গ্রন্থাগারের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন তরুণদের
উম্মে সালমা
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানব উন্নয়ন মানে ব্যক্তি মানুষকে মননে-মেধায় এবং দক্ষতার দিক দিয়ে উৎকৃষ্ট করে গড়ে তোলা। দক্ষ ও যোগ্য মানুষ সেই হতে পারে, যে তার সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করে, তার মেধাকে কাজে লাগিয়ে নিজের এবং অপরের কল্যাণ সাধনে নিয়োজিত করে। আর একজন মানুষকে দক্ষ ও যোগ্য করে তুলতে প্রয়োজন গ্রন্থাগারের। মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এবং মানুষের পাঠের জন্য বিভিন্ন গ্রন্থ যে ঘরে রাখা হয় তাই গ্রন্থাগার। তবে গ্রন্থাগারে গ্রন্থের পাশাপাশি নানারকম পত্রপত্রিকা এবং খেলাধুলার সামগ্রীও থাকে। গ্রন্থাগার সাধারণত তিন প্রকারের হয়ে থাকে। যেমন- ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সর্বজনীন। এ তিন প্রকারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সর্বজনীন।
যে গ্রন্থাগার সমাজের সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত এবং সমাজের সব মানুষের পছন্দের কথা বিবেচনায় রেখে যেখানে গ্রন্থ নির্বাচন করা হয় তা সর্বজনীন গ্রন্থাগার। স্কুল-কলেজের গ্রন্থাগারে পাঠ্য বিষয় ও পাঠ-সহায়ক বিষয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, খেলাধুলা প্রভৃতি বিষয়ের ওপর লেখা বই এবং বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকী রাখা হয়। সাহিত্য চর্চার জন্য কল্পনাশক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ব্যাপক অধ্যয়ন ও অনুশীলন।
গ্রন্থাগারের একমাত্র পন্থা হলো শিক্ষা। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা দেহ-মনের সুষম এবং পরিপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে ব্যক্তির জীবনের প্রকৃত মাধুর্যও পরম সত্য উপলব্ধিতে সহায়তা করে।’
শিক্ষার্জনের দ্বারাই মানুষ তার ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে তুলতে পারে, হতে পারে একজন বিবেকবান, আলোকিত মানুষ। একজন মানুষ যখনই জ্ঞানী হতে থাকে তখনই সে নিজের ভেতরের সুকোমল বৃত্তিগুলোর পরিচর্যা করার প্রয়াস পায় এবং একইসঙ্গে নিন্দনীয় দোষগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট হয়। এভাবেই জ্ঞানার্জন মানুষকে আলোকিত ও পবিত্র করে তোলে এবং তার আলোয় সমাজ আলোকিত হয়। আর জ্ঞানচর্চা বা জ্ঞানার্জনের জন্য সর্বোত্তম স্থান হচ্ছে গ্রন্থাগার। এর কারণ হিসেবে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, আমি গ্রন্থাগারকে স্কুল-কলেজের ওপরে স্থান দিই এই কারণে যে, এই স্থলে লোকে স্বেচ্ছায় স্বাচ্ছন্দ্যচিত্তে স্বশিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পায়; প্রতি লোক তার স্বীয় শক্তি ও রুচি অনুসারে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
গ্রন্থাগার সবার জন্যই মুক্ত ও অবাধ এবং সব ধরনের গ্রন্থের সমাহার থাকে। পড়বার স্বাধীনতা এখানে অফুরন্ত। একটি পক্ষপাতমুক্ত সমাজ গড়ার সহায়ক শক্তি লেখক, প্রকাশক ও গ্রন্থাগারিক। গণতন্ত্রের সাফল্যে গ্রন্থাগারের ভূমিকা টেলিভিশন, রেডিও, প্রচার মাধ্যম কোনোটার চেয়ে কম নয়। আধুনিক বিশ্বে গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা দিনে দিনে বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাই বড় বড় গ্রন্থাগার স্থাপিত হয়ে আসছে। প্রমথ চৌধুরীর আরও একটি কথা যা এখানে উদ্ধৃত করছি- ‘এদেশে গ্রন্থাগারের সার্থকতা হাসপাতালের চাইতে কিছু কম নয়, এবং স্কুল-কলেজের চেয়ে কিছু বেশি। তার কারণ আমাদের শিক্ষার বর্তমান অবস্থায় গ্রন্থাগার হচ্ছে এক রকম মনের হাসপাতাল। দেহের সুস্থতার জন্য হাসপাতালের প্রয়োজন আর মনের সুস্থতার জন্য দরকার গ্রন্থাগার।’
বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক গ্রন্থাগার আছে। কিন্তু এসব গ্রন্থাগারের চর্চা উল্লেখ্যযোগ্য নয়। অতীতে শহরাঞ্চলের পাড়ায়-মহল্লায় এমনকি গ্রামগুলোতেও শিক্ষিত লোকেরা মিলে গ্রন্থাগার গড়ে তুলতেন। এ ক্ষেত্রে তরুণরাই পালন করতেন অগ্রণী ভূমিকা। স্বল্পশিক্ষিত গৃহবধূ, মা-বোনেরাও পাড়ার গ্রন্থাগার থেকে লোকজনের সহায়তায় বই পাঠ করতেন। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির নামে আধুনিক ও বিলাসী হয়ে গ্রন্থাগার এর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি আমরা। অথচ শিক্ষার্জন, জ্ঞান অন্বেষণ ও বিদ্যা লাভ, মনের খোরাক জোগানো কিংবা অবসরের অতুলনীয় সঙ্গী হিসেবে বই তথা গ্রন্থাগার আমাদের প্রয়োজনের এক অপরিহার্য সামগ্রী।
সৃজনশীল পুস্তক সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা দায়িত্বশীলরা কখনোই এড়িয়ে চলতে পারে না। আমাদের মনে হয়, সমাজের বিত্তবান মানুষগুলো যদি ইচ্ছা করে, তাহলে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই দেশে সৃজনশীল বইয়ের পাঠক সৃষ্টি তথা তত্ত্ব ও তথ্য সমৃদ্ধ বইয়ের সমাহারে অসংখ্য গ্রন্থাগার গড়ে তোলা যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। আমরা বিশ্বাস করি, বই পাঠের মাধ্যমেই দূর হবে অন্ধকার, কুসংস্কার, অরাজকতা, যাবতীয় সামাজিক অবক্ষয়। তাই আমার মনে হয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয় রোধে এবং মানব জীবনকে সার্থক করতে গ্রন্থাগারই হতে পারে সর্বোৎকৃষ্ট বিকল্প।
উম্মে সালমা
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ
