ঢাকা ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে স্টারমারের যাত্রা শুরু

রায়হান আহমেদ তপাদার
চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে স্টারমারের যাত্রা শুরু

১৯৬২ সালের ২ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া স্যার কিয়ার স্টারমার ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো হলবর্ন অ্যান্ড সেন্ট পানক্রাস আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। তিনি সুদীর্ঘ ২০ বছর ধরে কেমডেনের কেন্টিশ টাউনে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করে আসছেন। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শ্যাডো ব্রেক্সিট সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ছিলেন মানবাধিকার আইনজীবী। ১৯৯০ সালে তিনি ডোটি স্ট্রিট চেম্বার প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইউরোপিয়ান কোর্ট অব হিউম্যান রাইটসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আদালতে সফলতার সাথে মামলা পরিচালনা করেন। এর আগে তিনি ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত নর্দার্ন আয়াল্যান্ডের পুলিশিং বোর্ডে হিউম্যান রাইটস এডভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে তিনি ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের পাবলিক প্রসিকিউশনের ডাইরেক্টর ও ক্রাউন প্রসিকিউশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। কিয়ার স্টারমার লীডস ইউনির্ভাসিটি ও সেন্ট এডমাউন্ড হল অক্সফোর্ডে আইন শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি একাধিক গ্রন্থের লেখক। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে-থ্রি পিলার অব লিবার্টি, পলিটিক্যাল রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস ইন দ্য ইউকে এবং ইউরোপিয়ান রাইটস ল’। যার প্রকাশ কাল ছিল ১৯৯৬ এবং ১৯৯৯। চার বছর আগে কট্টর বামপন্থি রাজনীতিবিদ জেরেমি করবিনের জায়গায় লেবার পার্টির নেতৃত্বে আসেন স্যার কেয়ার স্টারমার। রাজনীতির ময়দানের একেবারে কেন্দ্রে তার দলকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এবং ভোটে ভালো ফল করার জন্য কাজ করছেন তিনি। গত ১৪ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে আছে লেবার পার্টি, এবারে জিতে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো। আইনজীবী হিসেবে বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের পর স্যার কিয়ার স্টারমার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। সংসদ সদস্য হন ৫০-এর কোঠায় এসে। তবে রাজনীতি নিয়ে তার বরাবরই আগ্রহ ছিল। যুবা অবস্থায় তিনি ছিলেন উগ্র বামপন্থি। ১৯৬২ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে একজন, কিয়ার স্টারমার বেড়ে ওঠেন দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের সারে-তে। শ্রমজীবী শ্রেণির সঙ্গে তার জীবনের যোগের কথা প্রায়শই বলতে শোনা যায়, স্যার কিয়ার স্টারমারকে। তার বাবা একটা কারখানার সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক হিসাবে কাজ করতেন এবং মা ছিলেন নার্স। তার পরিবারও কট্টর লেবার পার্টির সমর্থক ছিল, যার প্রতিফলন পাওয়া যায় তার নামে। স্কটিশ খনি শ্রমিক কিয়ের হার্ডির নাম অনুসারে তার নাম রাখা হয়েছিল। লেবার পার্টির প্রথম নেতা ছিলেন কেয়ার হার্ডি। বড় হয়ে ওঠার সময় স্যার কেয়ার স্টারমারের পারিবারিক জীবন খুব সুখকর ছিল না। দূরত্ব রেখে চলতেন তার বাবা। মা জীবনের দীর্ঘকাল ‘স্টিল’স ডিজিজ’ নামক এক ধরনের অটো-ইমিউন ডিজিজে ভুগেছেন। রোগের কারণে ধীরে ধীরে হাঁটার এবং কথা বলার ক্ষমতা হারান তার মা। একসময় তার পা কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির স্থানীয় যুব শাখায় যোগ দেন কেয়ার স্টারমার। কিছু সময়ের জন্য উগ্র বামপন্থি একটি পত্রিকার সম্পাদনাও করেছিলেন। স্যার কিয়ার স্টারমার তার পরিবারের প্রথম সদস্য যিনি শিক্ষা লাভ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছেন। লিডস এবং অক্সফোর্ডে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যারিস্টার হিসাবে মানবাধিকার নিয়ে কাজও করেছেন। সেই সময় ক্যারিবিয়ান এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তির জন্য তিনি কাজ করেন। ১৯৯০-এর দশকে একটা বিখ্যাত মামলায়, তিনি দু’জন পরিবেশ আন্দোলনকারীর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন যাদের বিরুদ্ধে ‘ম্যাকডোনাল্ডস’ মামলা করেছিল। ২০০৮ সালে, স্যার কেয়ার পাবলিক প্রসিকিউশনের ডিরেক্টর এবং ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যার অর্থ, তিনি ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের সবচেয়ে সিনিয়র প্রসিকিউটর সরকারি কৌঁসুলি ছিলেন। ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি চাকরি করেন। ২০১৪ সালে তাকে নাইট উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রথমবার সংসদে যান ২০১৫ সালে। লন্ডনের হবর্ন অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্রাসের সাংসদ হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কট্টর বাম রাজনীতিবিদ জেরেমি করবিনের নেতৃত্বে লেবার পার্টি তখন বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। অভিবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকলাপ নজরে রাখার জন্য স্যার কেয়ারকে ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন জেরেমি করবিন। যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়ার পরে, স্যার কেয়ারকে ‘শ্যাডো ব্রেক্সিট মন্ত্রী’ হিসাবে নিয়োগ করা হয়। ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর লেবার পার্টির নেতা হওয়ার সুযোগ পান স্যার কিয়ার স্টারমার। লেবার পার্টির জন্য সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল এটা। ১৯৩৫ সালের পর সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে হেরেছিল ওই দল, যা জেরেমি করবিনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। পানি ও জ্বালানি কোম্পানির জাতীয়করণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষাদানের পক্ষে কথা বলে একটা বামপন্থি প্ল্যাটফর্মে লেবার পার্টির নেতা হিসাবে জয় লাভ করেন স্যার কেয়ার স্টারমার। জেরেমি করবিন লেবার পার্টিকে বামপন্থি এবং মধ্যপন্থিদের মধ্যে ভাগ করেছিলেন। স্যার কিয়ার স্টারমার কিন্তু বলেছিলেন তিনি পার্টিকে একত্রিত করতে চান। একই সঙ্গে করবিনের চিন্তাধারাও ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। তবে দলের মধ্যপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন স্যার কিয়ার স্টারমার। করবিন দলের নেতৃত্বে থাকাকালীন ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে যে বিতর্ক হয়েছিল, তার জেরে তাকে সংসদীয় লেবার পার্টি থেকে বরখাস্ত করেন স্যার কেয়ার স্টারমার। তবে দলের বামপন্থি অনেকে বলেন, সংসদীয় প্রার্থী হিসেবে যাতে শুধুমাত্র মধ্যপন্থি সদস্যরাই দাঁড়াতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করতে স্যার কিয়ার স্টারমার দলের অভ্যন্তরে দীর্ঘমেয়াদী অভিযান চালাচ্ছেন। স্যার কিয়ার স্টারমার তার নেতৃত্বের প্রচারণার সময় যাই বলে থাকুন না কেন, লেবার পার্টিকে নির্বাচনে লড়ার উপযুক্ত করে তুলতে দলকে মধ্যপন্থার দিকে নিয়ে গেছেন তিনি। একাধিক প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রেও চিত্রটা বদলেছে। যুক্তরাজ্যের জনসাধারণের আর্থিক অবস্থার খারাপ অবস্থার কথা উল্লেখ করে কয়েকটা পরিকল্পনা বাদ দিয়ে তিনি অনেক ব্যয়বহুল নীতি ত্যাগ করেছেন। পানি ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জাতীয়করণের জন্য তার যে আগের প্রস্তাব ছিল, তাও এখন তা বাদ দিয়েছেন স্যার কিয়ার স্টারমার। তবে তিনি গ্রেট ব্রিটিশ রেলওয়ে নামে একটি নতুন সংস্থার অধীনে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় সব যাত্রীবাহী রেল পরিষেবা সরকারি মালিকানায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কলেজ শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাতিলের আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছেন তিনি। স্যার কেয়ার স্টারমার জানিয়েছে এর ব্যয়ভার সরকার বহন করতে পারবে না।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত