ঢাকা ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

একপাক্ষিক কোটা কিংবা কোটাহীনতা নয়, সাম্যের বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি

রাজু আহমেদ
একপাক্ষিক কোটা কিংবা কোটাহীনতা নয়, সাম্যের বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি

কোটার স্বপক্ষে কিংবা বিপক্ষে আলোচনা উত্থাপিত হলেই মুক্তিযুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি সামনে দাঁড়ায় বলে স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়া কঠিন। কোটা বিরোধিতার কথা উঠলে কেবল মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য বরাদ্দকৃত কোটা আলোচনার ফ্রন্টলাইনে চলে আসে। নিরপেক্ষভাবে কোটা সম্পর্কে কথা বলার ক্ষেত্রে এটাও বাঁধা। সেজন্য ঢালাওভাবে কোটা বিরোধিতা করা কিংবা চলমান কোটা নীতির সম্পূর্ণ পক্ষে থাকাণ্ড দুটোই অযৌক্তিক মনে হয়। যে চেতনায় বাংলাদেশের বীর সন্তানগণ মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, শত্রুসেনার বিপক্ষে লড়তে জীবন বাজি রেখেছিল সেই আদর্শের সাথে কোটা সম্পূরক নাকি সাংঘর্ষিক সেটা নিয়েও বহাস হতে পারে। আবার প্রতিবন্ধী কিংবা উপজাতিদের কোনো বাড়তি সুযোগ না দেওয়াও ন্যায্য মনে হচ্ছে না। তবে শতের মধ্যে ৫৬ শতাংশ কোটায় আর বাকি ৪৪ শতাংশ মেধায় চাকরি হবে- এই সমীকরণ রাষ্ট্রের স্বার্থে সমর্থনযোগ্য নয়। এখানে বৈষম্যে দুর্গন্ধ প্রবল। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের চাকরির বয়স আছে এ সংখ্যা একেবারেই সামান্য। মুক্তিযোদ্ধা কোটা যদি বীর যোদ্ধাদের ছেলে-মেয়ে পর্যন্ত বহাল রাখা হতো তবে এটা নিয়ে সেভাবে বিতর্ক তৈরি হতো না। মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদেরকে ছেলেমেয়েদের মতো কোটা দেওয়া হয়- এই নীতি সম্মুখে আসার পরে ২০১৮ সালে দেশব্যাপী তুমুল আন্দোলনের মুখে সরকার কোটা পদ্ধতি বিলুপ্ত করে। সংসদে সেদিন প্রধানমন্ত্রী কিছুটা রাগত স্বরেই বলেছিলেন যে, নারীদের জন্য তিনি কোটা রাখছেন সেই নারীরাই কোটাবিরোধি আন্দোলনে নামছে। কাজেই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগে কোনো কোটা থাকবে না। তবে আদালতের মাধ্যমে কোটা পদ্ধতি আবারো বহাল হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা, চাকরি প্রত্যাশীরা রাজপথে নেমে এসেছে। মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের একাংশ এবং দেশের শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ বৃহদাংশ এবং বুদ্ধিজীবীদের সমর্থনও তাদের পক্ষে। সম্পূর্ণ কোটা রাখা কিংবা একেবারেই কোটা বিলুপ্ত করা- কোনোটাই সম্পূর্ণ যৌক্তিক মনে হচ্ছে না বরং সংশোধন করে কোটার হার সহনীয় করা যেতে পারে। কোটা পদ্ধতি বহাল রাখলে দেশের মেধাবীদের দেশে ধরে রাখা যাবে না অন্যদিকে কোনো কোটা না থাকলে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী, শারীরিকভাবে অক্ষম শিক্ষিতদের সাথে অন্যায্য আচরণ করা হবে। কোটার যৌক্তিক বিন্যাস করে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করা যায় বলে মনে হয়। ৫৬ শতাংশ কোটা থেকে সংকোচন করে ১৫ শতাংশ কোটা বহাল রাখলে সেটা বিক্ষোভকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে। জনসংখ্যার অনুপাত অনুসারে উপজাতি ও প্রতিবন্ধী কোটা নির্ধারণ করতে হবে। শর্তসাপেক্ষে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ১০ শতাংশ নিয়ে আসতে হবে। তাতে উভয় দিকের স্বার্থ রক্ষা হবে বলে মনে করি। মুক্তিযোদ্ধার কোটার ক্ষেত্রে : প্রথমত- মুক্তিযোদ্ধার সন্তান যিনি কোটা ব্যবহার করে চাকরি পেয়েছেন তার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ আর কোটায় আবেদন করতে পারবে না। চাকরি থাকার পরেও যারা উত্তরসূরীদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা চাকরিজীবী মা-বাবার সন্তান হয়েও যারা নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারেনি তাদের আর কোটাধারী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। দ্বিতীয়ত- মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের মধ্যে একজন কোটায় চাকরি পাবে। বাকিরা সেই কোটা আর ব্যবহার করতে পারবে না। তবে পঙ্গু ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরীদের ক্ষেত্রে শর্ত সামান্য শিথিল করা যেতে পারে। তাদের সব সন্তান যোগ্য হলে চাকরি পাবে তবে নাতি-নাতনিদের কোটাধারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। তৃতীয়ত- মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদের কোটার সুবিধা দেওয়া যাবে না। এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। কোটাও এক প্রকার সম্পদ। উত্তরসূরী নির্ধারণের নীতিমালা অনুযায়ী বাবার সম্পদ ছেলে-মেয়ে পায়; সরাসরি নাতি-নাতনিরা নয়। কাজেই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের এমন কোনো অবদান নাই যে, কারণে তাদের সন্তানদেরও সেই কোটার রেশ দিতে হবে। এটা বহাল থাকলে বরং খোঁটা বাড়বে। আত্মসম্মানের প্রশ্নও জড়িত। কোটাধারীদের এখন সোজা চোখে দেখা হয় না। কোটা সামাজিক টিটকারিতে পরিণত হয়েছে। উপজাতি ও প্রতিবন্ধী কোটায় যথাক্রমে ৩ শতাংশ ও ২ শতাংশ চাকরি দেওয়া যায়। বাকি সব কোটা যেমন জেলা কোটা, নারী কোটা এ সবের কোনো প্রাসঙ্গিকতা ও যৌক্তিকতা এখন আর অবশিষ্ট নেই। বর্তমান বাংলাদেশ রাজধানী কিংবা উপজেলা শহর- কেউ আর কোনো ক্ষেত্রে কারো থেকে পিছিয়ে নেই। আগামী ১০ বছরের জন্য এই ১৫ শতাংশ কোটা বহাল রেখে পরবর্তী অবস্থা বিবেচনায় সংকোচন কিংবা সংশোধন করা যেতে পারে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, কোনো পদের বিপরীতে কোটাধারী না পাওয়া গেলে অবশ্যই মেধা কোটা থেকে তা পূরণ করতে হবে। কোনোভাবেই কোটাধারীর জন্য কোনো পদ সংরক্ষণ করা কিংবা পরবর্তী সময়ের জন্য পদ শূন্য রাখা যাবে না।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত