খাদ্য নিরাপত্তা : যুদ্ধ, জলবায়ু ও বাজার রাজনীতির ত্রিমুখী চাপ
হেনা শিকদার
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৫, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মানবিক সভ্যতার ভিত্তি হলো খাদ্য। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মৌলিক চাহিদার তালিকায় অন্ন বা খাদ্যই প্রধান। একটি জাতির সার্বিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতির মূলে রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই পর্যায়ে এসে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা এক জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই সংকট একক কোনো কারণে নয়, বরং যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাজার রাজনীতির এক বিধ্বংসী ত্রিমুখী চাপের ফল। এই তিনটি শক্তি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে এমন এক সংকট তৈরি করেছে, যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে ক্ষুধার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
যুদ্ধের দামামা : ভেঙে পড়া সরবরাহ শৃঙ্খল: খাদ্য নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে সরাসরি ও তাৎক্ষণিক আঘাত হানে যুদ্ধ ও সংঘাত। সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ইউক্রেনকে বলা হয় ‘বিশ্বের রুটির ঝুড়ি’ (Breadbasket of the World)। এই যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনের কৃষি উৎপাদনকেই ধ্বংস করেনি, বরং কৃষ্ণসাগর (Black Sea) দিয়ে শস্য রপ্তানির পথকেও রুদ্ধ করে দিয়েছে। ‘ব্ল্যাক সি গ্রেইন ডিল’ বা কৃষ্ণসাগর শস্য চুক্তির মতো কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো বারবার বাধার মুখে পড়ায় বিশ্ববাজারে গম, ভুট্টা ও সূর্যমুখী তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু শস্য উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান সার রপ্তানিকারক দেশ। যুদ্ধের ফলে সারের বাজারে যে আগুন লেগেছে, তার আঁচ পড়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব কৃষিপ্রধান দেশের ওপর। সারের দাম বাড়লে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ে, যার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হয় সাধারণ ভোক্তা। যুদ্ধ মানেই জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল বাজার। আর জ্বালানির দাম বাড়লে সেচ, পরিবহন এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচও লাগামহীন হয়ে পড়ে। এভাবে, একটি আঞ্চলিক সংঘাত খুব দ্রুত বৈশ্বিক খাদ্য সংকটে রূপান্তরিত হয়।
জলবায়ুর রোষ, প্রকৃতির প্রতিশোধ : যদি যুদ্ধ হয় আকস্মিক আঘাত, তবে জলবায়ু পরিবর্তন হলো এক নীরব ঘাতক, যা ধীরে ধীরে আমাদের খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে আবহাওয়ার ধরনে যে চরম পরিবর্তন (Extreme Weather Events) এসেছে, তা কৃষির জন্য অশনিসংকেত। আফ্রিকার শিং (Horn of Africa) অঞ্চলে আমরা দেখছি ইতিহাসের ভয়াবহতম খরা, যা লাখ লাখ মানুষকে দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো দেশগুলো দেখছে প্রলয়ংকরী বন্যা, যা এক নিমেষে হেক্টরের পর হেক্টর জমির ফসল ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো ব-দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য বিপদ আরও গভীর। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, যা ধানসহ বহু প্রচলিত ফসল চাষের অযোগ্য করে তুলছে। অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টি, অসময়ে বন্যা, তাপদাহ এবং সুপার সাইক্লোনের মতো দুর্যোগগুলো এখন অনেক বেশি নিয়মিত ঘটনা। এর ফলে ফসলের উৎপাদনশীলতা (Yield) কমছে, কৃষি অর্থনীতির চাকা মন্থর হয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যৎ সংকট নয়; এটি বর্তমানের এক রূঢ় বাস্তবতা, যা সরাসরি আমাদের ভাতের থালায় আঘাত হানছে।
বাজার রাজনীতি, সিন্ডিকেটের অদৃশ্য হাত: যুদ্ধ এবং জলবায়ু যখন খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত করে, ঠিক তখনই আসরে নামে তৃতীয় শক্তি-বাজার রাজনীতি। এটি খাদ্য সংকটের সবচেয়ে জটিল এবং প্রায়শই অদৃশ্য একটি দিক। বৈশ্বিক বাজার থেকে শুরু করে স্থানীয় কাঁচাবাজার পর্যন্ত, খাদ্য এখন একটি মৌলিক অধিকারের চেয়ে বড় একটি ব্যবসায়িক পণ্যে (Commodity) পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজার কারসাজি : গুটিকয়েক বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক শস্য বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। তারা প্রায়শই আন্তর্জাতিক ফটকা বাজারে (Speculation Market) বিনিয়োগ করে খাদ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এবং দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটে নেয়।
রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা : যখন কোনো দেশ অভ্যন্তরীণ বাজার সামাল দিতে হিমশিম খায়, তখন তারা চাল, গম, পেঁয়াজ বা চিনির মতো নিত্যপণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ভারত, ভিয়েতনাম বা আর্জেন্টিনার মতো বড় রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি হঠাৎ সিদ্ধান্তে বিশ্ববাজারে যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।
অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট : সংকটের সুযোগ নেয় স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। একেই আমরা ‘সিন্ডিকেট’ বলি। যুদ্ধ বা বৈশ্বিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে এই চক্রগুলো পণ্য মজুদ (Hoarding) করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক নিয়মকে পাশ কাটিয়ে তারা একচেটিয়াভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভোক্তাদের পকেট কাটে। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙা প্রায়শই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ত্রিমুখী চাপের সম্মিলিত ফল, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: এই ত্রিমুখী চাপের মুখে বাংলাদেশের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও আমদানিনির্ভর দেশ সবচেয়ে বেশি দুর্বল (uvlnerable)। একদিকে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ শিকার, যা আমাদের নিজস্ব উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। অন্যদিকে, আমাদের প্রয়োজনীয় ভোজ্যতেল, গম, চিনি, ডাল এবং মসলার বড় অংশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়। যখন ইউক্রেনে যুদ্ধ বাধে বা ভারত চাল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তখন আমাদের বাজারে তার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট। ফলাফলস্বরূপ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, আমদানি খরচ বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ কারসাজির ফলে খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে পুষ্টিহীনতা বাড়ছে, বিশেষত শিশু ও নারীরা এর প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছে।
উত্তরণের পথ, সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয় : এই জটিল সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কোনো সহজ বা একক সমাধান নেই। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
বৈশ্বিক পর্যায়ে : যুদ্ধ বন্ধ এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মানবিক করিডোর নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতা অপরিহার্য। পাশাপাশি, জলবায়ু তহবিলের (Climate Finance) মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সহায়তা করতে হবে।
জাতীয় পর্যায়ে : বাংলাদেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। বিশেষ করে, জলবায়ু-সহনশীল (যেমন : লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ধান) জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, কৃষকদের প্রণোদনা প্রদান এবং সেচ ও সারের ওপর ভর্তুকি অব্যাহত রাখা জরুরি।
সুশাসন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- বাজার রাজনীতির লাগাম টেনে ধরা। শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে সরকারের সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা (যেমন: টিসিবি-কে আরও শক্তিশালী করা) জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে মজুদের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে স্বচ্ছ রাখা অপরিহার্য। খাদ্য নিরাপত্তা শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। যুদ্ধ, জলবায়ু ও বাজার রাজনীতির এই ত্রিমুখী চাপ মোকাবিলা করতে না পারলে আমাদের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDG) অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে। তাই বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শুধু আমরা আগামীর ক্ষুধার্ত বিশ্বের এই ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব।
হেনা শিকদার
দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
