নিস্তব্ধ আকাঙ্ক্ষা : ফিরে না আসা মিছিলে হাজারও শরণার্থী

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতি বছর ১৮ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে ‘আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস’ পালন করা হয়। বিশ্বের লাখ লাখ অভিবাসীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই দিবসটি পালিত হয়। অভিবাসীদের মর্যাদা রক্ষা এবং অনিয়মিত অভিবাসন রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এই দিবসের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

১৯৯০ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘সব অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশন’ গৃহীত হয়। পরবর্তীতে, ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৮ ডিসেম্বরকে দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিবাসীদের কল্যাণে সভা, সেমিনার এবং নানা সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশেও সরকারিভাবে দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়।

২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসের বৈশ্বিক এবং জাতীয় দুটি আলাদা প্রতিপাদ্য রয়েছে। প্রতিপাদ্য দুটি নিম্নরূপ: ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ও জাতীয় প্রবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের নির্ধারিত প্রতিপাদ্য হলো- ‘দক্ষতা নিয়ে যাবো বিদেশ, রেমিট্যান্স দিয়ে গড়ব স্বদেশ’। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) ২০২৫ সালের জন্য মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে- ‘¸ Great Story : Cultures and Development’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে অভিবাসনের মাধ্যমে মানুষের চলাচল কীভাবে সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে এবং টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখে তা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে অভিবাসনের প্রধান পরিসংখ্যানগুলো নিচে দেওয়া হলো-

বর্তমানে বিশ্বে আন্তর্জাতিক অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি ৪০ লাখ। এই সংখ্যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৩.৭ শতাংশ। অভিবাসীদের প্রথম পছন্দ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে রয়েছে, যেখানে প্রায় ৫ কোটি ১০ লাখ থেকে ৫ কোটি ২০ লাখ আন্তর্জাতিক অভিবাসী বসবাস করছেন। এছাড়া জার্মানি, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। সবচেয়ে বেশি অভিবাসী পাঠিয়েছে ভারত (প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ)। এর পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে চীন, মেক্সিকো, ইউক্রেন এবং রাশিয়া।

২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্বে সংঘাত ও সহিংসতার কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ২৬ লাখ। এর মধ্যে শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৩৭ লাখ। অভিবাসী পাঠানোর দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। বর্তমানে প্রায় ৭৪ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে অবস্থান করছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা কিছুটা বেশি (প্রায় ৫২ শতাংশ), আর নারীর হার প্রায় ৪৮ শতাংশ। বাংলাদেশি অভিবাসীদের এই যন্ত্রণাদায়ক বাস্তুচ্যুতি শুধু সংখ্যার কোনো পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি হাজারও পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের এক করুণ উপাখ্যান।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) এবং ব্র্যাকের তথ্যমতে, প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক নিপীড়ন এবং উন্নত জীবনের আশায় অনিরাপদ পথে পাড়ি জমায়। ২০২৪-২৫ সালের সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা মামলার ভয়ে গত কয়েক বছরে কয়েক লাখ মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছে। এই পরিসংখ্যানগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকে ভিটেমাটি হারানোর হাহাকার।

রাতের অন্ধকার ছিঁড়ে একটি জরাজীর্ণ ট্রলার ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। ট্রলারের এক কোণে কুঁকড়ে বসে আছেন ৩০ বছর বয়সি মাসুম (ছদ্মনাম)। বাংলাদেশে তার ছিল সাজানো সংসার, ছোট এক টুকরো জমি আর সোনালী স্বপ্নের হাতছানি। কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা আর গ্রাম্য কোন্দলে তার নামে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। নিজের জন্মভূমিতেই তিনি হয়ে পড়েন ‘আগন্তুক’।

দেশ ছাড়ার আগের রাতে মাসুম তার বৃদ্ধা মায়ের পা ছুঁয়ে বিদায় নিচ্ছিলেন। মা জানতেন না তার ছেলে কোন অনিশ্চিত পথে যাচ্ছে। মা শুধু বলেছিলেন, ‘বাবা, বিদেশে গিয়ে ভালো থাকিস, দেশের মানুষ যেন তোকে আর কষ্ট না দেয়।’ মাসুম জবাব দিতে পারেননি, শুধু চোখের জল লুকাতে অন্ধকারে দ্রুত বেরিয়ে পড়েছিলেন। কারণ, সেই মুহূর্তে তার নিজের দেশে থাকা মানেই ছিল জেল-জুলুম আর লাঞ্ছনা। ট্রলারের ইঞ্জিনটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। চারিদিকে নোনা জলের গর্জন। পাশে বসা কিশোরটি ভয়ে কাঁপছে। মাসুমের মনে পড়ছে তার ছোট মেয়েটার কথা, যে এখনও জানে না তার বাবা কেন তাকে রেখে এত দূরে চলে গেল। মাসুম ভাবছেন, ‘আমার অপরাধ কী ছিল? কেন আমার নিজের মাটি আমাকে জায়গা দিতে পারল না? কেন আমাকে এক কাপড়ে সব ফেলে চোরের মতো দেশ ছাড়তে হলো?’

নিস্তব্ধ আকাঙ্ক্ষা : অদূর ভবিষ্যতে হয়তো মাসুম কোনো অজানা দেশের রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় পাবেন। তার পরিচয় হবে ‘অবৈধ অভিবাসী’ বা ‘শরণার্থী’। যে মানুষটি নিজের দেশে বীরদর্পে চলতেন, আজ তাকে বিদেশের রাস্তায় মাথা নিচু করে হাঁটতে হয়। তার চোখের জল এখন আর বৃষ্টির পানিতে আলাদা করা যায় না। কেউ যেন অনিয়ন্ত্রিত বা অবৈধ উপায়ে অভিবাসী হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে আমার দৃষ্টিকোণ থেকে ভুক্তভোগী, অভিভাবক এবং জনসাধারণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-

তথ্যের সঠিকতা যাচাই : বিদেশ যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা নীতি, কাজের ধরণ এবং বেতন সম্পর্কে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) থেকে তথ্য যাচাই করুন। বৈধ এজেন্সির তালিকা দেখা : শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রক্রিয়া শুরু করুন। অনুমোদিত এজেন্সির তালিকা বিএমইটি ওয়েবসাইট বা বায়রা থেকে দেখে নিন।

দালাল থেকে সাবধান : কোনো ব্যক্তি বা দালালের হাতে সরাসরি টাকা দেবেন না। সবসময় ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে লেনদেন করুন এবং রসিদ সংরক্ষণ করুন।

চাপ প্রয়োগ না করা : পরিবারের সদস্যদের উপার্জনের জন্য জোর করে বা ধার-দেনা করে বিদেশে পাঠাবেন না। বিদেশের কাজের চুক্তিপত্রটি অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে পড়িয়ে নিন। থাকাণ্ডখাওয়া এবং বিমার সুবিধা আছে কি না নিশ্চিত হোন।

দক্ষতা অর্জন : সন্তানদের অদক্ষ অবস্থায় বিদেশে না পাঠিয়ে কারিগরি শিক্ষা বা ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলুন।

ভুক্তভোগীদের করণীয় : অভিযোগ জানানো- যদি কেউ প্রতারণার শিকার হন, তবে দেরি না করে নিকটস্থ থানায় বা জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩-এ যোগাযোগ করুন। বিদেশে সহায়তাণ্ড বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়লে সেখানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনসুলেটের সহায়তা নিন। প্রমাণ সংরক্ষণ- প্রতারকদের সঙ্গে হওয়া কথোপকথন, টাকা লেনদেনের রসিদ এবং পাসপোর্টের কপি সবসময় নিজের কাছে বা বিশ্বস্ত কারো কাছে ডিজিটাল কপি (যেমন ইমেইল বা গুগল ড্রাইভ) হিসেবে রাখুন। বিদেশে যাওয়ার আগে বাধ্যতামূলক প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করুন। যে কোনো জরুরি প্রয়োজনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশের জনগণকে যাতে অভিবাসনে বাধ্য হতে না হয়, সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে : স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (SME) বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ করে তোলা, যাতে তারা দেশেই সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে অনিরাপদ বোধ থেকে কেউ দেশত্যাগ না করে। তরুণদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং স্টার্টআপ অনুদান প্রদান করা, যাতে তারা চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে রক্ষা করতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং লবণাক্ততাণ্ডসহিষ্ণু কৃষিপদ্ধতি প্রবর্তন করা, যা অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক অভিবাসন হ্রাস করবে। মেধাবী ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য দেশে আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো এবং গবেষণার সুযোগ তৈরি করা।

আমাদের প্রত্যাশা : আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে কোনো বাবাকে তার সন্তানের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে হবে না। যেখানে মতাদর্শের ভিন্নতা মানেই নিপীড়ন নয়, বরং সহাবস্থান। আর কোনো ট্রলার যেন বঙ্গোপসাগর বা ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশিদের রক্তে রঞ্জিত না হয়।

দেশের প্রতিটি মানুষ যেন নিজের মাটিতেই সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচতে পারে, এটাই হোক ২০২৫ সালের পরবর্তী প্রজন্মের শপথ। বাংলাদেশের এই মেধা ও জনশক্তি যেন বিদেশের মাটিতে ‘উদ্বাস্তু’ না হয়ে নিজ দেশের উন্নয়নে কাজ করতে পারে, সেই পরিবেশ বাংলাদেশ সরকার, রাজনৈতিক দলগুলো এবং সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গতিতে তৈরি করে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক