প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬
কিশোর গ্যাং বলতে সাধারণত ১২-১৯ বছর বয়সী কিশোরদের সংগঠিত দলকে বুঝায়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর কিশোর গ্যাং একটি উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে— ঢাকা মহানগরীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কদমতলী, যাত্রাবাড়ী, গাজীপুর চৌরাস্তা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায়। কিশোর বয়সী তরুণদের সংঘবদ্ধ অপরাধ, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য, মারামারি, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক সংশ্লিষ্টতার ঘটনা নিয়মিত সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। অনেক গ্যাংয়ের নিজস্ব নাম, প্রতীক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও গভীর সংকেত বহন করছে। কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে একাধিক সামাজিক ও পারিবারিক কারণ কাজ করছে। নগরায়নের দ্রুত বিস্তার, বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকায় বসবাসকারী পরিবারের আর্থ-সামাজিক চাপ, অভিভাবকদের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, দারিদ্র্যতা, বেকারত্ব, মাদক সহজলভ্যতা, রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা ও গ্যাং সংস্কৃতির প্রচার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ার এসবই কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভাঙা পরিবার, কর্মব্যস্ত বাবা-মা বা পারিবারিক সহিংসতা কিশোরদের মানসিকভাবে হতাশ ও বিপর্যস্ত করে তুলছে। ফলে তারা পরিচয়, অর্থ, নেশা, ক্ষমতা ও নিরাপত্তার খোঁজে গ্যাংয়ের আশ্রয় নিচ্ছে। রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের কিছু লোকজন কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করে ক্ষমতা প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, এলাকা নিয়ন্ত্রণ বা অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতে কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়লেও, প্রকৃত সুবিধাভোগীরা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এসব সহিংসতা ও অপরাধ বৃদ্ধির সাথে সাথে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতাও বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে কিশোরদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই সংকট উত্তরণের জন্য এককভাবে কোনো পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ও মানবিক পদক্ষেপের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। ঝরে পড়া কিশোরদের পুনর্বাসন, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা জরুরি। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাংকে পেছন থেকে মদদদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কিশোরদের শাস্তির বদলে সংশোধন ও পুনর্গঠনের সুযোগ দিলেই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
লোটাস জাহাঙ্গীর
শেরেবাংলা ফজলুল হক হল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়