গণভোটে তরুণ প্রজন্ম কেন ‘হ্যাঁ’ বেছে নেবে

আব্দুল কাদের জীবন

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের ইতিহাস যুগে যুগে রক্ত দিয়ে লেখা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলো আমাদের ইতিহাসের বাঁকবদলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দেখিয়েছে নতুন পথ। দীর্ঘ ১৭ বছরের এক ভয়াবহ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে যে তরুণ প্রজন্ম, তারা আজ দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন ইতিহাস রচনার সন্ধিক্ষণে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্র মেরামতের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। প্রশ্ন উঠেছে, জুলাই বিপ্লবের কারিগর এই তরুণ প্রজন্ম কেন গণভোটে ‘হ্যাঁ’তে রায় দেবে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে তাদের হারানো স্বপ্ন পুনরুদ্ধার এবং একটি বৈষম্যহীন আগামীর বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায়।

জুলাইয়ের সেই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় দুই সহস্রাধিক ছাত্র-জনতা শহিদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। এই বিশাল আত্মত্যাগ কোনো সাধারণ ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য ছিল না। রাজপথে ঝরে পড়া সেই রক্তের প্রতিটি ফোঁটা দাবি করেছে একটি আমূল পরিবর্তন। তরুণরা দেখেছে কীভাবে তাদের ভাই-বন্ধুরা বুক পেতে দিয়েছিল বুলেটের সামনে। সেই রক্তস্নাত অধ্যায় পার হয়ে আমরা যখন নির্বাচনের পথে হাঁটছি, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অর্থ হলো শহীদদের রক্তের প্রতি সম্মান জানানো। তারা জানে, যদি এবার সংস্কার সম্পন্ন না হয়, তবে এই মহৎ আত্মত্যাগ বিফলে যাবে। তাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করেই তারা ব্যালট পেপারে ‘হ্যাঁ’ সিল মেরে একটি টেকসই পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়াবে। ঘটাবে ব্যালট বিপ্লব দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী ওই চাঁদাবাজি রুখে দিতে।

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে এখনও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি তরুণদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, রাষ্ট্রের খোলনলচে পাল্টানো কতটা জরুরি। ছাত্র-জনতার যে ‘জুলাই সনদ’ ছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো অধরা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং আইন বিভাগে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও আমরা দেখছি পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর বাধা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ‘ভেটো’ বা অনীহার কারণে সংস্কারের গতি থমকে গিয়েছিল। তরুণরা এই অচলাবস্থা ভাঙতে চায়। তারা বিশ্বাস করে, রাজনৈতিক দলগুলোর সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো সংস্কার করতে হলে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়া অপরিহার্য। এই ‘হ্যাঁ’ ভোট হবে মূলত সংস্কারের পথে আসা সকল ফ্যাসিস্টমনা রাজনৈতিক বাধার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।

গত ১৭ বছরে সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে একটি ফ্যাসিবাদী রূপ দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে যেসব সংশোধনী এনেছিল, সেগুলো এখনও রাষ্ট্রের ঘা হয়ে টিকে আছে। জুলাই ঐকমত্য কমিশন সকল দলকে এক টেবিলে আনলেও অনেক ক্ষেত্রে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তরুণ প্রজন্ম এই ক্ষোভ পুষে রেখেছে। তারা জানে, সংবিধান থেকে যদি স্বৈরাচারী ধারাগুলো উপড়ে ফেলা না যায়, তবে ভবিষ্যতে আবারও কোনো নতুন ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার মাধ্যমে তারা মূলত সেই সংবিধানকে মুছে দিতে চায় যা একজন শাসককে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী করে তোলে। তারা চায় এমন এক সংবিধান, যেখানে জনগণের সার্বভৌমত্ব হবে প্রশ্নাতীত।

বিগত দেড় দশকে দেশ দুর্নীতির এক অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে। তরুণরা দেখেছে কীভাবে মেধা আর যোগ্যতার বদলে দলীয় আনুগত্যই ছিল চাকরির একমাত্র মাপকাঠি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হয়ে পড়েছিল শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার। তরুণ প্রজন্ম এবার একটি সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন এবং শক্তিশালী দুদক দেখতে চায়। তারা চায় এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর দফতরও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকবে না। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতেই তারা গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় দেবে।

গুম আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে সংস্কৃতি গত ১৭ বছরে গড়ে উঠেছিল, তা এদেশের মানুষের মনে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছে জনগণের বিরুদ্ধে। তরুণরা চায় পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীকে শাসকের কবল থেকে মুক্ত করে জনগণের সেবকে পরিণত করতে। আয়নাঘরের মতো বিভীষিকা যেন আর কোনোদিন ফিরে না আসে, সেজন্য তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামো পরিবর্তনের পক্ষে। তাদের ‘হ্যাঁ’ ভোট হবে জীবনের নিরাপত্তার গ্যারান্টি। তারা চায় এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে মাঝরাতে কারো দরজায় কড়া নাড়লে মানুষ ভয় পাবে না, বরং নিরাপদ বোধ করবে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, মেজর জিয়ার শাসনামলে গণভোটের মাধ্যমেই দেশ এক সমৃদ্ধির পথে যাত্রা শুরু করেছিল। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ইতিহাসের সেই ইতিবাচক দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিতে চায়। তারা মনে করে, যখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঐক্যমতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তখন জনগণের সরাসরি রায়ই শ্রেষ্ঠ সমাধান।

১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট তরুণদের কাছে এক নতুন পথের দিশারি। তারা বিশ্বাস করে, এই ভোটের মাধ্যমে দেশ হাঁটবে এক নতুন পথে, যেখানে গুম-খুন আর দুর্নীতির কোনো স্থান থাকবে না। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে তরুণরা সদা জাগ্রত। তারা চায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ, যেখানে একক কোনো দল বা ব্যক্তি স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারবে না। সংসদে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের যে স্বপ্ন তারা দেখছে, তার বাস্তবায়নের চাবিকাঠি হলো এই গণভোট। দেশের সীমানা থেকে শুরু করে জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়- সবখানেই তারা পাহারাদার হিসেবে থাকতে চায়।

জুলাই বিপ্লবের অন্যতম মুখ এবং প্রতীক ‘বিপ্লবী হাদি’দের মতো হাজারো তরুণের যে স্বপ্ন, তা শুধু রাজপথের স্লোগানে সীমাবদ্ধ নেই। সেই স্বপ্ন এখন তাদের হৃদয়ের নেশায় পরিণত হয়েছে। কোনো অপশক্তিই আর এই স্বপ্ন থামাতে পারবে না। বিপ্লবী হাদি যে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো এবারের ভোট। তরুণরা জানে, রাষ্ট্র সংস্কারের এই সুযোগ হাতছাড়া হলে জাতি হিসেবে আমরা আবারও অন্ধকারের গহ্বরে হারিয়ে যাব।

আব্দুল কাদের জীবন

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়