কোথায় হারিয়ে গেল পুরান ঢাকার সেই ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘ক্ষিরি’
হেনা শিকদার
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুরান ঢাকা মানেই এক ধোঁয়া ওঠা জাদুকরি সন্ধ্যা। সরু গলি, রিকশার টুংটাং আওয়াজ, আর তার সঙ্গে বাতাসে ভেসে আসা কয়লার আগুনে পোড়া মাংসের তীব্র সুবাস। নাজিরাবাজার, চকবাজার কিংবা চানখারপুল- সন্ধ্যে নামলেই এসব এলাকা জেগে ওঠে রসনাদায়ক সব খাবারের পসরা সাজিয়ে। বাকরখানি, কাচ্চি বিরিয়ানি, কিংবা সুতি কাবাবের ভিড়ে একসময় যে খাবারটি ভোজনরসিকদের প্লেটে রাজত্ব করত, তা হলো- ‘ক্ষিরি’ বা ‘খিরি’। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, গত এক দশকে পুরান ঢাকার খাবারের মানচিত্র থেকে এই ঐতিহ্যবাহী পদটি যেন নিঃশব্দে হারিয়ে যেতে বসেছে।
ক্ষিরি আসলে কী? কেন এর এতো কদর?
অনেকের মনেই ভুল ধারণা থাকে যে ক্ষিরি হয়তো চর্বি বা কলিজার কোনো অংশ। আদতে তা নয়। ক্ষিরি হলো গরুর ওলান বা দুগ্ধগ্রন্থি (টফফবৎ)। এর গঠন এবং স্বাদ সাধারণ মাংসের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
টেক্সচার : ক্ষিরির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘টেক্সচার’। এটি মাংসের মতো আঁশযুক্ত নয়, আবার চর্বির মতো গলে যাওয়ার মতোও নয়। এটি চিবোলে অনেকটা ‘কচকচে’ ভাব থাকে, কিন্তু ভেতরটা হয় মাখনের মতো নরম।
স্বাদ : ওলান হওয়ার কারণে এতে প্রাকৃতিকভাবেই হালকা দুগ্ধজাত বা ‘মিল্কি’ স্বাদ থাকে। যখন এর সঙ্গে পুরান ঢাকার কড়া মশলা, আদা-রসুন আর মরিচের ঝাঁজ মেশানো হয়, তখন এক অভাবনীয় স্বাদের বিস্ফোরণ ঘটে।
সোনালী অতীত : যখন ক্ষিরি ছিল আভিজাত্য
নব্বইয়ের দশক কিংবা তারও আগে, পুরান ঢাকার কাবাবের দোকানগুলোতে শিক কাবাব আর বটি কাবাবের পাশেই সম্মানের সঙ্গে ঝোলানো থাকত সাদাটে রঙের ক্ষিরির শিক। সন্ধ্যায় পরাটা বা লুচির সঙ্গে এক শিক পোড়া ক্ষিরি কাবাব, সঙ্গে এক চিমটি বিট লবণ আর লেবুর রস- এটুকুই ছিল ঢাকাইয়াদের সান্ধ্যকালীন আড্ডার প্রাণ। তখনকার বাবুর্চিরা বলতেন, ক্ষিরি রান্না করা বা পোড়ানো হলো এক ধরনের শিল্প। কারণ একটু বেশি আঁচে দিলেই এটি রাবারের মতো শক্ত হয়ে যায়, আবার কম আঁচে কাঁচা থেকে যায়। সেই নিখুঁত আগুনের আঁচ বোঝার কারিগর এখন হাতেগোনা।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্য? আজ যদি আপনি নাজিরাবাজার বা চকবাজারে ক্ষিরি খুঁজতে যান, দশটি দোকানের মধ্যে হয়তো একটিতে এটি খুঁজে পাবেন, অথবা হয়তো পাবেনই না। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে-
প্রস্তুতির জটিলতা ও সময়সাপেক্ষতা : ক্ষিরি প্রস্তুত করা অত্যন্ত ধৈর্যের কাজ। এটি খুব ভালো করে পরিষ্কার করতে হয়, দীর্ঘক্ষণ সেদ্ধ করতে হয় এবং তারপর বিশেষ কায়দায় কাটতে হয়। বর্তমানের ‘ফাস্ট ফুড’ ঘরানার কাবাব সংস্কৃতিতে দোকানদাররা এত সময় দিতে চান না। তারা সহজলভ্য ব্রয়লার মুরগির চাপ বা বিফ বটি বিক্রি করতেই বেশি আগ্রহী।
কাঁচামালের অভাব : আগে কসাইখানায় আলাদা করে ক্ষিরি বা ওলান বিক্রি হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে এটি মাংসের সঙ্গেই মিশিয়ে দেওয়া হয় অথবা আলাদা করে সংরক্ষণ করা হয় না। ফলে রেস্তোরাঁ মালিকরা চাইলেও নিয়মিত জোগান পান না।
নতুন প্রজন্মের রুচির পরিবর্তন : বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই চিজ, মেয়োনিজ বা সস দেওয়া গ্রিল্ড আইটেমে অভ্যস্ত। ক্ষিরির সেই ‘অফবিট’ টেক্সচার বা ধরণ অনেকের কাছেই অপরিচিত। চাহিদার অভাবেই জোগান কমে গেছে।
স্বাস্থ্য সচেতনতা বনাম ভুল ধারণা : অনেকে মনে করেন ক্ষিরি মানেই চর্বি এবং এটি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যদিও পরিমিতি বোধ থাকলে এটি যেকোনো রেড মিটের মতোই, কিন্তু চর্বি ভেবে অনেকেই এটি এড়িয়ে চলেন।
এখনও কি কোথাও পাওয়া যায়?
একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলাটা ভুল হবে। পুরান ঢাকার অলিগলিতে কিছু প্রবীণ কাবাব কারিগর এখনও এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
নাজিরাবাজার : এখানকার কিছু পুরোনো দোকানে মাঝেমধ্যে ক্ষিরি পাওয়া যায়, তবে তা এখন অনেকটাই ‘লিমিটেড এডিশন’।
চকবাজার ও লালবাগ : বিশেষ বিশেষ দিনে বা আগে থেকে অর্ডার দিলে কিছু বাবুর্চি এখনো সেই পুরনো স্বাদের ক্ষিরি তৈরি করে দেন।
মোহাম্মদপুর ও মিরপুর (বিহারী ক্যাম্প) : ঢাকার বিহারী ক্যাম্পগুলোতে এখনও ক্ষিরি কাবাব বা গুর্দা-ক্ষিরির মিশ্রণ বেশ জনপ্রিয়, তবে তা পুরান ঢাকার আসল রেসিপি থেকে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
খাবার শুধু ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম নয়, এটি একটি জনপদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ। পুরান ঢাকার ক্ষিরি কাবাব শুধু একটি খাবার নয়, এটি ঢাকাইয়া সংস্কৃতির একটি অধ্যায়।
চিকেন ফ্রাই আর বার্গারের যুগে আমরা যদি আমাদের শেকড়ের স্বাদগুলোকে ভুলে যাই, তবে একদিন আমাদের নিজস্ব খাদ্যের ভান্ডার শূন্য হয়ে যাবে। হয়তো আপনার আমার আগ্রহই আবার ফিরিয়ে আনতে পারে, সেই হারিয়ে যাওয়া স্বাদ। ধোঁয়া ওঠা কয়লার আগুনে আবার পুড়তে শুরু করবে ঐতিহ্যবাহী ক্ষিরি।
হেনা শিকদার
দর্শন বিভাগ
