জুলুম-অবিচার ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ উসমান বিন হাদিকে ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার প্রকাশ্যে দিবালোকে গুলি করে ঘাতকরা। শরীফ ওসমান হাদি এক সপ্তাহ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে অবশেষে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তার মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। ঘাতকের নির্মম বুলেটের স্বীকার হয়ে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে চির বিদায় নিয়েছেন তিনি। জুলাই আন্দোলন পরবর্তী যে কজন তরুণ নেতৃত্ব জাতিকে আন্দোলিত করে আসছিলেন, তিনি তাদের একজন। বড় কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা না হয়ে ও ওসমান হাদি দেশের মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। ওসমান হাদির হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। হাদি হত্যায় জড়িত পেশাদার খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সারা বাংলাদেশে আন্দোলন ও বিক্ষোভণ্ডসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। হাদি হত্যার কয়েক সপ্তাহ পার হলেও মূল অভিযুক্ত ফয়সালকে এখনও পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি। হাদি হত্যায় জড়িত অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে উত্তাল রাজধানীর শাহবাগ চত্বর। হাজার হাজার শোকাতুর জনতা ইনকিলাব মঞ্চের অবরোধে অংশ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

শরীফ উসমান বিন হাদি হচ্ছেন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকিত একটি কন্ঠস্বর এবং জুলুমের বিরুদ্ধে ইনসাফের আলোকবর্তিকা। মানবিক সমাজ ও ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অগ্রনায়ক। আওয়ামী ১৬ বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে অগ্রসেনানী ছিলেন এই শরীফ উসমান বিন হাদি। ভারতীয় দাসত্ব ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে উসমান হাদি ছিল এক অকুতোভয় আপসহীন সংগ্রামী কান্ডারী। স্বৈরাচারী জুলুমবাজদের বিরুদ্ধে হাদি গর্জে উঠেছে বার বার। হাদি প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক কালচারকে ঘৃণা জানিয়েছিল। যা তার বিভিন্ন উক্তি ও বক্তিতার মধ্য তা স্পষ্ট ফুটে উঠে। শহীদ ওসমান হাদি গতানুগতিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরি করতে ছেয়েছিলেন। যে রাজনীতিতে থাকবে না টাকা ও ক্ষমতার লড়াই। যে রাজনীতির মাধ্যমে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে। মানুষ সরাসরি সরকার প্রদানকে নালিশ করতে পারবে। মানুষকে ন্যায় বিচারের জন্য থানা পুলিশ ও আদালতে ধর্না দিতে হবে না। যে রাষ্ট্রে কেউ অন্যায়ভাবে কারো জায়গা সম্পদ দখল করতে পারবে না।

একজন সাধারণ কৃষক কোনো রকম ঘুষ ছাড়া থানা-আদালতে গিয়ে ন্যায় বিচার পাবেন। এককথায়, ন্যায় বিচারের জন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয় (আওয়ামী লীগ, বিএনপি) দরকার হবে না। এমন দেশ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিলেন তিনি। ওসমান হাদির রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল- ক্ষমতা নয়-নৈতিকতা, আধিপত্য নয়-ন্যায় ও সাম্য, পুঁজিনির্ভর রাজনীতি নয়-জনগণনির্ভর রাজনীতি। সেটি বাস্তবায়নের লক্ষে শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও দুর্নীতির ব্যাপক সমালোচনা করে আসছিলেন। পেশিশক্তির রাজনীতির বিকল্প রাজনৈতিক মডেল তথা নতুন বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চেয়েছিলেন ওসমান হাদি। তাই তার প্রচারণায় ছিল না কোনো বড় বহর বা শোডাউন দিয়ে ভয় তৈরির চেষ্টা। রাস্তাঘাটে জড়ো হয়ে ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরি করে, ফুতপাত ও রাস্তা বন্ধ করে নাগরিকদের কষ্ট দিয়ে প্রচারণা- এগুলোর পরিবর্তনের জন্য তিনি আওয়াজ তুলেছেন।

হাদি অর্থবিত্তের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে, রাজনীতিকে অর্থনির্ভরতা থেকে বের করে জনতার রাজনীতি বিনির্মানে কাজ করেছেন। তিনি কর্পোরেট ফান্ড কিংবা কালো টাকার উপর নির্ভর করেননি। তার নির্বাচনি ব্যয় পরিচালিত হয়েছে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত হাদিয়া থেকে। এখানে অর্থ ছিল নিয়ন্ত্রক নয় বরং আস্তার প্রতীক।

এই চর্চা রাজনীতিকে পুঁজির দাসত্ব থেকে মুক্ত করার একটি মৌলিক দৃষ্টান্ত। রাজনীতি করতে অর্থবিত্তের বলয় দরকার, বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন- এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে রাজনীতির জন্য শুধু জনগণ দরকার তার উদাহারণ তৈরি করেছেন। জীবিত থাকাকালে হাদি তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘জীবন যাবে তবু দেশপ্রেমের প্রশ্নে আপস করব না। পুরো দুনিয়া লিখে দিলেও দেশের সঙ্গে দেশের মাটির সঙ্গে গাদ্দারি করব না।

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট