চা শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকারের আর্তনাদ

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের চা শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণভোমরা। ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ির’ স্নিগ্ধতায় ভরা এই শিল্প প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। কিন্তু এই উজ্জ্বল আভার পেছনে লুকিয়ে আছে কয়েক লাখ চা শ্রমিকের অন্ধকার ও করুণ জীবনগাঁথা। দীর্ঘ দেড়শ’ বছরের বেশি সময় ধরে বংশপরম্পরায় যারা এই শিল্পের চাকা সচল রেখেছেন, আজ তারা চরম অবহেলা, অতি-নগণ্য পারিশ্রমিক আর মানবেতর জীবনযাপনের শিকলে বন্দি। তাদের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র বর্তমান সভ্য সমাজে এক বড় বৈপরীত্য হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যখন আকাশচুম্বী, তখন চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরির দিকে তাকালে অবাক হতে হয়। অনেক আন্দোলনের পর তাদের মজুরি কিছুটা বাড়ানো হলেও তা এখনও জীবনধারণের ন্যূনতম মানদ- স্পর্শ করতে পারেনি। একজন চা শ্রমিক সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কায়িক শ্রম দেওয়ার পর যে মজুরি পান, তা দিয়ে চার-পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের তিন বেলার অন্নসংস্থান করা প্রায় অসম্ভব। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম যেখানে প্রতিদিন বাড়ছে, সেখানে এই যৎসামান্য পারিশ্রমিককে শুধু ‘অমানবিক’ বললেও কম বলা হয়। মজুরির এই স্বল্পতা তাদের পুষ্টিহীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

চা বাগানগুলোতে শ্রমিকদের আবাসন ব্যবস্থা বা ‘লেবার লাইন’ দেখলে মধ্যযুগীয় দাসপ্রথার কথা মনে পড়ে যায়। জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর, যেখানে গাদাগাদি করে থাকতে হয় পরিবারের সবাইকে। বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে, আর শীতের সময় কনকনে ঠান্ডা। নেই পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা কিংবা বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির সুব্যবস্থা। ব্রিটিশ আমলে তৈরি হওয়া সেই পুরোনো অবকাঠামোতেই তারা বংশানুক্রমে বাস করছেন। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, তারা যে ভিটেমাটিতে বাস করেন, তার ওপর তাদের কোনো মালিকানা নেই। বাগান কর্তৃপক্ষ চাইলে যেকোনো সময় তাদের উচ্ছেদ করতে পারে। ভূমিহীন হওয়ার এই আতঙ্ক তাদের প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খায়।

চা শ্রমিকদের সন্তানরা শিক্ষার আলো থেকে যোজন যোজন দূরে। যদিও কিছু বাগানে প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে; কিন্তু উচ্চশিক্ষার সুযোগ সেখানে অত্যন্ত সীমিত। দারিদ্র্যের কারণে অধিকাংশ শিশুই মাঝপথে পড়ালেখা ছেড়ে চা বাগানে শ্রমিকের খাতায় নাম লেখায়। ফলে অশিক্ষার অভিশাপ থেকে তারা বের হতে পারছে না। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা আরও শোচনীয়। বাগানের ডিসপেনসারিগুলোতে প্যারাসিটামল ছাড়া আর কোনো ওষুধ মেলে না বললেই চলে। জটিল রোগে আক্রান্ত হলে বা গর্ভবতী মায়েদের জন্য উন্নত চিকিৎসার কোনো সুব্যবস্থা নেই। বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি আর অপুষ্টির কারণে এসব শ্রমিক অকালেই পঙ্গুত্ব বরণ করেন অথবা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

চা শ্রমিকরা আমাদের সমাজেরই অংশ, অথচ তারা এক ধরনের অদৃশ্য দেয়ালে ঘেরা। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারা থাকলেও মূলধারার সমাজ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন। অধিকাংশ চা শ্রমিকই ব্রিটিশ আমলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা লোকজনের বংশধর। দেড়শ’ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও অনেক ক্ষেত্রে তাদের নাগরিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ। এই বিচ্ছিন্নতা তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল করে রেখেছে, যার ফলে তারা নিজেদের অধিকার আদায়ে সবল কণ্ঠস্বর হতে পারছেন না। চা শ্রমিকদের এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে শুধু আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ।

বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে একটি সম্মানজনক ‘লিভিং ওয়েজ’ বা জীবন ধারণোপযোগী মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। শ্রমিকদের বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী ভূমির অধিকারের বিষয়টি সুরাহা করতে হবে। চা বাগানগুলোতে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত হাসপাতাল স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। শ্রম আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে যাতে বাগান মালিকরা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে বাধ্য থাকেন।

চা শ্রমিকদের ঘাম আর রক্তে মিশে আছে আমাদের প্রতিদিনের চায়ের কাপের তৃপ্তি। অথচ যারা এই তৃপ্তি জোগাচ্ছেন, তাদের জীবন আজ তিক্ততায় ভরা। উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ এগিয়ে গেলেও এই বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে প্রকৃত সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, মালিকপক্ষ এবং সচেতন সমাজকে এখনই ভাবতে হবে- আমরা কি শুধু চায়ের স্বাদই নেব, নাকি এর পেছনের কারিগরদের মানবেতর জীবনের দায়ভারও নেব? তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এখন আর কোনো করুণা নয়, বরং সময়ের দাবি এবং আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।