ঢাকা ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের অঙ্গীকার হোক ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠার

মো. তাহমিদ রহমান
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের অঙ্গীকার হোক ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠার

বিশ্বের জনসংখ্যা যখন ৫০০ কোটি হতে চলেছিল ঠিক তখনি জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিচালনা পরিষদের মাধ্যমে ১৯৮৯ সালের ১১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান দফতর ইউএস সেনসাস ব্যুরো এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি বিশ্বের মোট জনসংখ্যা পৌঁছেছে ৮০১ কোটি ৯৮ লাখ ৭৬ হাজার ১৮৯ জনে। যা ২০২৩ সালের তুলনায় বেড়েছে ৭ কোটি ৫১ লাখ ৬২ হাজার ৫৪১ জন। মূলত বিশ্ব জনসংখ্যার বিভিন্ন সমস্যাকে চিহ্নিত করে বিশেষ করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব, লিঙ্গ ভারসাম্য, দারিদ্র্য, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য এবং মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন করার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ১১ জুলাই বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতি বছর আমাদের দেশেও বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়ে আসছে। রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক উপাদানগুলোর মধ্যে জনসংখ্যা অন্যতম। জনসংখ্যা ব্যতীত রাষ্ট্র গঠন কল্পনাতীত। আবার এই জনসংখ্যা যদি জনশক্তিতে রূপান্তরিত না হয় তাহলে রাষ্ট্রকে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই জনসংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমাদের সীমিত ভৌগোলিক আয়তন এবং সীমিত উৎপাদন ব্যবস্থায় জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে অনেক দিকে ভাবতে হয়। বর্তমান বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে। বিগত দেড় দশকে সরকারের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কাঠামোগত উন্নয়ন ও উল্লেখযোগ্য সামাজিক অগ্রগতির মাধ্যমে দেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে ধাবিত হয়েছে। এরই মধ্যে সরকার রূপকল্প-২০২১ সাফল্যের সাথে বাস্তবায়ন করায় দেশের মানুষের গড় আয়ু, শিক্ষার হার, শিল্পোৎপাদন, রাজস্ব আয়, জনশক্তি রপ্তানি ও জিডিপির হার বেড়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে সুখী, উন্নত ও সমৃদ্ধশালী স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার ১. স্মার্ট নাগরিক ২. স্মার্ট অর্থনীতি ৩. স্মার্ট সরকার ও ৪. স্মার্ট সমাজ এই চারটি ভিত্তি নির্ধারণ করেছে। এই চারটি ভিত্তির সম্মিলিত বাস্তবায়নই হবে আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ। স্মার্ট নাগরিকের মাধ্যমে টেকসই স্মার্ট সমাজ গড়ে তুলতে হলে সমাজব্যবস্থাকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। সমাজ ব্যবস্থায় সবার জন্য সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ব্যবস্থার উন্নয়নে পিছিয়ে পড়া, সুবিধা বঞ্চিত শিশু, শ্রমজীবী শিশু, নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, তৃতীয় লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর উন্নতি সাধনের জন্য উপযুক্ত নীতিমালা গ্রহণ, আইন প্রণয়ন ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ ২০২১-এ বলা হয়, মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠী। আবার ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠী দেখানো হয়েছে। উল্লিখিত দুই জরিপে দেখা যায়, ২০২১ সালের তথ্যমতে মোট প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির সংখ্যা ৪৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৪১ জন। আবার ২০২২-এর তথ্যমতে ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৬০৪ জন। আবার সমাজসেবা অধিদপ্তরের চলমান প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে মোট প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির সংখ্যা ৩৩ লাখ ১৯ হাজার ৭২৭ জন, যারা সরকারের সেবা সনদ প্রাপ্তির জন্য স্বীকৃত। এতে ধারণা করা যায়, বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তি শনাক্তকরণ ও তার পরিসংখ্যাণ সঠিক ও সার্বিকভাবে হচ্ছে না। এজন্য সংখ্যাগত তারতম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটা বলা অনস্বীকার্য যে, প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির ধরন ও পরিসংখ্যান সঠিকভাবে না হলে তাদের নিয়ে যথাযথ পরিকল্পনা করা ও সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা সম্ভব নয়। ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের ন্যায়সঙ্গত সমাজব্যবস্থার দ্বারা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে প্রবেশ করতে হবে যাতে করে সমাজের মানুষের জন্য তৈরিকৃত সুযোগগুলোতে সবাই সমান সুফল ভোগ করতে পারে। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে টেকসই করার জন্য সব সুযোগ-সুবিধা পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীর দ্বারগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(১) এবং ২৮(৪) নং অনুচ্ছেদে সবার জন্য সমান অধিকার ও সুযোগের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠী চরম বৈষম্যের শিকার হয়। বিভিন্ন কারণে পিছিয়েপড়া বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করাতে হলে এবং উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসতে হলে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। সমগ্র বিশ্বে এখনো অসংখ্য জনগোষ্ঠী প্রান্তিক জীবনযাপন করছে বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই সমাজ ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হলে এই জনগোষ্ঠীকে বিশেষ শিক্ষায় শিক্ষিত করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কর্মক্ষেত্রসহ সামাজিক সব ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গত প্রবেশগম্যতার অধিকার প্রদান করতে হবে। সমাজের পিছিয়েপড়া শ্রেণির মধ্যে সবচেয়ে অসহায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, সেরিব্রাল পালসি ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন) ব্যক্তিগণ। স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে পিছিয়েপড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এসব মানুষদের মূলধারার কাজে অংশগ্রহণের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আইন প্রণয়ন ও তার কার্যকর প্রয়োগ ঘটাতে হবে। দেশের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর করার মাধ্যমে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারকে অবশ্যই তাদের প্রাধান্য দিয়ে কর্মপরিকল্পনা সাজাতে হবে। আমাদের মাথায় রাখতে হবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ সমাজের অংশ। তাদের মেধা, জ্ঞান, দক্ষতাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণে পুঁজি হিসেবে বিনিয়োগ করতে হবে। ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমতায় প্রতিষ্ঠিত হোক আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা।

প্রভাষক (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ) নূরুল আমিন মজুমদার ডিগ্রি কলেজ, লাকসাম, কুমিল্লা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত