বৈশ্বিক উষ্ণতা জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ
লোটাস জাহাঙ্গীর
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন একটি পরিবেশগত সংকট, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। শিল্পোন্নত দেশগুলোর শতাব্দীজুড়ে কার্বন নিঃসরণের ফল আজ সবচেয়ে বেশি ভোগ করছে উন্নয়নশীল ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো।
আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (IPCC)-এর সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, শিল্প- পূর্ব সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা এরইমধ্যে প্রায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উষ্ণতা বৃদ্ধি সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে দক্ষিণ এশিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চলে। ২০২৩ সালে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা ৪৮-৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য ও শ্রম উৎপাদনশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
গ্রীষ্মকাল দীর্ঘতর হচ্ছে এবং শীতকাল ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হয়ে পড়ছে- যা কৃষি চক্রকে ব্যাহত করছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের একটি সরাসরি প্রভাব হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। বৈজ্ঞানিক পরিমাপ অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে ৩-৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে এই হার আরও বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ এলাকা স্থায়ীভাবে প্লাবিত হতে পারে, যার ফলে প্রায় ৩ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা সরাসরি জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে ধান ও গমের উৎপাদন গড়ে ৫-১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
দেশের লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে এরইমধ্যে উপকূলীয় অঞ্চল গুলোতে ধান চাষ সংকুচিত হয়েছে। অন্যদিকে অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ ও বন্যার ঝুঁকি একসঙ্গে বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়- এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও হুমকি। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের জিডিপি ২-৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্নআয়ের মানুষ, যারা কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। এই সংকট মোকাবিলায় নদী ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ পূর্বাভাস, তাপপ্রবাহ সতর্কতা, জলবায়ু অভিযোজন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যৎ নয়- এটি আমাদের বর্তমান বাস্তবতা।
বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও মানবিক দৃষ্টিকোণ- সব দিক থেকেই এটি একটি প্রমাণিত সংকট। সচেতনতা ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব।
লোটাস জাহাঙ্গীর
দৌলতপুর, কুষ্টিয়া
