বিবাহ, বহুবিবাহ ও বাংলাদেশের সমসাময়িক প্রেক্ষাপট

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিবাহের মূল তাৎপর্য হলো- সামাজিক নিরাপত্তা, বংশবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং মানসিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রদান করা। এর উৎপত্তি মানবসভ্যতার আদিকাল থেকেই, যখন মানুষ গোষ্ঠীগত জীবন শুরু করে এবং সামাজিক সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এটি শুধু একটি জৈবিক মিলন নয়, বরং সামাজিক অনুমোদন ও প্রত্যাশার এক বিশেষ রূপ, যা বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়েছে। এটি শুধু একটি জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম নয়, বরং একটি পবিত্র সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন, যা একটি সুস্থ পরিবার এবং সমাজ গঠনের মূলভিত্তি। আদিম সমাজ থেকে শুরু করে আধুনিক সভ্যতা পর্যন্ত বিবাহের রূপ পরিবর্তিত হলেও এর গুরুত্ব অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে বহুবিবাহ এবং এই সংক্রান্ত হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার ও অপপ্রচারের ফলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা বিবাহের ইতিহাস থেকে শুরু করে সমসাময়িক আইনি বিতর্ক এবং ইনসাফ বা সমবণ্টনের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

বিবাহ’ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘বি-বহ্’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো ‘বিশেষভাবে বহন করা’। অর্থাৎ, স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর ভরণ-পোষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করাই হলো বিবাহ। আরবিতে একে বলা হয় ‘নিকাহ’, যার মূল অর্থ হলো মিলন বা একত্রিত হওয়া।

মানব সভ্যতার শুরুতে বিবাহ প্রথা বর্তমানের মতো সুশৃঙ্খল ছিল না। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, প্রাচীনকালে গোষ্ঠীগত মিলন বা অবাধ মেলামেশা প্রচলিত ছিল। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বংশধারা রক্ষা এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে বিবাহের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রায় ৪০০০ বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় প্রথম লিখিত বিবাহ চুক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো বিবাহকে একটি পবিত্র ধর্মীয় রূপ প্রদান করে।

একজন পুরুষ ও একজন নারীর মধ্যে সংঘটিত বিবাহ, এটি বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ সমাজ ও আইনে স্বীকৃত এবং আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। এটি দাম্পত্য জীবনে মানসিক স্থিতি ও পারস্পরিক বিশ্বস্ততা বজায় রাখতে সহায়ক। যখন একজন ব্যক্তি একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেন। ইসলামসহ কিছু ধর্মে বিশেষ শর্তসাপেক্ষে বহুবিবাহের অনুমতি থাকলেও আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ এক বিবাহে বিশ্বাসী। কিছু আফ্রিকান এবং আরব দেশে বহুবিবাহের হার বেশি (প্রায় ১০-২৫ শতাংশ)। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বে বহুবিবাহ আইনত নিষিদ্ধ। ইউরোপের দেশগুলোতে (যেমন: ফ্রান্স, সুইডেন, ডেনমার্ক) প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ মানুষ বিয়ের আগে বা বিয়ে ছাড়াই একত্রে বসবাস করে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপের প্রায় সব দেশ, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ওশেনিয়া অঞ্চলে লিভণ্ডইন টুগেদার সম্পূর্ণ বৈধ এবং এর জন্য বিবাহ বাধ্যতামূলক নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে যে দেশগুলোতে বিয়ের হার তুলনামূলক কম যেমন- কাতার, কুয়েত, সলমন দ্বীপপুঞ্জ, চিলি, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস।

ধর্মভেদে বিবাহের বিধান : ইসলামণ্ড একজন পুরুষ একই সাথে সর্বোচ্চ ৪টি বিবাহ করতে পারেন, তবে শর্ত হলো সকল স্ত্রীর মধ্যে পূর্ণ সমতা ও ইনসাফ বজায় রাখা। হিন্দু ধর্মে- সনাতন ধর্মশাস্ত্রে বহুবিবাহের উল্লেখ থাকলেও ১৯৫৫ সালের হিন্দু বিবাহ আইন (ভারত) অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে হিন্দু পুরুষদের বহুবিবাহ আইনত নিষিদ্ধ নয়, তবে সামাজিকভাবে এটি এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়। খ্রিস্টধমণ্ড মূলত এক বিবাহে বিশ্বাসী। ‘এক দেহ এক প্রাণ’ তত্ত্বে বিশ্বাসী হওয়ায় এখানে বহুবিবাহের কোনো স্থান নেই। বৌদ্ধ ধমণ্ড এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ বিষয় হিসেবে বিবেচিত। তবে বৌদ্ধ ধর্ম মূলত এক বিবাহের পক্ষপাতি।

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ৬ ধারা অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি এবং সালিশি পরিষদের অনুমোদন ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। সম্প্রতি হাইকোর্ট এক পর্যবেক্ষণে বলেছেন যে, মুসলিম আইনে বহুবিবাহের অনুমতি থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি নিরুৎসাহিত করা উচিত। আদালত মূলত প্রথম স্ত্রীর অধিকার রক্ষা এবং বিনা কারণে পরিবার ধ্বংস না করার দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও আলেম প্রচার করছেন যে, হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন ‘বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না’। এটি মূলত ভুল ব্যাখ্যা। বাস্তবতা হলো হাইকোর্টের এই পূর্ণাঙ্গ গায়ে মাধ্যমে বহুবিবাহ পূর্বের তুলনায় এখন অনেকটা কঠিন হয়েছে, কারণ পূর্বে প্রথম স্ত্রী অনুমতি হলেই দ্বিতীয় বিয়ে করা যেত, এই রায়ে বলা হয়েছে প্রথম স্ত্রী অনুমতিপত্র সালিশি বোর্ডে জমা দিতে হবে। অর্থাৎ প্রথম স্ত্রী অনুমতি প্রদান করলেও, সালিশি বোট অনুমতি প্রদান না করলে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে না। একশ্রেণির লোক ধর্মীয় অনুমতির দোহাই দিয়ে আইনি বাধ্যবাধকতাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন, যা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বহুবিবাহ প্রায়ই প্রথম স্ত্রীর প্রতি অবিচার হিসেবে আবির্ভূত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিবাহের ফলে প্রথম স্ত্রী ও সন্তানরা আর্থিক ও মানসিক অবহেলার শিকার হন। ইসলামের মূল স্পিরিট হলো ‘ইনসাফ’। যদি কেউ ইনসাফ করতে না পারে, তবে তার জন্য একটির বেশি বিয়ে করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে (সুরা নিসা, আয়াত ৩)। যিনি বহুবিবাহ করবেন, তার অবশ্যই নিচের যোগ্যতা থাকতে হবে : সব স্ত্রীর আলাদা আবাসন ও উন্নত জীবন নিশ্চিত করার ক্ষমতা। সমানভাবে সময় দেওয়ার ক্ষমতা। পক্ষপাতিত্ব না করে ন্যায়বিচার করার মানসিকতা। প্রতিটি স্ত্রীর জন্য সমান রাত বরাদ্দ করা। খাবার, পোশাক এবং হাতখরচের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখা। স্বামী হিসেবে একজনের প্রতি অতি ভালোবাসা দেখিয়ে অন্যজনকে অবহেলা না করা।

বিবাহ এবং বহুবিবাহ বিষয়ে আমাদের সবার নিম্নলিখিত সচেতনতা ও করণীয় নির্ধারণ করা উচিত : বিবাহকে শুধু অধিকার হিসেবে না দেখে দায়িত্ব হিসেবে দেখা উচিত। আবেগের বশবর্তী হয়ে বা জেদ করে দ্বিতীয় বিবাহ করার আগে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভাবা উচিত। দাম্পত্য কলহ নিরসনে আলোচনার পথ বেছে নেওয়া উচিত। পরকীয়া বা লুকিয়ে বিয়ে না করে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।

বাংলাদেশ সরকার ১৯৬১ সালের পারিবারিক আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা উচিত। বিনা অনুমতিতে দ্বিতীয় বিবাহ করলে শাস্তির মেয়াদ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিবাহ নিবন্ধনের ডিজিটাল ডাটাবেস তৈরি করা দরকার, যাতে কেউ তথ্য গোপন করতে না পারে।

বিবাহ একটি পবিত্র চুক্তি যা বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার ওপর টিকে থাকে। বহুবিবাহ ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত হলেও এটি কোনো অধিকার নয়, বরং একটি বিশাল দায়িত্ব ও কঠিন পরীক্ষা। ইনসাফ বা সমবণ্টন নিশ্চিত না করে বহুবিবাহ করা শুধু অনৈতিক নয়, বরং ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আইনের লঙ্ঘন। বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশে পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে এক বিবাহই সর্বোত্তম পন্থা। আমাদের মনে রাখা উচিত, একটি ভাঙা পরিবার একটি অশান্ত সমাজের জন্ম দেয়। তাই বিবাহের ক্ষেত্রে আইনি বিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটানোই বর্তমান সময়ের দাবি।

পরিশেষে। বিবাহ একটি দায়িত্বশীল চুক্তি। বহুবিবাহ ইসলামে একটি ‘বিশেষ অনুমতি’, এটি সাধারণ নিয়ম নয়। সমবণ্টন ও ইনসাফ নিশ্চিত করতে না পারলে বহুবিবাহ পরকালে শাস্তির কারণ হতে পারে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা প্রতিটি নাগরিকের ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্ব। ধর্ম ও আইনের অপব্যাখ্যা রোধে আলেম সমাজ এবং শিক্ষিত সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল