ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

যে শহরের আলো পড়ে মানুষের মনের ওপর

আরিফুল ইসলাম রাফি
যে শহরের আলো পড়ে মানুষের মনের ওপর

শহরের আলো দেখে অনেকে ঝলমল করে উঠতে যায়, দোকানের এলইডি থেকে শুরু করে বিলবোর্ডের নীল-সবুজ ঝলক, পথে দাঁড়ানো গাড়ির হেডলাইট এবং আকাশছোঁয়া কাচের ভবনের জানালায় লেগে থাকা সোনালি রোদ। কিন্তু সেই আলো আসলে কি শহরকে সুন্দর করে, নাকি মানুষের চোখে কুয়াশা বসিয়ে দেয়, এ প্রশ্নটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ শহরের আলো যত বাড়ে, মানুষের মনের ভেতরে তত অন্ধকার জমতে থাকে। যেন কংক্রিটের এক মহানগর দাঁড়িয়ে আছে মানুষের মনের ওপর, তার হাঁপিয়ে ওঠা স্বপ্ন, ক্লান্তি আর অপরাধবোধের উপর।

শহর মানুষকে টানে। এখানে কাজ আছে, সুযোগ আছে, স্বপ্ন আছে; কমপক্ষে প্রতিশ্রুতি আছে। গ্রাম থেকে বা ছোট শহর থেকে আসা কেউ এই শহরের আলো দেখে ভাবে, এখানে এসে সে আলোয় ভেসে উঠবে। অথচ বাস্তবে শহরের আলো নির্দিষ্ট মানুষকে আলোকিত করে, বাকি সবাইকে শুধু পথ বাতলে দেয়। সেই পথেও আবার থাকে ভিড়, অপেক্ষা, প্রতিযোগিতা আর ভাঙা আশা।

শহরের প্রতিটি আলো যেন গোপনে প্রত্যাশার ফাঁদ। যতবার শহরের দিকে তাকানো যায়, ততবারই মনে হয় জীবনে কিছু কম আছে। ভবনের সারি মনে করিয়ে দেয় সফলতা মাপা হয় গ্লাসের জানালা দিয়ে, গাড়ির ধোঁয়া দিয়ে বা অফিসের পদবি দিয়ে। কেউ আলো দেখে গতি বাড়াতে চায়, কেউ দেখে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। শহরের আলো তাই মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করে, যারা আলো নিয়ে বেঁচে থাকে আর যারা আলো দেখে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে।

এ শহরে আলো কখনোই রাতে নিভে না। রাত অনেকের জন্য বিশ্রাম; কিন্তু শহরের জন্য রাতই সবচেয়ে কাজের মুহূর্ত। রেস্তোরাঁ, ডেলিভারি, নাইট শিফট, হাসপাতাল, কন্টেন্ট, প্রোগ্রামিং- সবই চলে আলোতে ঢাকা রাতের ভেতর। শহরের রাত যেন দিনের থেকে বেশি কর্মব্যস্ত, বেশি দ্রুত, বেশি দাবিদার। আর যারা এই রাতে হাঁটে, তারা বুঝতে পারে শহর কখনো থামে না, কিন্তু মানুষ থামে। মানুষের মন থামে, ক্লান্ত হয়, বসে পড়ে। শহরের আলো তাই মানুষের মনের উপরে ভেঙে পড়ে ধীরে ধীরে, শব্দহীন, অস্থিরভাবে।

এই শহরে কেউ কাউকে জানে না। কিন্তু সবাই কাউকে দেখছে। ফুটপাতের শিশুটি ঝাল মুড়ি বিক্রি করতে করতে আলোয় গা ভিজিয়ে নেয়, অফিস থেকে বের হওয়া যুবক ফোনে তাকিয়ে নিজের ব্যর্থতা ভাবছে, ক্যামেরা হাতে কেউ রাতের ছবি তুলছে; কোথাও যেন এই শহরের আলো মানুষকে একই সঙ্গে একা করে এবং দৃশ্যমান করে। যেন আধুনিক জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো অদেখা থেকে দৃশ্যমান হওয়া, কিন্তু কখনই পরিচিত না হওয়া।

শহরের আলোতে যে কাজ করে, সে আলোয় ভরসা করে; যে আলোতে থাকে, সে আলোকে সন্দেহ করে। কারণ আলো যত বাড়ে, তত মানুষের ভাগ্য সংকুচিত হতে থাকে। শহর যেন সেই জায়গা যেখানে মানুষ স্বপ্নে খরচ করতে শেখে। এখানে সম্পর্কের চেয়ে সময় দামি, কথার চেয়ে মেসেজ দ্রুত, অনুভূতির চেয়ে লক্ষ্য জরুরি। কেউ এখানে আসে বাঁচতে, কেউ টিকে থাকতে, কেউ পালাতে। সবাই একই আলোয় ভিজে, কিন্তু প্রত্যেকে ভিন্ন গল্প বহন করে।

শহরের আলো আবার খুব ধৈর্যশীল। সে মানুষকে বোঝার চেষ্টা করে না; সে শুধু আলোকিত করে। আর মানুষ নিজের অন্ধকার নিজের মতো বহন করে চলে। একসময় সেটা এত ভারী হয়ে যায় যে আলোও তাকে টানতে পারে না।

শহরে তখন দেখা যায় ক্লান্ত মুখ, চোখের নিচে কালো দাগ, নীরব বাস যাত্রা, এসি ঘরের নিঃশব্দ প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক মাধ্যমে কৃত্রিম হাসি। এ শহরের মানুষ নিজেরাই নিজের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী, নিজের ভাগ্যের সাথে নিজেরাই যুদ্ধ করে। তবুও শহর ছাড়তে পারে না কেউ। কারণ শহর মানুষকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে যে তার অন্ধকারও নিরাপদ লাগে। গ্রামের বা ছোট শহরের ধীর জীবন এখন অনেকের কাছে ভয়ের মতো মনে হয়। যেন আলো ছাড়া মানুষ আর অন্ধকারে মুখোমুখি হতে সাহস পায় না। শহরের আলো তাই শুধু বাইরে নয়, মানুষের ভেতরেও গেঁথে যায়। সিদ্ধান্তের আলো, আকাঙ্ক্ষার আলো, অর্জনের আলো, ব্যর্থতার আলো- সব মিলিয়ে মানুষকে দিন শেষে নরম করে, ভঙ্গুর করে, উদ্বিগ্ন করে।

শহরের আলো আবার দিক দেখায়, কিন্তু ঠিক কোন দিকে? সামনে? উপরে? নাকি এমন দিকে যেখানে মানুষ নিজের জীবনের সঙ্গে অপরিচিত হয়ে পড়ে? বড় শহরে অনেকেই এমনভাবে দৌড়ায় যে তারা জানেই না দৌড়ের গন্তব্য কোথায়। সফলতা, অবস্থান, অর্থ, প্রভাব- এসব শব্দের আলো যেন মানুষের জন্য রাস্তা তৈরি করে দেয়, অথচ সেই রাস্তায় হাঁটার অনুমতি সবার থাকে না।

তারপরও মানুষ আলো দেখে মুগ্ধ হয়। রাতের শহর যখন চকচকে হয়, তখন মনে হয় সব ঠিক আছে। শহরের আলো একধরনের চৌম্বকত্ব তৈরি করে, যেখানে বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়। দোকানের শোরুমে সাজানো জীবনের প্রতিলিপি দেখে মনে হয় সুখ কিনে নেওয়া যায়, বিজ্ঞাপনের আলোতে মনে হয় ভালোবাসা পাওয়া সহজ, কাচের গ্যালারি দেখে মনে হয় পরিছন্নতা মানেই সৌন্দর্য। বাস্তবে এগুলোই মানুষের মনের ওপর চাপিয়ে দেয় নীরব ভার। এই ভার গায়ে লাগে না, শব্দ হয় না, ধাক্কা দেয় না। শুধু মনে হয়, ‘তুমি যথেষ্ট নও’। শহরের আলো এমনই- প্রশংসা করে না, ব্যঙ্গও করে না, কিন্তু পরিমাপ করে। আর পরিমাপের যন্ত্রটা মানুষের মনের ভিতরেই বসানো।

কিন্তু শহরকে শুধু অপরাধী বলা যায় না। শহরের আলো আবার রক্ষা করে অনেককে। কোনো কোনো রাতে এই আলো না থাকলে মানুষ আরও একা হয়ে যেত। কেউ আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায়, কেউ দিক পায়, কেউ নতুন শুরু পায়, কেউ স্বপ্নের মতো কিছু স্পর্শ করে। আলো তাই দ্বৈত। আলো কখনও আশ্রয়, কখনও চাপ। শহরের আলো শেষ পর্যন্ত মানুষের মনের উপর ভেঙে পড়লেও, মানুষই সেই ভাঙা আলো দিয়ে আবার নিজের ভবিষ্যৎ জোড়া লাগায়। এই শহরে থাকা মানে ক্লান্ত হওয়া নয়; টিকে থাকার কৌশল শেখা। আর শহরের আলো সেই কৌশলের কঠিন শিক্ষক।

শহর মানুষকে শেখায়, আলো মানেই উজ্জ্বলতা নয়। কখনও আলো মানে প্রতিযোগিতা, কখনও অস্থিরতা, কখনও ক্লান্তি। কিন্তু তার সঙ্গেই আলো মানে সম্ভাবনা, সাহস ও নতুন দিনের নীরব প্রতিশ্রুতি। তাই শহরের আলো ভেঙে পড়লেও মানুষ বাঁচার চেষ্টা থামায় না। কারণ মানুষ জানে, অন্ধকারে চোখ অভ্যস্ত হতে পারে; কিন্তু আলো ছাড়া পথ দেখা যায় না।

আরিফুল ইসলাম রাফি

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত