কাঁচা খেজুরের রসে মৃত্যুর হাতছানি
তানজিদ শুভ্র
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শীতের সকাল মানেই আমাদের গ্রামবাংলায় এক অন্যরকম ভালোলাগা। কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে সূর্যটা যখন উঁকি দেয়, তখন খেজুর গাছের মাথায় ঝুলে থাকা হাড়িটার দিকে তাকালে কার না লোভ হয়? কনকনে ঠান্ডায় এক গ্লাস মিষ্টি খেজুরের রস এ যেন বাঙালির ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছোটবেলা থেকে আমরা দেখে এসেছি, ভোরে গাছ থেকে নামানো সেই রস খাওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। শহরের মানুষও সুযোগ পেলে গ্রামে ছুটে যান শুধু এই অমৃতের স্বাদ নিতে। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন বিক্রেতার সুবাদে শহরে বসেও দেখা মিলে খেজুর রসের।
সুমিষ্ট এই রসের আড়ালের শঙ্কার কথা আমরা অনেকেই এড়িয়ে যাই। কাঁচা খেজুর রসে মিশে থাকতে পারে ‘নিপাহ ভাইরাস’।
শুনতে খুব তাত্ত্বিক মনে হতে পারে, কিন্তু বিষয়টা আসলে খুবই সাধারণ এবং আমাদের চোখের সামনেই ঘটে। খেজুর গাছে যখন হাড়ি পাতা হয়, তখন সেই মিষ্টি রসের লোভ শুধু আমাদের নয়, বাঁদুরেরও থাকে। রাতের আঁধারে যখন সবাই ঘুমে, তখন বাঁদুর ওই হাড়ির মুখে বসে রস পান করে। সমস্যাটা এখানেই। বাঁদুর যখন রস খায়, তখন তার লালা বা প্রস্রাব ওই রসের সঙ্গে মিশে যায়। আর এই বাঁদুর যদি নিপাহ ভাইরাস বহন করে, তবে সেই রস হয়ে ওঠে মরণঘাতী।
ভয়ের কারণটা হলো, নিপাহ ভাইরাস কোনো সাধারণ রোগবালাই নয়। এর কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মানুষের মস্তিষ্কে ভয়াবহ প্রদাহ দেখা দেয়। জ্বর, মাথাব্যথা, প্রলাপ বকা, শ্বাসকষ্ট এবং শেষ পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এসবই এর লক্ষণ। পরিসংখ্যান বলছে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর আশঙ্কা প্রায় ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ। অর্থাৎ, আক্রান্ত ব্যক্তির বেঁচে ফেরাটা একপ্রকার অলৌকিক ঘটনার মতো।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাহলে খেজুরের রস খাওয়া ছেড়ে দেব? আমাদের হাজার বছরের এই ঐতিহ্য কি হারিয়ে যাবে? রস খাওয়া ছেড়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। আমাদের ঐতিহ্য ছাড়ার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু অভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন আনা। বিজ্ঞান এবং চিকিৎসকরা খুব সহজ একটি সমাধানের কথা বলছেন। খেজুরের রস খাওয়া নিষেধ নয়, নিষেধ হলো ‘কাঁচা’ রস খাওয়া।
ভাইরাসটি তাপে নষ্ট হয়ে যায়। তাই রস গাছ থেকে নামানোর পর যদি ভালোভাবে জ্বাল দেওয়া হয় বা ফুটিয়ে নেওয়া হয়, তবে তা পুরোপুরি নিরাপদ। আমরা শীতের পিঠাণ্ডপুলি খাই, পায়েস খাই বা গুড় খাই এতে কোনো ভয়ের কারণ নেই। কারণ এসব তৈরিতে আগুনের ব্যবহার হয় এবং উচ্চ তাপে ভাইরাস মারা যায়। বিপদ শুধু ওই গ্লাস ভরে সরাসরি কাঁচা রস খাওয়ার মধ্যে।
অনেকে হয়তো বলবেন, ‘কই, এতদিন তো খেয়েছি, কিছু তো হলো না!’ এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। বিপদ সব সময় বলে-কয়ে আসে না। হতে পারে আগেরবার আপনি বেঁচে গেছেন, কিন্তু এবারের গ্লাসটিতেই হয়তো মিশে আছে সেই মরণঘাতী জীবাণু। নিজের জীবনের বাজি ধরে ক্ষণিকের স্বাদের জন্য এই ঝুঁকি নেওয়াটা কি বোকামি নয়?
বিশেষ করে আমাদের বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ এবং শিশুদের ব্যাপারে আমাদের বেশি সতর্ক হতে হবে। গ্রামের অনেক মুরুব্বি আছেন, যারা এটা মানতেই চান না যে বাঁদুরের মুখ দেওয়া রসে মৃত্যু থাকতে পারে। তাদের বোঝানোর দায়িত্ব আমাদের। আপনি যখন কোনো টঙের দোকানে বা রাস্তার ধারে শখ করে কাঁচা রস কিনছেন, তখন ভাবুন, আপনি কি নিশ্চিত যে রাতে কোনো বাঁদুর ওই রসে মুখ দেয়নি? বিক্রেতা যতই বলুক তিনি জাল দিয়ে হাড়ি ঢেকে রেখেছিলেন, ঝুঁকিটা কিন্তু থেকেই যায়।
আসুন, এই শীতে আমরা একটু সচেতন হই। কাঁচা খেজুরের রসকে না বলি। রস অবশ্যই ভালো করে ফুটিয়ে বা গুড় বানিয়ে খাই। নিজে সচেতন থাকি এবং পাশের মানুষটিকেও সচেতন করি। জীবনটা অনেক সুন্দর, এক গ্লাস কাঁচা রসের জন্য এই সুন্দর জীবনটাকে আমরা যেন ঝুঁকির মুখে না ফেলি।
তানজিদ শুভ্র
গণমাধ্যমকর্মী
