আপনজনের হাতেই ভাঙছে শৈশব
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুরা ভরসা করে পরিচিত মুখে। মা-বাবার পরে যাদের কোলে, ঘরে বা আশপাশে তারা সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করে- সেই আত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিত মানুষদের কাছেই অনেক সময় তাদের শৈশব সবচেয়ে অনিরাপদ হয়ে ওঠে। সমাজে আমরা এখনও ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন বলতে অচেনা অপরাধীর ছবিই কল্পনা করি। অথচ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা- শিশুদের ওপর সংঘটিত অধিকাংশ যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে পরিচিত ও আপনজনদের মাধ্যমেই।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ৫ হাজার ৬০০-এর বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যম ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শুধু ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই ৩০০-এর বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। এই সংখ্যার ভেতরে রয়েছে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুরাও- যাদের বোঝার ক্ষমতা তো দূরের কথা, প্রতিবাদ করার ভাষাও নেই। এসব ঘটনার একটি বড় অংশেই অভিযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন- আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, গৃহশিক্ষক কিংবা পরিবারের ঘনিষ্ঠ কেউ।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। ইউনিসেফের বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে- বাংলাদেশে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জন কোনো না কোনোভাবে পারিবারিক বা পরিচিতজনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়। অর্থাৎ শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় তার নিজের ঘর কিংবা ঘনিষ্ঠ পরিবেশই। গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করা একাধিক ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
কখনও মামার হাতে ভাগ্নি ধর্ষণ, কখনও দুলাভাইয়ের দ্বারা শিশু নির্যাতন, কখনও মাদ্রাসা বা স্কুলে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসব ঘটনা সমাজকে কিছু সময়ের জন্য নাড়া দিলেও, আলোচনার ঝড় থেমে গেলে শিশুটির জীবনে থেকে যায় গভীর ক্ষত। এসব ঘটনা শুধু কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। এসব ঘটনায় ক্ষণিকের জন্য দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হলেও, সময় গড়ালে আলোচনাও থেমে যায়- কিন্তু শিশুটির জীবনে ক্ষত থেকে যায় আজীবনের জন্য।
শিশু নির্যাতনের একটি বড় সমস্যা হলো- এটি বেশিরভাগ সময় নীরবে ঘটে। খারাপ টাচ সবসময় জোরপূর্বক হয় না; অনেক সময় তা আসে আদর, খেলাধুলা বা ‘গোপন কথা’-র মোড়কে। শিশুরা বুঝতেই পারে না, তাদের সঙ্গে যা ঘটছে তা অপরাধ। অপরাধীরা এই অজ্ঞানতাকেই ব্যবহার করে। ভয় দেখানো, লোভ দেখানো কিংবা সম্পর্কের দোহাই দিয়ে শিশুকে চুপ করিয়ে রাখা হয়।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো- অনেক পরিবারে ঘটনা জানাজানি হলে তা চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক, সামাজিক সম্মান বা লোকলজ্জার অজুহাতে শিশুর ন্যায়বিচার বিসর্জন দেওয়া হয়। অনেক সময় শিশুকেই দায়ী করা হয়, তাকে ভয় দেখানো হয়, মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়। এতে অপরাধী শাস্তির বাইরে থেকে যায় এবং ভবিষ্যতে আরও শিশু তার শিকার হয়।
এই নির্যাতনের প্রভাব শুধু সেই মুহূর্তেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি শিশুর সারাজীবনের মানসিক গঠনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ, আত্মবিশ্বাসের অভাব, বিষণ্ণনতা, আত্মঘৃণা- এসব অনুভূতি নিয়ে বড় হতে হয় অনেক শিশুকে। পড়াশোনায় মনোযোগ হারানো, সম্পর্ক গড়তে ভয় পাওয়া, এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়। একটি অপরাধ একটি জীবনকেই শুধু নয়, একটি প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর আঘাত হানে। এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পরিবার ও অভিভাবকদের। শিশুকে বয়স অনুযায়ী ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শের ধারণা দেওয়া কোনো অশালীনতা নয় বরং এটি জীবনরক্ষার শিক্ষা। শিশুকে শেখাতে হবে, তার শরীর তার নিজের, এবং কোনো স্পর্শে অস্বস্তি বোধ করলে সে যেকোনো মানুষকে ‘না’ বলতে পারে- সে মানুষ যত আপনই হোক না কেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা ও বিশ্বাস করার পরিবেশ তৈরি করা।
রাষ্ট্রের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নের মুখে। শিশু সুরক্ষা আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার ও শিশুবান্ধব আইনি সহায়তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার মানসিক ও আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে। দ্রুত বিচার, সাক্ষী সুরক্ষা এবং মানসিক কাউন্সেলিং নিশ্চিত না করলে আইন কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। স্কুল, কোচিং সেন্টার ও সামাজিক পরিসরে শিশু সুরক্ষা বিষয়ক বাধ্যতামূলক শিক্ষা চালু না হলে শুধু আইন দিয়ে এই অপরাধ ঠেকানো যাবে না।
গণমাধ্যম ও সমাজের সম্মিলিত ভূমিকা এই সংকট মোকাবিলায় অপরিহার্য। সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন, ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা তৈরি করাই পারে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে। কারণ শিশু নির্যাতন কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়- এটি একটি গুরুতর সামাজিক অপরাধ। একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা মানে একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়া। পরিচিত মুখের আড়ালে যেন আর কোনো শিশুর কান্না চাপা না পড়ে। নীরবতা ভাঙতে হবে এখনই- কারণ প্রতিটি নীরবতা একটি অপরাধীকে আরও সাহসী করে তোলে। নিরাপদ শৈশব ছাড়া কোনো সুস্থ সমাজ, কোনো মানবিক ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে না।
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
