গ্যাসের দাম নিয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজি

এমএ হোসাইন

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কিছু সংকট আসে প্রকৃতি ও বৈশ্বিক বাজারের হাত ধরে, আর কিছু সংকট তৈরি হয় মানুষের সচেতন কারসাজিতে। বাংলাদেশের চলমান এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সংকট দ্বিতীয় শ্রেণিরই একটি উদাহরণ। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার উধাও। আর যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১,২৫৩ টাকা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ১,৮০০ থেকে ২,১০০ টাকায়। এটিকে বাজারের স্বাভাবিক উঠানামা বলা যায় না। এটি দিনের আলোয় সংঘটিত ডাকাতি, যার পেছনে রয়েছে সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

আজকের বাংলাদেশে এলপিজি কোনো বিলাসী জ্বালানি নয়। এটি শহর ও উপশহরের লাখো পরিবারের রান্নাঘরের প্রধান ভরসা। যেখানে পাইপলাইনের গ্যাস নেই, কিংবা থাকলেও নিয়মিত সংকট, সেখানে এলপিজিই একমাত্র নির্ভরযোগ্য বিকল্প। নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ হওয়ার পর মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এলপিজি হয়ে উঠেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি। হোটেল-রেস্তোরাঁ, ছোট খাবারের দোকান, ভাসমান ব্যবসায়ী- সবারই উৎপাদন খরচ এই গ্যাসের দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এলপিজির সংকট শুধু রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ধীরে ধীরে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়।

এই সংকটের পক্ষে ব্যবসায়ীরা যে যুক্তিগুলো তুলে ধরছেন, সেগুলো নতুন নয়। আমদানিতে ঘাটতি, এলসি খোলার জটিলতা, শীতকালে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি- এসবের কিছু বাস্তব ভিত্তি আছে। কিন্তু এসব যুক্তি দিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না : যে গ্যাস আগের দামে আমদানি করা হয়েছে, তার দাম হঠাৎ করে কেন কয়েকশ টাকা বেড়ে যায়? কেন নতুন দাম ঘোষণার আগেই বাজার থেকে সিলিন্ডার উধাও হয়ে যায়? কেন একই শহরে, এমনকি একই এলাকায়, একেক দোকানে একেক দাম? এসব প্রশ্নের উত্তর বাজারের স্বাভাবিক নিয়মে খুঁজে পাওয়া যায় না। এগুলো পরিকল্পিত সিন্ডিকেটের লক্ষণ।

এই ব্যর্থতার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করে- এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু দাম ঘোষণা করাই যদি শেষ দায়িত্ব হয়, তাহলে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনই বা কী? মাঠপর্যায়ে তদারকি ছাড়া মূল্যনির্ধারণ অর্থহীন। আইন অনুযায়ী বিইআরসির হাতে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল, এমনকি কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ প্রায় অনুপস্থিত। ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই ভয়াবহ: ব্যবসায়ীরা বুঝে গেছে, নিয়ম ভাঙলেও শাস্তির ভয় নেই।

এই দৃশ্য বাংলাদেশে নতুন নয়। চাল, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, সার- একাধিক পণ্যের বাজারে আমরা একই চিত্র দেখেছি। একটি পণ্য নিত্যপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠলেই তার সরবরাহ কিছু হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। তদারকি দুর্বল হলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, দাম বাড়ে, ভোগান্তি চরমে ওঠে। এলপিজি সেই পুরোনো গল্পেরই নতুন সংস্করণ।

এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে এলপিজি খাতের কাঠামোগত বাস্তবতা। পাইপলাইনের গ্যাসের মতো এখানে রাষ্ট্রীয় কোনো বাফার মজুদ নেই। প্রায় পুরো বাজারই বেসরকারি কোম্পানির হাতে। ফলে সরকার চাইলে হঠাৎ করে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগও সীমিত। ভোক্তারা সারা দেশে ছড়িয়ে থাকায় তাদের ক্ষোভও বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল হয়ে পড়ে। এই বিচ্ছিন্ন ভোগান্তিই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় শক্তি।

আমদানিকারকরা বলেন, ডিলাররা মজুত করে রেখেছে। ডিলাররা বলেন, কোম্পানি সরবরাহ দিচ্ছে না। কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দেয়। এই দায় এড়ানোর খেলায় শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। কিন্তু মূল সমস্যা ঘাটতি নয়, অস্বচ্ছতা। দেশে কত এলপিজি আমদানি হচ্ছে, কোথায় কত মজুত রয়েছে, কোন পর্যায়ে কতটা সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে- এই তথ্য জনসমক্ষে নেই। অন্ধকার থাকলে মজুদদারি ও কারসাজি সহজ হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে এলপিজি বাজারও অস্থির, কিন্তু সেখানে রাষ্ট্রীয় তদারকি সেই অস্থিরতাকে সীমিত রাখে। ভারতের উদাহরণ দেওয়া যায়। সেখানে রান্নার গ্যাসকে প্রায় জনসেবার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিতরণ থাকলেও রয়েছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে নজরদারি এবং প্রয়োজন হলে সরকারি হস্তক্ষেপ। দাম বাড়লেও তা হয় নিয়ন্ত্রিতভাবে। বাংলাদেশে বাজার উন্মুক্ত করা হয়েছে; কিন্তু সেই বাজার পরিচালনার জন্য যে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দরকার, তা গড়ে তোলা হয়নি।

এই সংকটের সামাজিক প্রভাব নীরব কিন্তু গভীর। নিম্নআয়ের পরিবারগুলো খাবারের তালিকা ছোট করছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো শিক্ষা বা চিকিৎসার খরচ কমিয়ে রান্নার গ্যাসের বাড়তি দাম মেটাচ্ছে। ক্ষুদ্র খাদ্যব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে, যা আবার সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করছে। এভাবে এলপিজি সংকট ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে বিষ ছড়ায়।

তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কোথায়? কেন বাজার মনিটরিং এত দুর্বল? কেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান নিয়মিত নয়? কেন শাস্তির দৃষ্টান্ত নেই? এসব প্রশ্নের উত্তর প্রযুক্তিগত নয়, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার সঙ্গে জড়িত।

সমাধানও অজানা নয়। প্রথমত, এলপিজিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। এতে সংকটের আশঙ্কা দেখা দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কঠোর নজরদারি চালু করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ চেইনকে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনতে হবে। ব্যাংকিং খাতে যদি মুহূর্তে লেনদেন নজরদারি করা যায়, তাহলে গ্যাস সিলিন্ডার নজরদারি করা অসম্ভব নয়। তৃতীয়ত, শাস্তি হতে হবে দৃশ্যমান ও কঠোর। কয়েকটি দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিলেই বাজারে শৃঙ্খলা অনেকটাই ফিরতে পারে।

চতুর্থত, ভোক্তা অধিকার সংস্থাকে কার্যকর হটলাইন ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে। অভিযোগ জমা দিয়েও যদি ফল না আসে, তবে সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হবে। পাশাপাশি বড় আমদানিকারকদের নির্দিষ্ট স্থানে সরাসরি ন্যায্যমূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করতে বাধ্য করা যেতে পারে, যাতে ডিলারদের কারসাজি এড়ানো যায়। এসব পদক্ষেপের জন্য নতুন রাষ্ট্র গড়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সদিচ্ছা।

এলপিজি সংকট আমাদের একটি বড় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বাজার ব্যর্থ হয় শুধু বেসরকারি বলেই নয়; বাজার ব্যর্থ হয় যখন আইন প্রয়োগ হয় না, আর নিয়ন্ত্রণ হয় নির্বাচিতভাবে। প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে দুর্বল রাষ্ট্র মানেই শক্তিশালী সিন্ডিকেট। রান্নার গ্যাস কোনো বিশেষাধিকার নয়। এটি দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক উপাদান। এই জ্বালানিকে জিম্মি করে রাখার অর্থ শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি নৈতিক ব্যর্থতাও। সরকার যদি নিজের নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে না পারে, তবে তা একটি বিপজ্জনক বার্তা দেয়- আইনের চেয়ে ক্ষমতা বড়। এই সংকট একদিন কেটে যাবে। সরবরাহ বাড়বে, দাম কিছুটা কমবে। কিন্তু যদি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার শূন্যতা পূরণ না করা হয়, তবে এই গল্প আবার ফিরে আসবে- আজ গ্যাস, কাল বিদ্যুৎ, পরশু অন্য কোনো নিত্যপণ্য। স্থিতিশীলতা ঘোষণা দিয়ে আসে না; আসে প্রয়োগের মাধ্যমে। বাংলাদেশের সামনে এখন পরিষ্কার একটি পথ। হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার জনস্বার্থে পরিচালিত হবে, নয়তো তা সিন্ডিকেটের হাতে বন্দিই থাকবে। রান্নাঘর থেকে শুরু করে অর্থনীতি- সব জায়গাতেই তখন মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।

এমএ হোসাইন

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক