প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬
কিছু কিছু মুহূর্ত আছে, যখন একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি শুধু কূটনৈতিক কৌশল থাকে না- তা স্মৃতি, ইতিহাস এবং নৈতিকতার কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়। বাংলাদেশ আজ ঠিক তেমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গাজায় স্থিতিশীলতার জন্য ট্রাম্প কতৃক প্রস্তাবিত তথাকথিত ‘আন্তর্জাতিক বাহিনী’- তে বাংলাদেশ সেনা পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ নিছক একটি কূটনৈতিক ভুল নয়; এটি এক গভীর নৈতিক ব্যর্থতা যা অপ্রয়োজনীয়, ঝুঁকিপূর্ণ এবং ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন।
বাংলাদেশ কোনো গোল টেবিলের বৈঠকে জন্ম নেয়নি। আমাদের রাষ্ট্রের জন্ম এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, যার মূল্য দিতে হয়েছে লাখো প্রাণ দিয়ে। গ্রাম পুড়েছে, মানুষ উৎখাত হয়েছে, একটি জাতি দখলদারিত্বের নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করেছে। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের জাতীয় চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। আজ গাজায় আমরা যা দেখছি- অবৈধ দখল, অবরোধ, সমষ্টিগত শাস্তি, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি- তা কোনো দূরবর্তী ট্র্যাজেডি নয়; বরং আমাদের নিজেদের ইতিহাসেরই প্রতিধ্বনি। এই তুলনা আবেগপ্রবণ নয়, কাঠামোগত। ‘স্থিতিশীলতা’-র নামে এমন এক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়া, যা বাস্তবে দখলদারিত্বকে বৈধতা দেয়, মানে নিজের জন্মকথাই ভুলে যাওয়া। এই সরকার ঠিক সেটাই করছে- ভুলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, একটি নৈতিক বাস্তবতা। দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মুসলমান ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং নৈতিকভাবে সমর্থক। এই সমর্থন শুধু কোনো ধর্মীয় চেতনা থেকে আসে না; আসে ঐতিহাসিক সহমর্মিতা থেকেও। ফিলিস্তিনিদের কষ্ট বাংলাদেশের মানুষের কাছে দূরের গল্প নয়। চেকপোস্টের জায়গায় কারফিউ, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া বাড়িঘরের জায়গায় পোড়া গ্রাম- এই দৃশ্য আমাদের অপরিচিত নয়। অথচ এই ব্যাপক জনমতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইউনূস সরকার বেছে নিয়েছে তোষণ- বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের তোষণ, যে প্রশাসন কার্যত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উপপত্নী। নেতানিয়াহু আজ বিশ্বজুড়ে সমালোচিত, আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযুক্ত এবং ফিলিস্তিনিদের উপর নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কুখ্যাত। এমন এক শক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা মানে দেশের মানুষের নৈতিক অনুভূতিকে প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করা।
এখানে তথাকথিত ‘স্থিতিশীল বাহিনী’র প্রকৃতি বোঝা জরুরি। স্থিতিশীলতা কাদের জন্য? ধ্বংসস্তূপে পরিণত এক জনগোষ্ঠীর জন্য, নাকি দখলদার শক্তির জন্য, যারা আন্তর্জাতিক বৈধতার আবরণ খুঁজছে? ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক ‘স্থিতিশীলতা’ ধারণা বরাবরই লেনদেনভিত্তিক, নাটকীয় এবং নিষ্ঠুর। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচার ছাড়াই দখলকে স্বাভাবিক করা থেকে শুরু করে ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রকাশ্য সমর্থন- ফিলিস্তিন প্রশ্নে ট্রাম্পের নীতি কখনোই শান্তির ছিল না; ছিল মুছে ফেলার। সেই কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশি সেনা পাঠানো মানে শান্তিরক্ষা নয়, বরং মানবিকতার ভাষাকে প্রহসনে পরিণত করা।
এই সিদ্ধান্তকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে এর সরাসরি বিচ্ছেদ। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত- গণতান্ত্রিক সরকার হোক বা সামরিক শাসন- বাংলাদেশ কখনও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এটি কোনো আদর্শিক একগুঁয়েমি ছিল না; ছিল নীতিগত ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশ জানত, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আগে দখলকে স্বীকৃতি দিলে অন্যায়ই শক্ত হয়। আজ সেই ঐতিহ্য সংসদীয় বিতর্ক ছাড়াই, জনমত উপেক্ষা করে, ওয়াশিংটনের করিডোরে ফিসফিস করা আশ্বাসের মাধ্যমে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নটি- বৈধতা।
ইউনূস সরকার নির্বাচিত নয়।
এমএ হোসাইন
রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক