ঢাকা ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

‘এল নিনো’র প্রভাব এবং জলবায়ু সমস্যা

প্রদীপ সাহা, লেখক কলামিস্ট
‘এল নিনো’র প্রভাব এবং জলবায়ু সমস্যা

জলবায়ু সমস্যা বিশ্বব্যাপী আজ এক বিরাট সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, ‘এল নিনো’ এ সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।

এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য, সুপেয় পানি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে। একটানা ৩ বছর ‘লা নিনা’-এর দাপটের পর ‘এল নিনো’র আবির্ভাবের কথা নিশ্চিত করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘এল নিনো’ ছিল প্রায় ৯৫ ভাগ।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত ‘এল নিনো’র চক্র স্থানীয়ভাবে খরা এবং ক্ষুধার পাশাপাশি প্রাণীবাহিত রোগের সংখ্যাও বৃদ্ধি করে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড সোসাইটি’র বিজ্ঞানী ওয়াল্টার ব্যাথগেন বলেন, ‘এল নিনোর মানে এই নয় যে, বিশ্বব্যাপী এ বছর অন্য বছরের চেয়ে বেশি দুর্যোগ হবে। এটি বিশ্বের বিভিন্ন অংশে গুরুতরভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।’

স্প্যানিশ ভাষায় ‘এল নিনো’র অর্থ হলো ছোট ছেলে এবং ‘লা নিনা’র অর্থ ছোট বালিকা। ‘এল নিনো’ এবং ‘লা নিনা’ হচ্ছে ‘এল নিনো-সাউদার্ন অসকিলেশন’ (ইএনএসও) নামক আবহাওয়ার প্যাটার্নের দুটি অংশ। এটি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর বাতাসের ধরন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্বারা চিহ্নিত। ‘এল নিনো’ বলতে ইএনএসও-এর উষ্ণায়ন পর্যায়কে এবং ‘লা নিনা’ শীতলকরণ পর্যায়কে বোঝায়। ‘এল নিনো’র বছরগুলোতে তাপমাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, যা ‘লা নিনা’র সময়ে প্রায় একই পরিমাণে হ্রাস পায়। দুই প্যাটার্নের ওঠাণ্ডনামার ঘটনাটি প্রায়ই একটি নিরপেক্ষ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। ‘এল নিনো’ সাধারণত প্রতি ৪ থেকে ৭ বছরে একবার দেখা যায়। এর স্থায়িত্ব ১২ থেকে ১৮ মাস। তবে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার ‘এল নিনো’ দেখা গেছে এবং এটি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ‘লা নিনা’। সাম্প্রতিক বছর এবং মাসগুলোতে পৃথিবী বারবার রেকর্ড তাপমাত্রায় পৌঁছেছে।

‘বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা’র (ডব্লিউএমও) মতে, জুলাই ২০২৩-এর গড় তাপমাত্রা রেকর্ডের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল, যা ১৯৯১ থেকে ২০২১-এর জুলাই মাসের গড়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ। ডব্লিউএমও-র জলবায়ু পরিষেবার প্রধান ক্রিস হিউইট বলেন, ‘এল নিনোর প্রভাবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশি। তবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ আভাস দিচ্ছে যে, প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৬৬ ভাগ। ২০২৪ সালে ‘এল নিনো’র প্রভাব সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট হবে। পৃথিবী পরবর্তী অর্ধদশকে তার উষ্ণতম বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।’ বিজ্ঞানী ওয়াল্টার বেথগেন বলেন, ‘খরা এবং খাদ্য নিরাপত্তায় ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য ‘এল নিনো’র বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।’ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ‘এল নিনো’ ধানের ফসল কাটার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ এরই মধ্যে ফসল মজুদ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিচ্ছে। ভারত অনেক ধরনের চাল রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। ইন্দোনেশিয়ার কিছু অংশ দ্রুত ফসল কাটার পরিকল্পনা করছে। ‘এল নিনো’র কারণে প্রায়ই দক্ষিণ এশিয়ায় বিপজ্জনক তাপপ্রবাহ দেখা যায়। তাপের আকস্মিক পরিবর্তন সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান গ্রেগরি ওয়েলেনিয়াস বলেন, ‘গত বছর ইউরোপে তাপজনিত কারণে ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্য যেকোনো মারাত্মক আবহাওয়ার তুলনায় তাপপ্রবাহে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।’

এক গবেষণায় দেখা গেছে, হঠাৎ উষ্ণ আবহাওয়া মানবদেহকে প্রভাবিত করে। কিছু গবেষণায় তাপপ্রবাহ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে একটি যোগসাজশ দেখানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপের কারণে তৈরি সবচেয়ে সাধারণ নেতিবাচক স্বাস্থ্য প্রভাব হলো ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাব। জলবায়ু প্রভাব ও অভিযোজনের প্রধান মেডেলিন থমসন বলেছেন, ‘পূর্ববর্তী এল নিনোর বছরগুলোতে এ ধরনের অনেক প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা গেছে। উদাহরণস্বরূপ কেনিয়ায় ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সালে ‘এল নিনো’র সময় মশার প্রজনন বৃদ্ধি অসম্ভব বেশি ছিল। পূর্ব আফ্রিকায় ব্যাপক ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে ‘এল নিনো’র প্রভাবের সময় একই ধরনের নিদর্শন দেখা যায়। তবে ‘এল নিনো’ ব্যাপক বৈশ্বিক বিপর্যয়ের পরিবর্তে এ ধরনের ভৌগোলিকভাবে স্থানীয় বা আঞ্চলিক ঘটনার মাধ্যমে বেশি প্রকাশ পায়। কাজেই এখনো সময় আছে, আমাদের যে কোনোভাবেই জলবায়ু সমস্যা ঠেকাতে হবে। এই জলবায়ু সমস্যা ঠেকাতে না পারলে একদিন আমাদেরই প্রশ্ন করতে হবে- আমরা কী ভুলই না করেছি!

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত