লেভেল ক্রসিং : জনপদের আধুনিক মৃত্যুফাঁদ
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে লেভেল ক্রসিংয়ে একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের রেল যোগাযোগব্যবস্থার কঙ্কালসার অবস্থাকেই বারবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ট্রেনের ধাক্কায় বাস, অটোরিকশা বা পথচারী পিষ্ট হওয়ার খবর এখন আর শুধু দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত অবহেলায় পরিণত হয়েছে। যখন একটি লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো নিরাপত্তাকর্মী থাকে না কিংবা সিগন্যাল ব্যবস্থা অকেজো থাকে, তখন তাকে দুর্ঘটনা না বলে ‘হত্যাকাণ্ড’ বলাই শ্রেয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের লেভেল ক্রসিংগুলো যেন এক একটি পরিকল্পিত ‘মৃত্যু ফাঁদ’।
লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার মূল কারণ অনুসন্ধান করলে কয়েকটি প্রধান সমস্যা ফুটে ওঠে- রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে হাজার হাজার লেভেল ক্রসিং রয়েছে যার একটি বড় অংশই অননুমোদিত। বিভিন্ন স্থানীয় সরকার সংস্থা বা ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোগে রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে রেলওয়ের অনুমতি ছাড়াই। ফলে এসব স্থানে গেট বা গেটম্যানের কোনো অস্তিত্ব নেই।
অনুমোদিত ক্রসিংগুলোর একটি বড় অংশই চলছে গেটম্যান ছাড়াই। অনেক ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার ডিউটির জন্য পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় গেট খোলা রাখা হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। অনেক লেভেল ক্রসিং এমন স্থানে অবস্থিত যেখানে বাঁকের কারণে ট্রেন আসার বিষয়টি আগে থেকে টের পাওয়া যায় না। এছাড়া অনেক ক্রসিংয়ের সংযোগ সড়ক অত্যন্ত খাড়া হওয়ায় দ্রুত যানবাহন পারাপার হতে পারে না। শুধু কর্তৃপক্ষের দোষ দিলেই চলবে না, সাধারণ মানুষের অসচেতনতাও সমানভাবে দায়ী। কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইন পার হওয়া, গেট ফেলা থাকা সত্ত্বেও নিচ দিয়ে গলে যাওয়ার প্রবণতা বা সিগন্যাল অমান্য করার মানসিকতা মৃত্যুর মিছিলকে দীর্ঘতর করছে।
রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, রেললাইন দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাফেরা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু জনবসতিপূর্ণ এলাকায় রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ অনিবার্য হয়ে পড়ে। এখানে বড় প্রশ্ন হলো সমন্বয়হীনতা। সড়ক বিভাগ বা স্থানীয় সরকার যখন রাস্তা তৈরি করে, তখন রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রেলওয়ে সুরক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। অথচ আমরা দেখছি, দুর্ঘটনা ঘটার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, কিন্তু সেই কমিটির সুপারিশগুলো হিমাগারে পড়ে থাকে। লেভেল ক্রসিংকে মৃত্যু ফাঁদ থেকে নিরাপদ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অ্যানালগ গেটম্যাননির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় ব্যারিয়ার সিস্টেম চালু করতে হবে, যা ট্রেনের অবস্থান বুঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যস্ততম লেভেল ক্রসিংগুলোতে রাস্তার ওপর দিয়ে ফ্লাইওভার বা নিচ দিয়ে আন্ডারপাস তৈরি করাই হলো স্থায়ী সমাধান। এতে ট্রেন ও সড়কপথের সংঘর্ষের কোনো সুযোগ থাকবে না। রেলওয়ের প্রতিটি অনুমোদিত গেটে শিফট অনুযায়ী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেটম্যান নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনার বাইরে থাকা সমস্ত অবৈধ লেভেল ক্রসিং চিহ্নিত করে হয় সেগুলো বন্ধ করতে হবে, না হয় সেখানে ন্যূনতম নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
রেলকে বলা হয় গণমানুষের বাহন এবং নিরাপদ ভ্রমণের প্রতীক। কিন্তু সেই রেলপথই যদি জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে উন্নয়নের সংজ্ঞা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। লেভেল ক্রসিংয়ে প্রতিটি প্রাণহানি শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বরং রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। আমরা আর কোনো মায়ের বুক খালি হওয়া বা পঙ্গুত্বের অভিশাপ দেখতে চাই না। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ‘মৃত্যু ফাঁদ’গুলো নিরাপদ পথে রূপান্তরিত হোক- এটাই আজকের সময়ের জোরালো দাবি।
