মব ভায়োলেন্স বনাম সচেতনতা বিজ্ঞানের বিচারে কোনটি বেশি শক্তিশালী

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানবসভ্যতার ইতিহাসে আদিম প্রবৃত্তি এবং উন্নত বিবেকের মধ্যে লড়াই চিরন্তন। একদিকে রয়েছে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা দলবদ্ধ সহিংসতা, যা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসলীলা চালাতে পারে। অন্যদিকে রয়েছে ‘সচেতনতা’, যা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ও স্থিতিশীলতা আনে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি কেবল সামাজিক সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের মস্তিষ্কের নিউরোবায়োলজি এবং বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের একটি জটিল খেলা। যখন একটি জনতা উন্মুত্ত হয়ে ওঠে, তখন সেখানে একক মানুষের বিবেক কাজ করে না; বরং কাজ করে সমষ্টির আদিম আবেগ। বিপরীতে, সচেতনতা হলো মানব মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ স্তরের কাজ। এই নিবন্ধে আমরা বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করব কেন সচেতনতার শক্তি মব ভায়োলেন্সের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং কীভাবে এটি মানব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।

মব ভায়োলেন্সে যখন মানুষ অংশ নেয়, তখন মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা (Amygdala) সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটি মস্তিষ্কের সেই অংশ যা ভয়, ক্রোধ এবং ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ (লড়ো নয়তো পালাও) প্রতিক্রিয়ার জন্য দায়ী। যখন একজন ব্যক্তি মবের অংশ হয়, তখন তার প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স (Pre-frontal Cortex) বা যৌক্তিক চিন্তা করার ক্ষমতা সাময়িকভাবে অকেজো হয়ে যায়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যামিগডালা হাইজ্যাক’ বলা হয়।

অন্যদিকে, সচেতনতা সরাসরি প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের সঙ্গে যুক্ত। এটি মানুষকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। বিজ্ঞান বলে, সচেতনতা মানুষের সহানুভূতি (Empathy) এবং ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়, যা দীর্ঘমেয়াদি সন্তুষ্টি দেয়। তাই কাঠামোগতভাবে সচেতনতাই মানুষের মস্তিষ্কের জন্য বেশি শক্তিশালী ও গঠনমূলক।

শক্তি প্রয়োগ বা মব ভায়োলেন্স মানুষের ইগো (Ego) বা অহংকে সাময়িকভাবে তৃপ্ত করলেও এটি গভীরে আঘাত হানে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে, যখন কাউকে বলপ্রয়োগ করা হয়, তখন তার মস্তিষ্কে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ নিঃসৃত হয়, যা ঘৃণা ও প্রতিশোধের জন্ম দেয়।

বিপরীতে, সচেতনতা বা আলোচনার মাধ্যমে যখন কাউকে সংশোধন করা হয়, তখন তার মধ্যে ‘সেলফ-ওয়র্থ’ বা আত্মমূল্যায়ন তৈরি হয়। বিজ্ঞানের মতে, মানুষের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স যখন স্বীকৃত হয়, তখন সে সহযোগিতামূলক আচরণ করে। সচেতনতা মানুষের ইগোকে দমন করে ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করে, যা শক্তির চেয়ে বহুগুণ কার্যকর।

ধ্বংস বনাম সৃষ্টি- মব ভায়োলেন্সের শক্তিকে বলা হয় ‘এন্ট্রপি’ (Entropy) বা বিশৃঙ্খলা। থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র অনুযায়ী, কোনো কিছু ধ্বংস করা সহজ কারণ এতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। কিন্তু সচেতনতা হলো একটি ‘অর্গানাইজড এনার্জি’। একটি ভবন ভাঙতে এক ঘণ্টা লাগে (মব ভায়োলেন্স), কিন্তু সেটি গড়তে মাসের পর মাস পরিকল্পনা ও শ্রম লাগে (সচেতনতা)। বিজ্ঞান প্রমাণ করে যে, টেকসই উন্নয়নে সচেতনতার শক্তিই হলো শ্রেষ্ঠ শক্তি, কারণ এটি সৃজনশীল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ফরাসি বিপ্লবের সময় মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে অনেক রক্তপাত হয়েছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাজ স্থিতিশীল হয়েছে শুধু যখন সচেতনতামূলক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। মব ভায়োলেন্সের ফলাফল সবসময় অস্থায়ী।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মব হলো ‘কলেকটিভ ডিলুশন’ বা সামষ্টিক বিভ্রম। পক্ষান্তরে, রেনেসাঁ বা শিল্প বিপ্লবের মতো যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলো এসেছে সচেতনতার হাত ধরে। সচেতনতা মানুষের মস্তিষ্কে স্থায়ী সিন্যাপটিক কানেকশন তৈরি করে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়।

সফল ব্যক্তি বনাম আস্তাকুড় : মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা বা মার্টিন লুথার কিং-এর মতো জগৎ বিখ্যাত ব্যক্তিরা সচেতনতার মাধ্যমে সফল হয়েছেন। কারণ, তাদের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স ছিল অত্যন্ত উন্নত এবং বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানে ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ বলতে শুধু শারীরিক শক্তি বোঝায় না, বরং সামাজিক বুদ্ধিমত্তাকেও বোঝায়।

অন্যদিকে, যারা মব বা উগ্রতার আশ্রয় নিয়েছেন (যেমন হিটলারের নাৎসি বাহিনী), তারা সাময়িকভাবে ক্ষমতা পেলেও শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। কারণ বিজ্ঞানের বিচারে ঘৃণা এবং সহিংসতা দীর্ঘমেয়াদে একটি প্রজাতির সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দেয়।

বিজ্ঞান বলে, উগ্রপন্থিদের মস্তিষ্কে লিম্বিক সিস্টেম বেশি সক্রিয় থাকে, যা তাদের আবেগপ্রবণ ও সহিংস করে তোলে। তাদের মধ্যে ডগমা বা অন্ধবিশ্বাস প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সকে ব্লক করে দেয়। বিপরীতে, সুবিবেচক ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে নিউরাল প্লাস্টিসিটি বেশি থাকে, যার ফলে তারা নতুন তথ্য গ্রহণ করতে এবং সচেতন হতে পারে। এটিই একজন উগ্রপন্থি ও একজন সচেতন মানুষের মধ্যে মৌলিক বৈজ্ঞানিক পার্থক্য।

মব ভায়োলেন্সের ফলে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বা মানব সম্পদের বিনাশ ঘটে। সচেতনতার মাধ্যমে যখন একজন ব্যক্তি শিক্ষিত হয়, তখন তার নিউরনগুলো জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অর্জন করে। মব ভায়োলেন্স শুধু জৈবিক মৃত্যু ঘটায় না, এটি একটি জাতির মেধা ও নৈতিকতাকেও হত্যা করে। বিজ্ঞান অনুযায়ী, একটি সচেতন সমাজ মানে উন্নতমানের জীবন এবং দীর্ঘায়ু।

মব ভায়োলেন্সের মূল চালিকাশক্তি হলো অপরাধপ্রবণতা। যখন সমাজে সচেতনতা কমে যায়, তখন কর্টিসল এবং টেস্টোস্টেরনের প্রভাবে অপরাধ বেড়ে যায়, ফলে জেলখানা ও আদালত পূর্ণ হয়। ভায়োলেন্সের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খালি হয়ে যেতে পারে। সচেতনতামূলক কাজ করে বলে উপাসনালয়গুলো পরিপূর্ণ হয়ে যায়। অন্যদিকে, সচেতনতা মানুষকে আধ্যাত্মিকতা এবং শিক্ষার দিকে ধাবিত করে। উপাসনালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গেলে মানুষের মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন এবং সেরোটোনিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা প্রশান্তি ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। জেলখানা থানা ও আদালত যত বেশি খালি হয়ে যায়, উপাসনালয়গুলো তত বেশি পূর্ণতা পায়। বিদ্যালয় খালি হওয়া মানে সচেতনতার মৃত্যু, যা প্রকারান্তরে একটি সমাজকে মব ভায়োলেন্সের দিকে ঠেলে দেয়।

অনেকে মনে করেন যুদ্ধ মানেই মব ভায়োলেন্স। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সুসংগঠিত জাতীয় সচেতনতার ফসল। ৭ মার্চের ভাষণ ছিল মূলত একটি সাইকোলজিক্যাল প্রাইমিং, যা ৭ কোটি মানুষকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সচেতন করে তুলেছিল। যদি এটি শুধু মব ভায়োলেন্স হতো, তবে তা কয়েকদিনেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ৯ মাসের সুশৃঙ্খল প্রতিরোধ প্রমাণ করে যে, এটি ছিল সচেতনতার সর্বোচ্চ স্তরের বহিঃপ্রকাশ। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি ছিল ‘কালেক্টিভ রেজিলিয়েন্স’।

মব ভায়োলেন্স হলো ‘এনাক্রনোজম’ বা সময়ের বিপরীতে চলা। এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অস্বীকার করে মস্তিষ্ককে আদিম ‘জঙ্গল আইন’-এ ফিরিয়ে নেয়। অন্যদিকে সচেতনতা মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে। বিজ্ঞান অনুযায়ী, সভ্যতার অর্থ হলো আমাদের আদিম প্রবৃত্তিগুলোকে (Limbic system) আইনের (External Pre-frontal cortex) শাসনে রাখা।

মব ভায়োলেন্স থেকে বের হয়ে সচেতন হওয়ার কিছু বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ হলো- ক্রিটিক্যাল থিংকিং ট্রেনিং: শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া। সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব (যা অ্যামিগডালাকে উস্কে দেয়) চেনার ক্ষমতা বাড়ানো। নিজের আবেগকে চেনা এবং নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি রপ্ত করা। পাড়ায় পাড়ায় সচেতনতামূলক ক্লাব তৈরি করা যা অক্সিটোসিন বৃদ্ধি করবে। গণতন্ত্রে মব ভায়োলেন্স শুধু বিশৃঙ্খলা আনে, বিজয় নয়। বিজ্ঞান বলে, সচেতন ভোটাররা যখন যৌক্তিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন রাষ্ট্রের ‘কগনিটিভ স্ট্যাবিলিটি’ বজায় থাকে। মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পাওয়া বিজয় আসলে ‘পায়রিক ভিক্টরি’ বা ধ্বংসাত্মক জয়, যা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মব ভায়োলেন্সের একটি অন্যতম বৈজ্ঞানিক দিক হলো ‘সোশ্যাল কন্টাজিয়ন’ বা সামাজিক সংক্রামক। হাই তুললে যেমন অন্য একজনের হাই আসে, তেমনি একজনের রাগ দেখে মবের অন্যদের আয়না নিউরন (Mirror Neurons) সক্রিয় হয়ে ওঠে। সচেতনতাই একমাত্র উপায় যা এই সংক্রামক আবেগকে রুখে দিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, মব ভায়োলেন্স হলো অন্ধকারের মতো, যা আলোর অনুপস্থিতিতে দৃশ্যমান হয়। বিজ্ঞানের বিচারে সচেতনতা শুধু একটি মহৎ গুণ নয়, এটি মানুষের বিবর্তনের সর্বোচ্চ শিখর। সচেতনতা জীবন গড়ে, সমাজকে স্থিতিশীল করে এবং রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। আমাদের মস্তিষ্কের আদিম অংশকে জয় করে যদি আমরা উন্নত প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স বা বিবেকের চর্চা করতে পারি, তবেই পৃথিবী মব ভায়োলেন্স মুক্ত হবে। সমাজ যখন সচেতন হয়, তখন জেলখানা নয়, বরং গ্রন্থাগার ও বিদ্যালয়গুলো মানুষের কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে। সচেতনতাই হোক আমাদের আগামীর পথ চলার শক্তি।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল