বাংলাদেশে মধ্যবিত্তদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই

আরশী আক্তার সানী

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এক অদ্ভুত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে তারা দরিদ্রও নয়, আবার ধনীও নয়। আছে কষ্ট, আছে স্বপ্ন; আছে সীমাবদ্ধতা, আছে সম্ভাবনা কিন্তু এসবের মধ্যখানে বাস করা মানুষগুলো যেন একটি ‘অদৃশ্য চাপ’-এর চক্রে আটকে যায়। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও কোথাও একটা টান, কোথাও একটা অস্থিরতা সব সময় কাজ করে। এই চাপ কখনো ঘুম ভাঙার আগেই অনুভূত হয়, কখনও রাতের খাবার টেবিলে, কখনও সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে নির্ঘুম রাতে।

মধ্যবিত্তের জীবনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেকে টিকিয়ে রাখা। তারা একধাপ নেমে গেলেই গরিব হওয়ার ভয়, আর একধাপ উঠতে গেলেই অজস্র প্রতিযোগিতা। ফলে রোজকার ছোট ছোট সিদ্ধান্তও হয়ে পড়ে অত্যন্ত ভারী। কোথায় কত খরচ করা যাবে, কোন স্বপ্নটা আপাতত স্থগিত রাখতে হবে, কোন চাহিদাটা চেপে ফেললে চলে- এসব হিসেব-নিকেশই যেন তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী।

সংসারের খরচ চোখে না পড়া লড়াই

বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য সবচেয়ে কঠিন জায়গা হলো মাসিক ব্যয় সামলানো। ঘরের ভাড়া, বাজারের দাম, বিদ্যুৎ বিল, চিকিৎসা সবকিছুই বাড়ছে, কিন্তু আয় সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। বাজারে গেলে তারা সবজি কিনে আলোচনার ভাষা আর সংখ্যার ভাষার মধ্যে মিল খুঁজে পায় না। আগে যেখানে ১০০ টাকায় কোনোভাবে রাঁধা হতো, এখন সেখানে ৩০০-৪০০ টাকায়ও হিসেব মেলে না। তাদের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হলো, অভিযোগ করার সুযোগও নেই কারণ সমাজ তাদের দেখে ‘ভালো অবস্থায় থাকা মানুষ’ হিসেবে। তাই নিজের কষ্ট নিজের ভেতরেই রাখা ছাড়া আর পথ থাকে না।

বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত পরিবারের মূল স্বপ্ন থাকে সন্তানকে ভালো শিক্ষা দেওয়া। কিন্তু সেই শিক্ষার পথটা এখন অনেক ব্যয়বহুল। স্কুলের ফি, কোচিং, অনলাইন ক্লাস, অতিরিক্ত কার্যক্রম সব মিলিয়ে সন্তানকে শিক্ষিত করা মানে এক ধরনের যুদ্ধ।

মধ্যবিত্ত মা-বাবারা মনে মনে জানেন, তাদের সন্তান যদি ভালো জায়গায় প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে পরিবারের স্বপ্নগুলো ভেঙে যেতে পারে। তাই চাকরির পরের ক্লান্তিটুকু চেপে তারা সন্তানের সামনে হাসিমুখে বসেন, পড়ায় সাহায্য করেন। এভাবেই মধ্যবিত্তের জীবনে প্রতিটি দিন শুধু দায়িত্বে নয়, অপরাধবোধেও ভরা আরও বেশি দিতে পারলে হয়তো ভালো হতো।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের আরেক বড় বোঝা হলো সম্মানের ভয়। তারা চাইলে সব কিছু করতে পারে না কারণ পাড়াপড়শির চোখ, আত্মীয়ের মন্তব্য, বন্ধুর তুলনা, অফিসের সহকর্মীর বিচার সব কিছুই তাদের ওপর চাপ তৈরি করে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সব সময় চেষ্টা করে নিজেদের ‘ভালো অবস্থায়’ দেখাতে।

বিয়ে, উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান সব জায়গাতেই মধ্যবিত্তের এক ধরনের অভিনয় করতে হয়। একটু কম খরচ করলে লোকেরা কথা বলবে, আর বেশি খরচ করলে নিজেরাই পরে চাপের মধ্যে পড়ে। এই মান-ইজ্জতের দোলাচল তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ধীরে ধীরে চাপ সৃষ্টি করে, যা অনেক সময় কেউ টেরও পায় না।

মধ্যবিত্তদের বড় অংশই চাকরিজীবী। আর এ দেশের চাকরির একটা অনিবার্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অনিশ্চয়তা। যে কোনো মুহূর্তে চাকরি চলে যেতে পারে, বেতন বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিংবা কোম্পানি সংকটে পড়ে কর্মী ছাঁটাই করতে পারে। এই ভয়ের কারণে মধ্যবিত্তরা কখনই পুরোপুরি নিশ্চিন্তে থাকতে পারে না। তারা জানে, এক মাসের চাকরির ক্ষতি মানে কয়েক মাসের বিপদ। এ কারণে তারা প্রায়ই নিজের দক্ষতা বাড়ানোর কথা ভাবে, কিন্তু সময়ের অভাবে বা আর্থিক চাপে তা করতে পারে না। ফল এক ধরনের নীরব মানসিক দুশ্চিন্তা।

মধ্যবিত্ত মানুষরা নিজের জন্য সময় বের করতে পারে না। অন্য সবকিছুর আগে সংসার, দায়িত্ব, কর্তব্য এসবের মধ্যে নিজের শখ, বিশ্রাম বা মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো কোথাও হারিয়ে যায়। বাইরে কোথাও ঘুরতে যেতে চাইলে মনে হয়, এই টাকা দিয়ে হয়তো অন্য কিছু করা যেত। নিজের জন্য কিছু কিনলে মনে হয়, এটা কি সত্যি প্রয়োজন ছিল? এই আত্মদংশনই মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় অদৃশ্য যন্ত্রণা। বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে মধ্যবিত্ত মানেই অবিরাম দৌড়ঝাঁপ। বাসায় ফেরার সময় রাত আটটাকে রাত দশটা করে দেয় যানজট। বাসে বা রাস্তায় থেকে বাড়ি পৌঁছানোর পর তাদের মুখে কোনো অভিযোগ শোনা যায় না কারণ এটা যেন তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, খাবারের ভেজাল, শহরের হুল্লোড় সব মিলিয়ে তারা যেখানে বসবাস করে, সেটাই তাদের ওপর প্রতিদিনের অদৃশ্য চাপ চাপিয়ে দেয়।

মধ্যবিত্তরা সব সময় স্বপ্ন দেখে নিজের বাড়ি, নিরাপদ জীবন, ভালো শিক্ষা, পরিবারকে সময় দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের পথে তাদের আর্থিক কাঠামো সব সময় একটি সীমারেখা টেনে দেয়। তারা দিন শেষে ঘরের আলো নিভিয়ে শুতে যায়, কিন্তু ভাবতে থাকে আগামী মাসটায় কি হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর তারা নিজেরাও জানে না।

আরশী আক্তার সানী

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়