হাড়কাঁপানো শীত : পথশিশুদের দুর্ভোগ ঘোচাবে কে
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পৌষ-মাঘের হাড়কাঁপানো শীত জেঁকে বসেছে জনজীবনে। সচ্ছল মানুষের ঘরে যখন বাহারি শীতবস্ত্র আর লেপ-তোশকের ওমে ওম, তখন নগরের ফুটপাত, রেলস্টেশন কিংবা লঞ্চ টার্মিনালের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে খোলা আকাশের নিচে, স্রেফ এক টুকরো প্লাস্টিক বা পাতলা চটের ওপর শুয়ে কুঁকড়ে আছে আগামীর ভবিষ্যৎ- আমাদের পথশিশুরা। প্রতি বছর শীত আসে, চলেও যায়, কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর হাড়ভাঙা শীতের কষ্ট লাঘবে কোনো স্থায়ী সমাধান আজ অবধি মেলেনি।
ফুটপাতে বরফশীতল রাত : রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে হাজার হাজার শিশু বেড়ে ওঠে অবহেলায়। এদের মাথা গোঁজাবার কোনো নির্দিষ্ট ঠাঁই নেই। দিনের বেলা হাড়ভাঙা খাটুনি আর রাত হলে কনকনে বাতাসের ঝাঁপটা- এই হলো তাদের দৈনন্দিন জীবন। শীতের রাতে যখন তাপমাত্রা এক অঙ্কের ঘরে নেমে আসে, তখন একটি সাধারণ পাতলা গেঞ্জি বা জীর্ণ কাঁথা তাদের রক্ষা করতে পারে না। আগুনের কুণ্ডলি জ্বালিয়ে কিংবা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে একটু উষ্ণতা পাওয়ার যে লড়াই তারা করে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে ব্যথিত করার কথা।
অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি : শীত শুধু ঠান্ডার কষ্ট নিয়ে আসে না, নিয়ে আসে একগুচ্ছ রোগবালাই। পথশিশুরা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পায় না বলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কম। ফলে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, তীব্র সর্দি-কাশি আর চর্মরোগে তারা সবার আগে আক্রান্ত হয়। নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা, নেই কোনো পরম মমতা। অনেক ক্ষেত্রে সুচিকিৎসার অভাবে সামান্য শীতকালীন রোগও এই শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। শৈশবের এই চরম অনিরাপত্তা তাদের শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও পঙ্গু করে দিচ্ছে।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও উদ্যোগের অভাব : প্রতি বছর শীত মৌসুমে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা ব্যক্তি উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। গণমাধ্যমে সেই খবরের ছবিও ছাপানো হয় ঘটা করে। কিন্তু এই বিক্ষিপ্ত আর সাময়িক সাহায্য দিয়ে কি বিশাল এই সংকটের সমাধান সম্ভব? সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পথশিশুদের জন্য যে আবাসন বা শেল্টার হোমের ব্যবস্থা রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য। এছাড়া, এসব শিশুর পুনর্বাসনের জন্য নেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ত্রাণ হিসেবে পাওয়া একটা কম্বল কয়েক দিনের সুরক্ষা দিলেও, কনকনে বাতাসের হাত থেকে বাঁচতে তাদের একটি স্থায়ী ছাদ প্রয়োজন।
আমাদের করণীয় কী: রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো তার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। পথশিশুরাও এই রাষ্ট্রের নাগরিক। তাদের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়া শুধু করুণা নয়, বরং তাদের অধিকার।
স্থায়ী আবাসন : বড় শহরগুলোতে পথশিশুদের জন্য পর্যাপ্ত ‘নাইট শেল্টার’ বা রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা : শীতকালীন রোগ মোকাবিলায় ফুটপাতকেন্দ্রিক ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম গঠন করা জরুরি।
সমন্বিত উদ্যোগ : সরকারি সমাজসেবা অধিদপ্তরের পাশাপাশি বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ‘সিএসআর’ (ঈঝজ) ফান্ডের একটি অংশ এ শিশুদের শীতকালীন সুরক্ষায় ব্যয় করতে উৎসাহিত করতে হবে।
ব্যক্তিগত সচেতনতা : আমাদের প্রত্যেকের উচিত অপ্রয়োজনীয় পুরোনো কাপড়গুলো ফেলে না দিয়ে সরাসরি এই শিশুদের হাতে পৌঁছে দেওয়া।
একটি সভ্য সমাজে একদল শিশু যখন কনকনে শীতে খোলা আকাশের নিচে থরথর করে কাঁপে, তখন সেই সমাজকে কোনোভাবেই প্রগতিশীল বলা যায় না।
পথশিশুরা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই সমাজের অংশ। তাদের শৈশব যদি ফুটপাতের বরফশীতল কংক্রিটে পিষ্ট হয়, তবে আগামীর বাংলাদেশ কখনোই স্বস্তির হতে পারে না। মানবিক আবেদন ছাড়িয়ে এখন সময় এসেছে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের। আসুন, এই শীতে আমরা কেবল নিজের উষ্ণতা নয়, বরং পাশের অসহায় শিশুটির কষ্টের ভাগীদার হই। তাদের শৈশব হোক নিরাপদ, অন্তত একটি উষ্ণ রাত পাওয়ার অধিকার যেন তারা পায়।
