১৭৮ টাকার জীবনের হিসাব

সুমাইয়া সিরাজ সিমি

প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এই দেশে সকাল শুরু হয় চা দিয়ে, আবার অনেক রাতের সিদ্ধান্তও শেষ হয় এক কাপ চায়ের ধোঁয়ায়। স্কুলের সামনে দাঁড়ানো চায়ের দোকানে অভিভাবকদের অপেক্ষা, কলেজ ক্যান্টিনে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে বিপ্লবের স্বপ্ন- সব কিছুর মাঝখানে থাকে চা। পাড়ার মোড়ে রাজনীতির আড্ডা হোক কিংবা অফিসের ক্লান্ত বিকেলে পাঁচ মিনিটের বিরতি- চা ছাড়া কথাই জমে না। চা আমাদের কাছে শুধু পানীয় নয়, এটি সময় কাটানোর অজুহাত, সম্পর্ক গড়ার মাধ্যম, মতবিরোধ মেটানোর নীরব সেতু। দেশ চালানোর সমাধান থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ–সুখ—সব আলোচনার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে সেই ছোট গ্লাসের চা। আমরা চা হাতে নিয়ে উচ্চস্বরে কথা বলি সমাজ, রাষ্ট্র আর ভবিষ্যৎ নিয়ে, কিন্তু খুব কমই কথা বলি সেই মানুষগুলোর জীবন নিয়ে, যাদের ঘামে ভিজে এই চা আমাদের হাতে পৌঁছায়। চায়ের কাপ হাতে নিলে আমরা উষ্ণতা পাই, ক্লান্তি ভুলে যাই। কিন্তু এই এক কাপ চায়ের পেছনে যে মানুষেরা ঘাম ঝরান, তাদের জীবনে সেই উষ্ণতা খুব কমই পৌঁছায়। সবুজে ঢাকা পাহাড়, সারি সারি চা গাছ আর কুয়াশায় মোড়া সকাল- এই সৌন্দর্যের আড়ালেই বাস করে চা শ্রমিকদের নীরব দারিদ্র্য, বঞ্চনা আর অবহেলার দীর্ঘ ইতিহাস।

বাংলাদেশের চা শিল্প শত বছরের পুরোনো। দেশের অর্থনীতিতে এর অবদান অনস্বীকার্য। অথচ এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি- চা শ্রমিকরা- আজও রয়ে গেছেন প্রান্তিক মানুষের তালিকায়। এই চা-আড্ডার দেশেই একজন চা শ্রমিক দিন শেষে পান মাত্র কয়েকশ’ টাকার মজুরি। এই চায়ের ভেতর লুকিয়ে থাকে ১৭৮ টাকার জীবনযুদ্ধ। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর হওয়ার পর একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৭৮.৫০ টাকা। সংখ্যাটি কাগজে সামান্য উন্নতির গল্প শোনালেও বাস্তব জীবনে এর অর্থ- দিন শেষে ন্যূনতম বেঁচে থাকার হিসাবও মেলানো কঠিন। দৈনিক মজুরি এতটাই কম যে তা দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাপনও নিশ্চিত করা যায় না। মজুরি বাড়ানোর দাবি বারবার উঠলেও বাস্তব পরিবর্তন খুবই সীমিত।

২০২২ সালে দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণের পর প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি, তার সঙ্গে এই বৃদ্ধি কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চাল, ডাল, তেল, সবজি- সবকিছুর দাম বেড়েছে বহুগুণ, অথচ চা শ্রমিকের আয় বেড়েছে নামমাত্র। ফলে মজুরি বৃদ্ধি বাস্তবে তাদের জীবনে স্বস্তি নয়, বরং টিকে থাকার আরেকটি ভঙ্গুর ভরসা মাত্র।

চা শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরেই দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরির দাবি জানিয়ে আসছেন। এই দাবি শুধু সংখ্যার লড়াই নয়, এটি সম্মানের সঙ্গে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা। মালিকপক্ষ প্রায়ই যুক্তি দেয়- মজুরির পাশাপাশি শ্রমিকরা রেশন, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা পান। সত্যিই, অনেক বাগানে শ্রমিকরা স্বল্পমূল্যে রেশন পান, যেমন ২ টাকা কেজি দরে আটা, পাশাপাশি চা, প্রাথমিক বাসস্থান ও সীমিত চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই সুবিধাগুলোর মান ও প্রাপ্যতা কি জীবনযাত্রার বাস্তব চাহিদা পূরণ করে?

চা শ্রমিকদের জীবনের শুরুই হয় বঞ্চনা দিয়ে। বেশিরভাগ শ্রমিক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই বাগানে কাজ করছে। বিকল্প পেশা বা জীবনের অন্য কোনো পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ তাদের নেই বললেই চলে। জন্মের পর থেকেই শিশুরা দেখে- মা-বাবা সারাদিন চা পাতা তুলছেন, অল্প মজুরিতে দিন কাটাচ্ছেন। ফলে দারিদ্র্য যেন উত্তরাধিকার সূত্রেই বয়ে চলে। শিক্ষার অভাব এই দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ। অনেক চা বাগানে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। দারিদ্র্যের কারণে শিশুদের স্কুল ছেড়ে কাজে নামতে হয় অল্প বয়সেই। ফলে তারা দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায় না, পায় না সমাজের মূল স্রোতে ফেরার শক্ত ভিত্তি। শিক্ষা না থাকায় নিজেদের অধিকার সম্পর্কেও তারা সচেতন হতে পারে না।

স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও করুণ। চা বাগানের হাসপাতাল বা ডিসপেনসারি থাকলেও সেখানে প্রায়ই ডাক্তার, ওষুধ ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার অভাব দেখা যায়। পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতির কারণে অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, চর্মরোগ ও নানা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা চা শ্রমিকদের নিত্যসঙ্গী। অথচ চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য তাদের নেই।

নারী শ্রমিকদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। চা শিল্পে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নারী। তারা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেন, ভারী বোঝা বহন করেন, অথচ মজুরি ও মর্যাদার প্রশ্নে তারা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।

বাসস্থান অনেক ক্ষেত্রে জরাজীর্ণ, চিকিৎসাব্যবস্থা সীমিত এবং শিক্ষাসুবিধা প্রাথমিক পর্যায়েই আটকে থাকে। এসব সুবিধার আর্থিক মূল্য যোগ করলেও একজন শ্রমিকের মোট আয় এমন পর্যায়ে পৌঁছায় না, যা দিয়ে একটি পরিবার সম্মানজনকভাবে চলতে পারে। ফলে ‘অন্যান্য সুবিধা আছে’ এই যুক্তি অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

আন্তর্জাতিক তুলনা এই বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। প্রতিবেশী ভারতের আসামে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি প্রায় ৩৩০ টাকা। শ্রীলঙ্কায় তা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬৭৪ টাকার সমতুল্য। সেখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ১৭৮.৫০ টাকা মজুরি শুধু কম নয়, বরং অপমানজনক বলেই মনে করেন শ্রমিকরা। একই ধরনের পরিশ্রম, একই ধরনের শিল্প; কিন্তু মজুরিতে এত বড় ব্যবধান প্রশ্ন তো তুলবেই।

চা শ্রমিকদের আন্দোলন তাই হঠাৎ নয়। এটি বছরের পর বছর জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তারা শুধু বেশি টাকা চায় না, চায় নিরাপদ ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষা, অসুস্থ হলে চিকিৎসার নিশ্চয়তা। তারা চায়- চা শিল্পের সাফল্যের গল্পে নিজেদের নামটুকু ন্যায্যভাবে যুক্ত করতে। আধুনিক বাংলাদেশের গল্পের পাশে দাঁড়িয়ে চা শ্রমিকদের জীবন যেন অন্য এক শতাব্দীতে আটকে থাকা বাস্তবতা।

প্রশ্ন ওঠে- এই অবস্থা কি চিরকালই থাকবে? চা শিল্পের মালিকপক্ষ, রাষ্ট্র এবং সমাজ- সবারই এখানে দায়িত্ব আছে। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায় নয়, এটি একটি সাংবিধানিক ও নৈতিক কর্তব্য। মজুরির পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসনের উন্নয়ন ছাড়া চা শ্রমিকদের জীবনমান বদলানো সম্ভব নয়।

এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সরকারের দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, তার বাস্তবায়নই সরকারের প্রকৃত দায়িত্বের মানদ-। চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। চা শিল্পের সাফল্য তখনই টেকসই হবে, যখন সেই সাফল্যের অংশীদার হিসেবে শ্রমিকরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে ন্যায্য স্বীকৃতি ও সুরক্ষা পাবে।

এক্ষেত্রে ভোক্তা হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। আমরা যে চা পান করি, তার পেছনের শ্রমের গল্প জানার চেষ্টা করা, ন্যায্য দাবির পক্ষে কথা বলা- এই ছোট সচেতনতাই বড় পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষকেও স্পর্শ করে।

আমাদের রাজনীতি, সমাজ আর অর্থনীতির আলোচনায় চা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, চা শ্রমিকদের জীবন ততটাই উপেক্ষিত। তাই চা নিয়ে কথা বলার সময় শুধু কাপের ভেতরের স্বাদ নয়, সেই কাপের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কথাও বলা জরুরি।

চা যদি আমাদের জাতীয় আড্ডার প্রতীক হয়, তবে চা শ্রমিকদের ন্যায্য জীবন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সেই আড্ডার নৈতিক উপসংহার। চা শ্রমিকদের ঘাম আর শ্রমের ন্যায্য মূল্য না দিলে, আমাদের চায়ের স্বাদ যতই ভালো হোক- তার ভেতরে থেকে যাবে এক তিক্ত বাস্তবতা।

সুমাইয়া সিরাজ সিমি

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়