শহরে বৃক্ষ নিধন ও সবুজায়ন হ্রাস : এক শ্বাসরুদ্ধকর ভবিষ্যৎ

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের শহর এবং মহানগরগুলো বর্তমানে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নগরায়ণের এক চরম মূল্যে ভুগছে- আর তা হলো নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন এবং সবুজায়ন হ্রাস, যা পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্য উভয়ের জন্য এক নীরব হুমকির সৃষ্টি করেছে। দ্রুত প্রসারিত হওয়া কংক্রিটের জঙ্গল জায়গা করে নিতে গিয়ে শহরগুলোর ফুসফুস হিসেবে পরিচিত গাছপালা আজ বিলুপ্তির পথে, যেখানে রাস্তা সম্প্রসারণ, নতুন আবাসন প্রকল্প, বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ এবং বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির অজুহাতে প্রতিনিয়ত শত শত পুরোনো গাছ কাটা হচ্ছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী একটি আদর্শ শহরে মোট আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমি বা সবুজ এলাকা থাকা উচিত হলেও, বাস্তবে ঢাকার মতো মহানগরগুলোতে এই সবুজ আচ্ছাদন কমে ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এই লাগামহীন বৃক্ষ নিধনের ফলস্বরূপ শহরে তাপমাত্রার উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ঘটছে, যা ‘আরবান হিট আইল্যান্ড এফেক্ট’ নামে পরিচিত এবং এর ফলে তীব্র গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে; কারণ গাছপালা ছায়া এবং বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পরিবেশকে শীতল রাখার যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি চালু রাখে, তা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে, গাছপালা কমে যাওয়ায় বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড ও ক্ষুদ্র ধূলিকণা শোষণের প্রাকৃতিক ফিল্টার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, যা শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে বায়ু দূষণের মাত্রাকে আরও তীব্র করছে। এছাড়া, গাছের শিকড় মাটিকে ধরে রেখে বৃষ্টির জলকে গভীরে প্রবেশে সাহায্য করত, কিন্তু গাছ কমে যাওয়ায় এবং কংক্রিটের আচ্ছাদন বাড়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, যেখানে গাছ কাটার অনুমতি দেওয়ার আগে অবশ্যই পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) এবং পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণমূলক প্রতিস্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। উত্তরণের উপায় হিসেবে শহরের প্রতিটি নতুন ভবন নির্মাণে উল্লম্ব ও ছাদ বাগান (Vertical and Rooftop Gardening) বাধ্যতামূলক করা এবং অব্যবহৃত সরকারি জমিতে দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগিয়ে ছোট নগর বন (Urban Forests) তৈরি করা জরুরি। যদি এখনই এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া বন্ধ করে একটি বৈজ্ঞানিক, পরিবেশবান্ধব সবুজ পরিকাঠামো মডেল গ্রহণ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নগরগুলো বসবাসের অযোগ্য এবং শ্বাসরুদ্ধকর স্থানে পরিণত হবে; কারণ টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগ