাকে বাস্তবে রূপদানের লক্ষ্যে গত এক যুগ সময়ে বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিয়ে গেছেন তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা।

তার গতিশীল এবং বিজ্ঞোচিত নেতৃত্বে গৃহীত উন্নয়ন রূপকল্পে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উন্নত প্রযুক্তি এবং উচ্চতর প্রবৃদ্ধিকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবে রূপায়নে গণমুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালুকরণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ইতোমধ্যে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। যার সুফল বাংলাদেশের মানুষ আজ ভোগ করছে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা ও গতিশীল রেখে সমৃদ্ধির এবং উন্নয়নের সুফল ঘরে ঘরে নারীপুরুষ, ধর্মবর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে প্রত্যেকের কাছে পৌঁছে দিতে গৃহীত পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত সফল বলে বিবেচিত হয়েছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে তৈরি সেই উন্নয়ন রূপকল্পের প্রক্ষেপণে দারিদ্র নিরসন ও সামাজিক উন্নয়নের যে অভূতপূর্ব স্বপ্নের অবতারণা করা হয়েছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে তোলার লক্ষ্যে মূল্যস্ফীতি পরিমিত ও সহনশীল পর্যায়ে রাখা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, দেশের মুদ্রা ও ঋণ নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের আর্থিক খাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি ও উন্নয়ন, সার্বিক লেনদেন ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু পরিচালনা, নোট ইস্যুকরণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ এবং সরকারের যাবতীয় লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বৈশ্বিক ও অভন্তরীণ অভিঘাত মোকাবিলায় অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৬১টি তফসিলী ব্যাংক (রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয়টি ও তিনটি বিশেষায়িত ব্যাংকসহ) এবং ৩৪টি ননব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (সম্পূর্ণ রাষ্ট্রমালিকানাধীন তিনটিসহ) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্তমানে প্রতিবছরই মূল্যস্ফীতি সহনশীল রেখে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে সরকারের আর্থিক নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সংকুলান ধর্মী ও অন্তর্ভূক্তিমূলক মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ফলে বিগত অর্থবছরগুলোতে একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ সহনশীল মাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে প্রকৃত দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার যা দীর্ঘদিন যাবত ছয় শতাংশের মধ্যে আটকে থাকলেও ইতোমধ্যে আট শতাংশে পৌঁছেছে। সর্বোচ্চ দক্ষতা ও নিপুণতার সঙ্গে সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে বিভিন্ন ধরনের কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে চমকপ্রদ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা দেশের আপামর জনসাধারণের প্রশংসা ও আস্থা অর্জন করেছে। এর পাশাপাশি দেশের ব্যাংকগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আর্ন্তজাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে ও দেশের সামগ্রিক ব্যাংক ব্যবস্থার ভিত্তি আরো মজবুত ও শক্তিশালী করার জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আর্থিক খাতে গত একযুগ সময়ে ডিজিটালাইজেশনে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। আর্থিক লেনদেন এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ এবং নিরাপদ হয়ে উঠেছে এর মাধ্যমে।

কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পথে গণমানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গত এক যুগের বেশি সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তার প্রথাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও সরকারের দারিদ্র বিমোচনে নানামুখী উদ্যোগগুলোতে সমর্থন জোগাতে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসা, তথা আর্থিক সেবাভুক্তিকরণ কর্মসূচির ওপর বিশেষ নজর দেওয়ার পাশাপাশি কৃষি, এসএমই ও পরিবেশবান্ধব খাতে অর্থায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। গণমানুষের মধ্যে ব্যাংকিং সেবা কার্যক্রম এর মাধ্যমে দ্রুতই প্রসার লাভ করেছে। কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্যে ব্যাংকিং খাতে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর অন্যতম হলো, মাত্র ১০ টাকায় কৃষকের ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা। কৃষকদের জন্যে সরকারের দেওয়া বিভিন্ন ভর্তুকি সুবিধা ছাড়াও ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণ যাতে সরাসরি হিসাবে স্থানান্তর করা যায় সে লক্ষ্যে ১০ টাকা জমা রেখে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে কৃষকের ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশেষ নির্দেশনা জারি করা আছে।

বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে এসএমই খাতের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এসএমই খাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আরো আগে থেকেই পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি হাতে নিলেও গত এক যুগ সময়ে এ প্রয়াস আরো আরো বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে উদ্যোক্তাবান্ধব করতে এবং নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নের লক্ষ্যে ব্যাংকিং খাতে বিভিন্নমুখী কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। শৈশবেই স্কুল জীবন থেকে সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলার পাশাপাশি আর্থিক বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ এবং ব্যাংকিং সুবিধা ও প্রযুক্তির সাথে পরিচিত কররে তুলতে স্কুল ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়েছে এক যুগ আগেই। বর্তমানে সারা দেশে স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল ব্যাংকিং কর্মসূচি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। স্কুল ব্যাংকিং আর্থিক সেবাভূক্তিকরণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এখন অত্যাধুনিক পেমেন্ট সিস্টেমস চালু হয়েছে। দেশে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস মানুষের আর্থিক দেনদেনকে অনেক সহজ এবং গতিসম্পন্ন করেছে। দেশে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচের উন্নয়ন সাধন হয়েছে এবং ই-পেমেন্ট সিস্টেমস চালু করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার চালু করার মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহে চমৎকার তড়িৎ গতি আনা সম্ভব হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালুকরণের পর অল্প সময়ের মধ্যে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। কিছুদিন আগেও সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত মুনাফা গ্রহণের জন্য গ্রাহকদের ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অকেটা সময় ধরে অপেক্ষা করতে হতো। এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার অর্থ গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে প্রতি মাসে কিংবা তিন মাস অন্তর নির্ধারিত তারিখেই সরাসরি জমা হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য গ্রহককে মাসে মাসে ব্যাংকে গিয়ে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। গ্রাহক তার ব্যাংক হিসাবে তার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার অর্থ জমা হওয়ার বিষয়টি তার মুঠোফোনে এসএমএস এর মাধ্যমে পেয়ে যাচ্ছেন। অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অর্থায়ন রোধ করতে বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি থাকায় এক ধরনের স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ জেগেছে ব্যাংকে লেনদেনকারী সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে। আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে মিল রেখে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং ধারণা চালু করা হয়েছে এক দশক আগেই। গ্রিন ব্যাংকিং-এর আওতায় ব্যাংকগুলো পরিবেশবান্ধব শিল্প কারখানার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পরিবেশের জন্য হুমকি কোনো শিল্প উদ্যোগ, ব্যবসাবাণিজ্যে অর্থায়ন না করে ব্যাংকগুলোকে যাতে সবুজ শিল্পায়নে অধিকতর মনোযোগী হয়- সে লক্ষ্যে বিশেষ গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং খাতকে গ্রাহকবান্ধব করা তথা গণমুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ও সন্তুষ্টি বজায় রাখা, ব্যাংকিং সেবার মান সম্পর্কে গ্রাহক পর্যায়ে ক্ষোভ ও অভিযোগ দ্রুত নিস্পত্তি করা এবং উন্নততর গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যাংকে ‘ হেল্পডেস্ক’ চালু করা হয়েছে। গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যাংকগুলো আমানতকারী, বিনিয়োগকারী এবং অন্যান্য স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও সঠিক তথ্য দিতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক বিবরণী বাধ্যতামূলকভাবে পত্রিকায় প্রকাশ করা হচ্ছে। আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে আমানত বিমা স্কিম চালু করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো তাদের সুদহার, চার্জ, কমিশন, ফি, বিনিময় হার ইত্যাদি সাধারণ মানুষের জ্ঞাতার্থে অবহিতকরণের ব্যবস্থা করছে। জাল টাকার প্রতিরোধেও ব্যাংকগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারি পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ ও চাঙ্গা রাখার ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে বৈদেশিক রেমিট্যান্স। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশের প্রবাসী ভাইবোনদের পাঠানো রেমিট্যান্স ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে এবং সুবিধাভোগী আত্মীয়-পরিজনদের হাতে দ্রুততম অল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে। অতীতে অবৈধ উপায়ে হুন্ডির মাধ্যমে প্রবাসীরা দেশে তাদের উপার্জিত অর্থ পাঠাতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে নানা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেন। যার মধ্যে বিদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে অবৈধভাবে বেআইনী উপায়ে উপার্জিত অর্থ প্রেরণ বন্ধ করে ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈধভাবে অর্থ প্রেরণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণ অন্যতম। এ লক্ষ্যে রেমিট্যান্স প্রেরণকে সহজসাধ্য করতে বিভিন্ন বিদেশি মানি ট্রান্সফার কোম্পানির সাথে দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ড্রয়িং ব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছে। প্রবাসীদের বৈধ উপায়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে অধিক পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রেরণকে উৎসাহিত করতে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে ড্রয়িং ব্যবস্থার আওতায় প্রাপ্ত প্রবাসী রেমিট্যান্সের অর্থ সুবিধাভোগী পর্যায়ে বিতরণের সর্বোচ্চ সময়সীমা অনেক কমানো হয়েছে। বর্তমানে অবিশ্বাস্য কম সময়ের মধ্যে বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ সুবিধাভোগী ব্যাংক থেকে সহজভাবে উত্তোলন করতে পারছেন। বৈদেশিক কর্মসংস্থান তথা শ্রমিক তথা জনশক্তি রপ্তানিতে আর্থিক সহায়তা দান ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে বিনিয়োগ সুবিধা প্রদানসহ প্রবাসীদের কল্যাণার্থে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরাসরি প্রবাসীদের বিনিয়োগে বাংলাদেশে বর্তমানে তিনটি এনআরবি ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

জাতির পিতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের আদর্শের বাস্তবায়নে তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপসমূহ দেশ ও জাতির কল্যাণে অভাবনীয় সুফল এনে দিয়েছে। গত এক যুগেরও বেশি সময়ের মধ্যে তার গতিশীল বিচক্ষণ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিয়ে গেছেন তিনি। বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থার অবদান এ ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণমুখী ব্যাংক ব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে শেখ হাসিনা এদেশের অর্থনীতিতে নতুন যুগের সূচনা করেছেন সন্দেহ নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণমুখী আধুনিক উন্নত যুগোপযোগী ব্যাংক, ব্যাংক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, যা দেশের সবার কল্যাণ বয়ে আনছে। সবাই এর সুফল ভোগ করছেন। কিশ্বের অনেক উন্নত দেশের মতো ব্যাংকিং সেবা লাভ করছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। সবাই তেমন আধুনিক উন্নত ব্যাংকিং সেবা প্রাপ্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করছেন। গণমুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার অনবদ্য সাফল্যের একটি অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সন্দেহ নেই।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত