পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে স্থিতিস্থাপক সমাজ
মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন মানবজাতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘সবুজ জলবায়ু স্থিতিস্থাপক উন্নয়ন’ ধারণাটি সামনে এসেছে, যা পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে টেকসই করে তোলে। এই কলামে আমরা এই ধারণার গুরুত্ব, বাস্তবায়ন ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
সবুজ উন্নয়ন বলতে বুঝায় এমন উন্নয়ন যেটি পরিবেশের ক্ষতি না করে, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখে। এখানে মূল লক্ষ্য হলো উন্নয়নযজ্ঞের ক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো, বন সংরক্ষণ ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা।
স্থিরতা বা স্থিতিস্থাপকতা বলতে বোঝায় সমাজ ও পরিবেশ এমনভাবে গড়ে তোলা যা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সক্ষম। অর্থাৎ, সমাজ দুর্যোগ মোকাবিলা করে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধে সক্ষম হবে। সবুজ ও স্থিতিস্থাপক উন্নয়নের সমন্বয়ে ‘সবুজ জলবায়ু স্থিতিস্থাপক উন্নয়ন’ সৃষ্টি হয়, যা শুধু পরিবেশ রক্ষা করে না, বরং সমাজ ও অর্থনীতির টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। বন্যা, নদী ভাঙন, খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সংস্থা রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ২০ শতাংশ অংশ জলবায়ু ঝুঁকির শিকার, যা বিশেষত কৃষি ও মৎস্য খাতকে প্রভাবিত করছে। এসব পরিবর্তন দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড একশন প্ল্যান ২০১১’ প্রণয়ন করেছে। এই পরিকল্পনায় সবুজ উন্নয়নের দিকগুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎস ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব কৃষি, বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট, এবং জলের সাশ্রয়ী ব্যবহার এগুলোর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া, স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ ও জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
সবুজ জলবায়ু স্থিতিস্থাপক উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বও কম নয়। প্যারিস চুক্তি ও গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এই ফান্ড থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার তহবিল পেয়েছে, যা জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে প্রকৃত ফলাফল পেতে হলে এসব অর্থ সঠিক পরিকল্পনা ও মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে কাজে লাগানো জরুরি। সবুজ জলবায়ু স্থিতিস্থাপক উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় সম্পদ ও জ্ঞান ব্যবহার। গ্রামীণ এলাকায় কৃষি ও মৎস্য খাতে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব কমাতে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন যেমন লবণ-সহিষ্ণু ফসল, জৈব সার ব্যবহার, বন্যা-সহনীয় গাছপালা চাষ, ইত্যাদি প্রয়োজন। এসব পন্থা গ্রহণের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয় এবং কৃষক ও মৎস্যজীবীর আয় বাড়ে।
শিক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিও সবুজ উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ। পরিবেশ সচেতনতা ছাড়া প্রকৃতপক্ষে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে গণমাধ্যম ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের গুরুত্ব তুলে ধরা জরুরি। এর মাধ্যমে মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে পরিবেশ রক্ষার জন্য ছোট ছোট পদক্ষেপ নিতে উৎসাহী হবে, যা বৃহত্তর স্তরে সবুজ উন্নয়নকে সহায়তা করবে।
কারিগরি উন্নয়ন ও প্রযুক্তি স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি, সোলার প্যানেল, বায়োগ্যাস, পরিবেশ বান্ধব নির্মাণ প্রযুক্তি ইত্যাদি ব্যবহার করে সবুজ ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। এসব প্রযুক্তি সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করে তোলা হলে দেশের বৃহত্তর অংশে ছড়িয়ে পড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উৎস হবে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, সবুজ উন্নয়ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে না বরং নতুন কর্মসংস্থান ও শিল্পের সুযোগ সৃষ্টি করে। পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ যেমন পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদন, গ্রিন টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি এবং পরিবেশ সুরক্ষাভিত্তিক পর্যটন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করে। তাই সরকারের নীতিনির্ধারণে সবুজ উদ্যোগকে প্রাধান্য দিতে হবে। সামাজিক ক্ষেত্রে, সবুজ জলবায়ু স্থিতিস্থাপক উন্নয়ন দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস করে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। বিশেষত গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জীবন নিরাপদ হয়। পাশাপাশি, নারী ও শিশুদের বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। সবুজ জলবায়ু স্থিতিস্থাপক উন্নয়ন অর্জনের জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, স্থানীয় কমিউনিটি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয় অত্যাবশ্যক। একতাবদ্ধ প্রচেষ্টায় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ হবে না, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষ উন্নতির সুফল পাবে।
সবুজ জলবায়ু স্থিতিস্থাপক উন্নয়ন হলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুরক্ষিত, সমৃদ্ধ এবং টেকসই পৃথিবী গঠনের ভিত্তি। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি থেকে রক্ষা পাওয়া এবং উন্নয়নকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব। যদি আমরা সবাই মিলে পরিকল্পিত, সতর্ক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে পারি, তবে আমাদের দেশ একটি সবুজ, স্থিতিস্থাপক এবং উন্নত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাবে।
মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন
শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ
