কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে মফস্বল পর্যন্ত এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’। পাড়ার মোড়ে আড্ডা, উচ্চশব্দে বাইক চালানো, স্কুল-কলেজের সামনে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, ছিনতাই এবং এমনকি খুনের মতো নৃশংস অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে একদল কিশোর। যে বয়সে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা কিংবা খেলার সরঞ্জাম, সেই বয়সে তাদের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র ও অবৈধ মাদক। কিশোর অপরাধের এই ক্রমবর্ধমান বিস্তার শুধু আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং একটি প্রজন্মের নৈতিক পতন এবং সামাজিক অবক্ষয়ের এক অশনিসংকেত।
সংবাদপত্রের পাতায় এখন প্রায় প্রতিদিনই কিশোর গ্যাংয়ের হাতে খুনের খবর থাকছে। তুচ্ছ কোনো কথা কাটাকাটি, ‘বড় ভাই’কে সালাম না দেওয়া কিংবা সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে তারা মেতে উঠছে চরম সহিংসতায়। তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে নিহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কিশোর অপরাধীদের এই দলগুলো এখন আর শুধু আড্ডার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বা স্থানীয় অপরাধী চক্রের হয়ে ‘পেশাদার খুনি’ বা ‘ভাড়াটে সন্ত্রাসী’ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক গ্রুপের সঙ্গে অন্য গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এখন নিয়মিত ঘটনা। কিশোর গ্যাংয়ের এই উত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে কাজ করছে গভীর ও বহুমুখী সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ-
অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবার ব্যস্ততা বা উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে কিশোররা বিপথে যাচ্ছে। পরিবার থেকে নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং সন্তানদের সঙ্গীদের সম্পর্কে খোঁজ না রাখা বড় একটি কারণ। সুস্থ বিনোদন, খেলার মাঠের সংকট এবং পাড়া-মহল্লায় পাঠাগার বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অভাব কিশোরদের ইন্টারনেটের নেতিবাচক দিক ও অপরাধ জগতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। টিকটক, লাইকি বা ইউটিউবে ‘গ্যাংস্টার কালচার’ বা বীরত্ব প্রদর্শনকারী ভিডিওগুলো কিশোরদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। তারা ভার্চুয়াল জগতের সেই হিরোইজমকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে চায়। এটি কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহ হয়ে ওঠার প্রধান কারণ। স্থানীয় পাতি-নেতারা নিজেদের স্বার্থে এই কিশোরদের ‘ক্যাডার’ হিসেবে ব্যবহার করে। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ায় এরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার স্পর্ধা দেখায়।
আমাদের প্রচলিত শিশু আইন (২০১৩) অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সীদের প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী হিসেবে বিচার করা যায় না। এই আইনি সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে অনেক গডফাদার বা বড় অপরাধীরা কিশোরদের অপরাধে নিয়োজিত করছে। কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও খুব একটা সন্তোষজনক নয়। অনেক সময় দেখা যায়, লঘু অপরাধে গিয়ে সেখানে আরও দুর্ধর্ষ অপরাধীদের সংস্পর্শে এসে কিশোররা পেশাদার অপরাধী হয়ে বের হচ্ছে।
কিশোর গ্যাংয়ের এই বিস্তার রোধ করতে হলে শুধু পুলিশের লাঠি বা জেল-হাজত দিয়ে কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে- তা দেখার প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে তার সমস্যাগুলো শেয়ার করতে পারে। কিশোর গ্যাংয়ের প্রধান জ্বালানি হলো রাজনৈতিক আশ্রয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনো অপরাধী কিশোর বা গ্যাং কালচারকে তারা প্রশ্রয় দেবে না। পাড়ার ‘বড় ভাই’ নামধারী অপশক্তির শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। স্কুল-কলেজে শুধু পাঠ্যবই নয়, বরং নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে কিশোররা অপরাধের কুফল সম্পর্কে সচেতন হয়। প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ নিশ্চিত করা এবং পাড়ায় পাড়ায় কিশোরদের জন্য পাঠাগার, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে। তাদের সৃজনশীল শক্তিতে বুদ কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের জন্য আধুনিক ও মানবিক সংশোধনাগার বাড়াতে হবে। তবে যারা গুরুতর অপরাধ (যেমন খুন বা ধর্ষণ) করছে, তাদের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে যাতে ‘বয়সের সুবিধা’ নিয়ে কেউ পার না পায়।
কিশোররা একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কারিগর। সেই কারিগররা যদি আজ ধ্বংসাত্মক পথে পরিচালিত হয়, তবে আগামীর বাংলাদেশ এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে। কিশোর গ্যাং কালচার কোনো একক সমস্যা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। এখনই যদি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র একযোগে এই সমস্যার শিকড় নির্মূল করতে এগিয়ে না আসে, তবে এই ‘গ্যাং কালচার’ একদিন মহিরুহ হয়ে পুরো সমাজকে গ্রাস করবে। আমাদের সন্তানদের নিরাপদ শৈশব ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।
