ভাষা, আচরণ ও পোশাকে শালীনতার সংকট

সুরাইয়া বিনতে হাসান

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি সমাজকে সভ্য করে তোলে তার মানুষের ভাষা, আচরণ ও পোশাক। এগুলোই মানুষের চিন্তা, মনন ও মূল্যবোধের প্রতিফলন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে ভাষা, আচরণ ও পোশাকে শালীনতার এক গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। আমরা হয়তো আধুনিক হচ্ছি, কিন্তু শালীনতার জায়গা থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছি।

এক সময় মানুষ কথা বলার আগে ভাবত এই কথাটা বলা ঠিক হবে কি না, কাউকে কষ্ট দেবে কি না। এখন সেই ভাবনার জায়গাটা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। রাগ, অভিমান কিংবা মজা করার নাম করে আমরা অনায়াসে কটু কথা বলে ফেলি। গালি, অপমানজনক শব্দ, নিচু মানসিকতার বাক্য এখন অনেকের কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মুখে এসব ভাষা অহরহ শোনা যায়। কেউ কাউকে সম্মান না করে কথা বললে সেটাকেই এখন ‘স্মার্টনেস’ ভাবা হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এখানে খুব বড় একটি কারণ। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা রিলসে ভাইরাল হওয়ার জন্য অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে অশালীন ভাষা ব্যবহার করছে। যত বেশি কটু কথা, যত বেশি বিতর্ক, তত বেশি লাইক ও ভিউ এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এতে করে অশালীন ভাষা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। ছোট শিশুরাও এসব দেখে শিখছে, অথচ আমরা সেটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছি না।

ভাষার পরেই আসে আচরণের কথা। একজন মানুষ কীভাবে অন্য মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করে, সেটাই তার প্রকৃত পরিচয়। কিন্তু আজকাল আমরা আচরণেও শালীনতা হারিয়ে ফেলছি। বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, নারীদের প্রতি ভদ্র আচরণ এসব যেন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বাসে, রাস্তায়, অফিসে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিনই আমরা অসৌজন্যমূলক আচরণের উদাহরণ দেখি। অনেকে খুব সামান্য বিষয় নিয়ে রেগে যায়, চিৎকার করে, অপমান করে, এমনকি মারামারিতেও জড়িয়ে পড়ে। সহনশীলতা যেন আজকাল মানুষের মধ্যে কমে গেছে। অন্যের মতামত সহ্য করার ক্ষমতা অনেকেই হারিয়ে ফেলেছে। কেউ ভিন্ন কথা বললেই তাকে আক্রমণ করা হচ্ছে ভাষায়, আচরণে, কখনও শারীরিকভাবেও। এটি একটি ভয়ঙ্কর সামাজিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। পরিবার থেকে যে শিক্ষা পাওয়ার কথা, সেটাও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে। বাবা-মা নিজেরাও ব্যস্ত, সন্তানের আচরণে নজর দেওয়ার সময় পাচ্ছেন না। আবার অনেক সময় বাবা-মার আচরণই সন্তানের জন্য ভুল উদাহরণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শিশুরা যা দেখে, সেটাই শিখে। পরিবারে যদি সম্মান, ধৈর্য আর ভদ্রতার চর্চা না থাকে, তাহলে সমাজে শালীন আচরণ আশা করা কঠিন।

এবার আসি পোশাকের কথায়। পোশাক মানুষের রুচি ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে। পোশাকের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকা উচিত, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে শালীনতার ভারসাম্যও জরুরি। দুঃখজনকভাবে, আজকাল অনেকেই পোশাককে আত্মপ্রকাশের নামে এমনভাবে ব্যবহার করছে যা সমাজের সাধারণ মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোশাক নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। কে কতোটা নজর কাড়তে পারবে, কে কতোটা আলাদা হবে এই চিন্তায় অনেকেই শালীনতার সীমা অতিক্রম করছে। পোশাক এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যা শুধু দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য, আত্মসম্মানের জন্য নয়। এতে করে সমাজে ভুল বার্তা যাচ্ছে, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে।

অনেকে বলেন, ‘পোশাক ব্যক্তিগত বিষয়।’ কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু আমরা যখন সমাজে বাস করি, তখন আমাদের পোশাক শুধু ব্যক্তিগত থাকে না, তা সামাজিক বার্তাও বহন করে। একটি পোশাক যদি অন্যকে অস্বস্তিতে ফেলে, ভুল ধারণা তৈরি করে কিংবা শুধু ভোগের বস্তু হিসেবে মানুষকে উপস্থাপন করে তাহলে সেখানে প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক। ভাষা, আচরণ ও পোশাকে শালীনতার এই সংকটের পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মূল্যবোধের দুর্বলতা। আমরা পড়াশোনা করছি, ডিগ্রি নিচ্ছি, প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধকে পেছনে ফেলে দিচ্ছি। স্কুল-কলেজে ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা যতটা দরকার, তা ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। আরেকটি বড় কারণ হলো ভুলভাবে আধুনিকতা বোঝা। অনেকেই মনে করে, শালীনতা মানে সেকেলে চিন্তা, আর অশালীনতাই আধুনিকতা। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। সত্যিকারের আধুনিক মানুষ সে-ই, যে সভ্য, ভদ্র ও মানবিক। উন্নত দেশগুলোতে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারা যতই আধুনিক হোক না কেন, ভাষা ও আচরণে তারা অনেক বেশি শালীন। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের সবার আগে নিজের দিকে তাকাতে হবে। আমরা নিজেরা কী ভাষায় কথা বলছি, কেমন আচরণ করছি, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করছি, সেটা নিয়ে সচেতন হতে হবে। পরিবর্তন অন্যের থেকে আশা করার আগে নিজেকে বদলানো জরুরি। পরিবারকে এখানে বড় ভূমিকা নিতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ভদ্র ভাষা, শালীন আচরণ ও পরিমিত পোশাকের গুরুত্ব শেখাতে হবে। শুধু শাসন নয়, নিজেরা উদাহরণ হয়ে উঠতে হবে। কারণ শিশু শোনার চেয়ে দেখা থেকে বেশি শেখে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক আচরণের ওপর জোর দিতে হবে। শুধু ভালো ফলাফল নয়, ভালো মানুষ হওয়াটাই হওয়া উচিত শিক্ষার মূল লক্ষ্য। মিডিয়াকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। ভাইরাল হওয়ার জন্য অশালীনতা প্রচার না করে শালীন ও ইতিবাচক বিষয় তুলে ধরা জরুরি। শালীনতা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি একটি শক্তি। শালীন ভাষা মানুষকে সম্মানিত করে, শালীন আচরণ মানুষকে বিশ্বাসযোগ্য করে, আর শালীন পোশাক মানুষকে মর্যাদাবান করে তোলে। আমরা যদি সত্যিই একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মানবিক সমাজ চাই, তাহলে ভাষা, আচরণ ও পোশাকে শালীনতার চর্চা আমাদের আবার ফিরিয়ে আনতেই হবে। পরিবর্তন কঠিন হলেও অসম্ভব নয় শুরুটা হোক আজ থেকেই, নিজের ভেতর থেকে।

সুরাইয়া বিনতে হাসান

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়