পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতীয় রাজনীতি কেন এখনও দ্বিধাগ্রস্ত

এম মহাসিন মিয়া

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি অনন্য ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চল। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান- এই তিন জেলা শুধু পাহাড়, বন আর নদীর জন্য নয়; বরং বহুজাতিক, বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার কারণে রাষ্ট্রের জন্য এক বিশেষ দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জের নাম। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম আজও জাতীয় রাজনীতির মূল স্রোতে ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ গুরুত্ব পায়নি। বরং বারবার এই অঞ্চলটি ভোটের অঙ্ক, রাজনৈতিক সুবিধা ও আপসকামী সিদ্ধান্তের বলি হয়ে অশান্তি, বৈষম্য ও বিদ্বেষের চক্রে আবদ্ধ থেকেছে।

জাতীয় রাজনীতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রায়ই দেখা হয় ‘একটি সংবেদনশীল এলাকা’ হিসেবে, কিন্তু বাস্তবে নীতিগত দৃঢ়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকাকালীন কিংবা বিরোধী অবস্থানে থেকেও পাহাড় প্রশ্নে নীতিগত অবস্থান নিতে প্রায়শই দ্বিধাগ্রস্ত। কারণ, পাহাড় নিয়ে সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তার তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ নেই- বরং ভোট হারানোর আশঙ্কাই বেশি। ফলে জনপ্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকরা সমস্যার মূলে হাত না দিয়ে সময়ক্ষেপণ ও দায় এড়িয়ে যাওয়ার পথ বেছে নেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল সংকট শুধু ভূমি, নিরাপত্তা বা উন্নয়ন ঘাটতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, রাজনৈতিক বিভাজন এবং রাষ্ট্রীয় নীতির অস্পষ্টতা। একদিকে পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো তাদের সাংবিধানিক অধিকার, পরিচয় ও ভূমি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত; অন্যদিকে বাঙালি জনগোষ্ঠী নিজেদের নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের নিশ্চয়তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে। এই দ্বিমুখী বাস্তবতাকে সমন্বয় করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হলেও বাস্তবে তা প্রায়শই অনুপস্থিত।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ হলেও বাস্তবায়নের প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক ও অচলাবস্থা বিদ্যমান। চুক্তির কিছু ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে, কিছু এখনও ঝুলে আছে, আবার কিছু ধারা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে। কিন্তু সমস্যা হলো- এই জটিল বাস্তবতাকে স্বীকার করে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার আন্তরিক প্রচেষ্টা খুব একটা দেখা যায় না। বরং রাজনৈতিক দলগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী চুক্তিকে কখনও অগ্রাধিকার দেয়, কখনও উপেক্ষা করে। এতে করে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও আস্থার পরিবেশ গড়ে ওঠার বদলে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়।

জাতীয় সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আলোচনা তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং অনেক সময় তা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। পাহাড়ের বাস্তব সমস্যাগুলো- ভূমি বিরোধ, সশস্ত্র গ্রুপের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি, এসব ইস্যু জাতীয় নীতিনির্ধারণে প্রাধান্য পায় না। অথচ এই সমস্যাগুলো অবহেলিত থাকলেই বারবার অশান্তির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়, যার পরিণতি ভোগ করে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ- জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে চরমপন্থি বয়ান ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের বক্তব্য পাহাড়ে সহাবস্থানের পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে। কখনও রাষ্ট্রবিরোধী ন্যারেটিভ, কখনও নিরাপত্তা বাহিনীর স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে অপপ্রচার চালানও, কখনও আবার পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে দায়ী করার প্রবণতা- উভয়ই বাস্তবতাকে বিকৃত করে এবং সমস্যার সমাধানকে আরও দূরে ঠেলে দেয়। এই জায়গায় দায়িত্বশীল রাজনীতি ও পরিমিত ভাষার চর্চা অত্যন্ত জরুরি, যা দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।

উন্নয়ন প্রশ্নেও পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ধরনের বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক যোগাযোগ, পর্যটন ও বিদ্যুৎ খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও মানবিক উন্নয়ন, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও টেকসই পরিকল্পনার ঘাটতি রয়ে গেছে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অনেক সময় স্থানীয় বাস্তবতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সমন্বয়হীন হওয়ায় তা নতুন অসন্তোষের জন্ম দেয়। উন্নয়ন তখন শান্তির বাহক না হয়ে বরং বিতর্কের উৎসে পরিণত হয়।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ কোন পথে? উত্তর একটাই; ভোটের রাজনীতির সংকীর্ণ হিসাব থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রকে একটি সুস্পষ্ট, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। পাহাড়কে আর ‘সমস্যা এলাকা’ হিসেবে নয়, বরং সম্ভাবনার অঞ্চল হিসেবে দেখতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তরিক সংলাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যা ক্ষমতার পালাবদলেও নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। সহাবস্থান কোনো একতরফা ছাড়ের বিষয় নয়; এটি পারস্পরিক স্বীকৃতি, সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও বাঙালি- উভয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই হতে হবে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।

এম মহাসিন মিয়া

সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা