সমসাময়িক বাংলাদেশে গুজবই দ্রুততম সংবাদ

আরিফুল ইসলাম রাফি

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমসাময়িক বাংলাদেশে গুজব যেন সংবাদকে ছাড়িয়ে সবচেয়ে দ্রুতগতির ও অধিক কার্যকর জনসঞ্চার মাধ্যম হয়ে উঠেছে। গুজবের নিজস্ব একটি কাঠামো আছে; সংবাদের মতোই এরও প্রডাকশন, কনটেন্ট, গ্রহণ, শেয়ারিং ও পুনঃব্যাখ্যার লাইন থাকে; কিন্তু সংবাদ যেখানে পেশাগত, তথ্যনির্ভর ও যাচাইযোগ্যতার মাপকাঠিতে আবদ্ধ, সেখানে গুজব মুক্ত; যার কারণে এ মুক্ততা তাকে দ্রুততর করে, অধিক আকর্ষণীয় করে এবং একইসঙ্গে অধিক বিপজ্জনক করে।

আধুনিক বাংলাদেশে তথ্য ও ক্ষমতার পরিবর্তনশীল টানাপড়নের মধ্যে গুজবের বিস্তারকে বুঝতে হলে শুধু সামাজিক মিডিয়ার ভূমিকা দিয়ে বিষয়টিকে ক্ষুদ্রায়িত করা যাবে না; বরং দেখতে হবে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, মিডিয়ার অর্থনৈতিক ও সম্পাদকীয় সংকট, পরিবারিক ও সামষ্টিক মনস্তত্ত্ব, ইতিহাসে রটনা এবং ডিজিটাল বাজারে নজর আকর্ষণের অর্থনীতি। সবকিছু মিলিতভাবে কীভাবে একটি ‘সামাজিক-প্রযুক্তিগত ইকোসিস্টেম’ তৈরি করেছে যেখানে গুজব সংবাদ হয়ে ওঠে, আর সংবাদ গুজবের ন্যায় সত্য-মিথ্যাহীন তরল এক তথ্যধারায় গলিয়ে যায়।

বাংলাদেশ এমন এক সাংঘর্ষিক সময়ে পৌঁছেছে যেখানে সংবাদ মানে শুধু ঘটনা বিবরণ নয়, বরং সামাজিক-রাজনৈতিক অর্থের উৎপাদন। আর গুজব যেন তার ছায়া-সংবাদ, যা প্রায়শ একই ঘটনার বিকল্প বয়ান তৈরি করে। এর কারণ শুধুই গুজবের বিভ্রম বা উত্তেজনা নয়; বরং দর্শকের মনস্তাত্ত্বিক নির্বাচনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ সংবাদে যেমন তথ্য চায়, তেমনি অর্থ চায়, আর সেই অর্থকে নিজের অভিজ্ঞতা, ভয়, আশা, বিরোধ, পক্ষপাত ও অবিশ্বাসের সঙ্গে মেলাতে চায়। গুজব সেই মেলানোকে সহজতর করে, কারণ সে প্রশ্ন করে না, প্রমাণ চায় না, বরং আগেভাগেই উত্তরের মতো প্যাকেজ হয়ে আসে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রথম প্রশ্ন উঠে, সমসাময়িক বাংলাদেশে কেন গুজব এত দ্রুত সংক্রমিত হয়? তথ্যবিজ্ঞান ও নেটওয়ার্ক তত্ত্বের মতে মাধ্যমগত কারণে; সামাজিক মিডিয়ার রিয়েল-টাইম বিস্তার, অ্যালগরিদমিক প্রমোশন ও শেয়ার-ইকোনমির কাঠামোই গুজবকে দ্রুততর করে। তবে সামাজিক মনস্তত্ত্বের মতে ব্যবস্থাগত অবিশ্বাসের পরিবেশে মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

বিশ্বাস-অবিশ্বাসের থিওরি মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজে মানুষ রাষ্ট্রীয় ঘোষণাকে সন্দেহ করে, সেখানে গুজব রাষ্ট্রীয় সংবাদকে ছাপিয়ে যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় তথ্যব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে জনসন্দেহ নতুন নয়। ঔপনিবেশিক আমল থেকে সামরিক ও আধা-সামরিক শাসন, সেন্সরশিপ এবং দলীয় সংবাদযুদ্ধ; এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় সংবাদ ও ক্ষমতার সম্পর্ক এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে, তথ্য আর শুধু তথ্য থাকে না; হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত। সেই কারণে সরকারি প্রেসনোট, ব্রিফিং বা সরকারি ব্যাখ্যা এগুলোই অনেকের কাছে শুধুমাত্র সরকারি সংস্করণ, যা বাস্তবের পূর্ণ রূপ নাও হতে পারে। তাই সাধারণ মানুষ বিকল্প বয়ান খোঁজে; প্রথমে এলাকায়, পরে ফেসবুকে, পরে মেসেঞ্জারে, পরে ইউটিউবে, পরে মন্তব্যে। এই বিকল্প বয়ানের প্রাথমিক কাঁচামাল প্রায়শ গুজব। রাষ্ট্র যেখানে বৃহৎ, আনুষ্ঠানিক ও ধীর; গুজব সেখানে ক্ষুদ্র, অনানুষ্ঠানিক, নমনীয় ও দ্রুত।

কারণগতভাবে গুজবের গতি বোঝা যায় তিনটি স্তরে: উৎপাদন, পরিবহন এবং গ্রহণ। উৎপাদনের পর্যায়ে গুজব প্রায়শ লোকমুখে বা অনির্ধারিত উৎস থেকে জন্ম নেয়, তবে বর্তমানে রাজনৈতিক দল, সংগঠিত গোষ্ঠী, অথবা মিডিয়া-পেজও গুজব তৈরি ও প্রচারে ভূমিকা রাখে। পরিবহন পর্যায় একসময় এলাকায় বা চায়ের দোকানে সীমাবদ্ধ ছিল; এখন তা ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ও প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। গ্রহণ পর্যায়ে আবার ভোক্তার আগ্রহ, পক্ষপাত, ভয়, বা আনন্দ সব মিলেই নির্ধারণ করে গুজবের স্থায়িত্ব।

বাংলাদেশে গুজব উৎপাদনের কাঠামোতে রাজনীতি বড় ভূমিকা রাখে। নির্বাচনের সময় গুজব যেন নির্বাচনের উপবৃত্ত। একদিকে থাকে দলীয় প্রচারণা, অন্যদিকে থাকে গোপন তথ্যের মতো বয়ান যা প্রায়শ যাচাইহীন। গুজবের উৎপাদকরা জানে গোষ্ঠীগত আবেগ, শত্রু-চিহ্নিতকরণ এবং ভীতি; এ তিনটি উপাদান মিলে দ্রুত ছড়ানো সহজ হয়। ফলে নির্বাচনকালীন গুজব অনেক সময় সংবাদকেও বাধ্য করে প্রতিক্রিয়া দিতে, সংশোধন করতে, ব্যাখ্যা দিতে। এর ফলে সংবাদ যেন গুজবের অনুসারী হয়ে পড়ে, যেখানে সংবাদ আর ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে না; বরং গুজবের বয়ানে লেগে থাকা দায় এড়ায়।

তবে রাজনৈতিক গুজবই একমাত্র গুজব নয়; সামাজিক গুজবও ততটাই শক্তিশালী। বাংলাদেশে শিশুচোর, জিন-পরী, গণপিটুনি, ভ্যাট-ট্যাক্স, দামের উত্থান, ব্যাংক দেউলিয়া, খাদ্যদ্রব্যের বিষক্রিয়া এসব অনেক সময় গুজবের বাস্তব উদাহরণ। মানুষ এসব গুজবকে বিশ্বাস করে কেন? কারণ এসব গুজব প্রতিদিনের জীবনযাপনের ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত। জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষ তথ্য চাই, এমন তথ্য যা তাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। সংবাদ ব্যবস্থার দেরি, যাচাই, সীমাবদ্ধতা; এসবই সেই চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ।

ফলে গুজব সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। মানুষ গুজব ভাগ করে কারণ মনে হয় ‘আমি অন্যদের সতর্ক করছি।’ এই মনস্তত্ত্বকে মনোবিজ্ঞানীরা ‘প্রোটেক্টিভ শেয়ারিং’ বলে। সতর্ক করার অনুভূতি থেকে গুজব ছড়ানো আসলে স্বার্থপর নয়; বরং সমষ্টিগত দায়িত্ববোধের মতো মনে হতে পারে।

অর্থনীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ; সংবাদ বর্তমানে একটি পণ্য এবং গুজবও হয়ে উঠেছে মনোযোগের পণ্য। ফেসবুক ও ইউটিউবের অ্যালগরিদমিক অর্থনীতি সেনসেশনাল কনটেন্টকে পুরস্কৃত করে। সত্য ধীর, উত্তেজনা দ্রুত। ফলে উত্তেজনামূলক, বিতর্কিত, ভয়ভিত্তিক বয়ান আরও বেশি ক্লিক, মন্তব্য, শেয়ার ও ওয়াচণ্ডটাইম পায়। যেহেতু ডিজিটাল বাজার মনোযোগকে নগদে রূপান্তর করতে পারে, সেহেতু গুজব উৎপাদনকারীরা রাজনৈতিক বা বিনোদনমূলক উদ্দেশ্য ছাড়াও আর্থিক লাভ পেতে পারে। তাই বর্তমানে একটি নতুন শ্রেণি তৈরি হয়েছে ‘গুজব উদ্যোক্তা’, যারা তথ্য উৎপাদন ও বিতরণে লাভ দেখে; তাদের কাছে গুজব মানে শুধু গুজব নয়, বরং ব্যবসা।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গুজবকে শুধু বাজার-প্রণোদিত হিসেবে দেখা ভুল হবে; রাষ্ট্র-সমাজ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুজব একটি ক্ষমতার সূচক। যখন রাষ্ট্রীয় বিবরণী (ন্যারেটিভ) ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধান বড় হয়ে যায়, তখন গুজব সেই ব্যবধান পূরণ করার চেষ্টা করে। যদি রাষ্ট্র বলে অর্থনীতি স্থিতিশীল, অথচ মানুষ বাজারে দাম বাড়া দেখে, তখন মানুষ সরকারি তথ্যের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক তথ্যকে বেশি গ্রহণ করে। এই পরিস্থিতিতে গুজব অর্থনীতির অনুভূত সূচক হয়ে ওঠে। এমনকি ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালের স্থিতি সম্পর্কেও গুজব তৈরি হতে পারে, যা সেক্টোরাল আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার প্রশ্নও আসে। রাষ্ট্র সাধারণত গুজব দমনকে নিরাপত্তা নীতি হিসেবে দেখে, গণতান্ত্রিক সংলাপ হিসেবে নয়। কিন্তু দমন ও নিষেধাজ্ঞা গুজবকে কমায় না; বরং উৎস গোপন করে আরও চোরাগোপ্তা করে। মানুষ যদি জানে যে কথা বললে শাস্তি হবে, তারা কথা বলা বন্ধ করে না; বরং চুপিচুপি শেয়ার করে। ইতিহাসে দেখা যায় দমনমূলক পরিবেশে গুজব বেশি জন্মায়, কারণ আনুষ্ঠানিক তথ্যপ্রবাহ সংকুচিত হয়। ফলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ গুজবের জ্বালানি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট।

তবে ডিজিটাল মিডিয়া শুধু গুজব বাড়ায়ই না; তথ্য-নিয়ন্ত্রণের বিকল্প ব্যবস্থাও তৈরি করে। কিন্তু এখানেই আরেক জটিলতা ‘যাচাই’ নামের পেশা এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল। ফ্যাক্টচেকিং বর্তমানে সীমাবদ্ধ ও প্রধানত প্রতিক্রিয়াশীল। ফলে গুজব প্রথমে আঘাত করে, ফ্যাক্টচেক পরে মেরামত করতে চেষ্টা করে। ফলাফল, গুজব এগিয়ে থাকে। সংবাদ সংস্থাও গুজবের পেছনে দৌড়াতে বাধ্য হয়। যেখানে সংবাদ আগে তথ্য এনে দিত, এখন সংবাদ কখনও কখনও শুধু গুজবের জবাব দেয়। সংবাদ তার উদ্যোগী ভূমিকা হারালে গুজবের উদ্যোগ বাড়ে। মানবসমাজে গুজব নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্লেগ, যুদ্ধ কিংবা দুর্ভিক্ষে গুজব বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে বর্তমানের নতুনত্ব হলো, গুজব ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আর্কাইভড হয়ে যায়; চিরস্থায়ী হয়ে থাকে, পুনর্ব্যবহার হয়, রিকনটেক্সচুয়ালাইজড হয়। এর ফলে গুজবের জীবনকাল ঐতিহাসিক থেকে ডিজিটাল, অর্থাৎ একমাত্র ঘটনার মুহূর্তেই আবদ্ধ নয়, বরং পরবর্তীতেও পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।

সব মিলিয়ে দেখা যায়, সমসাময়িক বাংলাদেশে গুজব সংবাদকে অতিক্রম করে কারণ সংবাদে মানুষ এখন তথ্যের প্রয়োজনের পাশাপাশি বিশ্বাসের প্রয়োজন খোঁজে, আর সেই বিশ্বাস পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই গুজব বিশ্বাসের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে, যদিও সেই বিশ্বাস বাস্তবিক অর্থে ভুল বা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এখানে প্রশ্ন হলো, এর সমাধান কী? সমাধান কেবল রাষ্ট্রীয় দমন নয়; বরং তথ্যের স্বচ্ছতা, সংবাদব্যবস্থার স্বাধীনতা, পড়াশোনা ও মিডিয়া লিটারেসি, ইন্টারফেস ডিজাইন এবং ব্যবহারকারী আচরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন; সব মিলিয়ে সমষ্টিগত। একটি সমাজে গুজবকে হারানো মানে কেবল মিথ্যা তথ্যকে হারানো নয়; বরং রাষ্ট্র-সমাজ-বাজার-প্রযুক্তির মধ্যে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন করা।

এই সমগ্র প্রক্রিয়া বুঝতে গেলে বাংলাদেশের সমাজ উন্নয়ন, অর্থনীতি ও রাজনীতি মিলিয়ে একটি ফলাফল দাঁড়ায়, গুজব এদেশে দ্রুততম সংবাদ শুধু প্রযুক্তিগত কারণে নয়; বরং কাঠামোগত, ঐতিহাসিক, মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কারণে। গুজব এখানে তথ্যের বিকল্প, অবিশ্বাসের ভাষা, ভয়ের বয়ান, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, জনঅভিজ্ঞতার ছবি ও বাজারের পণ্য সব একসঙ্গে।

আরিফুল ইসলাম রাফি

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়