জলবায়ু পরিবর্তন ও অস্তিত্বের সংকট
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একবিংশ শতাব্দীতে মানবসভ্যতা যখন প্রযুক্তির চরম শিখরে আরোহন করছে, ঠিক তখনই প্রকৃতি তার রুদ্রমূর্তিতে আমাদের অস্তিত্বের মূলে আঘাত হানছে। জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর শুধু বৈজ্ঞানিকদের গবেষণাপত্র বা সেমিনারের তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক রূঢ় বাস্তবতা। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’-এর ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক মহাবিপদ সংকেত। অসময়ে বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, তীব্র দাবদাহ এবং অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতির এই ভারসাম্যহীনতা প্রমাণ করছে যে, মানুষ ও পরিবেশের মধ্যকার যে চিরাচরিত বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল, তাতে চরম ফাটল ধরেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধিকে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর কলকারখানা, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যানবাহনের কালো ধোঁয়া আকাশকে বিষাক্ত করে তুলছে। গত ১৫০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় প্রায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সামান্য তাপমাত্রার পরিবর্তন পুরো বিশ্বের জলবায়ু চক্রকে এলোমেলো করে দিয়েছে। হিমালয়ের বরফ গলে নদ-নদীর প্রবাহ যেমন অনিয়মিত হচ্ছে, তেমনি মহাসাগরগুলোর তাপমাত্রা বাড়ার ফলে সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে। প্রবাল প্রাচীর থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্রের মাছ- সবই আজ ধ্বংসের মুখে, যা প্রকারান্তরে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চরম আঘাত হানছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ প্রথম সারিতে রয়েছে। যদিও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য, তবুও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এর মাশুল দিতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় কৃষিজমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে, সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়ার লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ নদী ভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভিটেমাটি হারিয়ে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে ঢাকা শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। পূর্বাভাস বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি আর মাত্র এক মিটার বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যেতে পারে, যার ফলে প্রায় ৩ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। পরিবেশের এই চরম বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। বন উজাড় ও পাহাড় কাটার ফলে বন্যপ্রাণীরা তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারাচ্ছে। আমাদের গর্বের সুন্দরবন আজ হুমকির মুখে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বনের ভেতরে ঢুকে পড়ায় সুন্দরী ও গেওয়া গাছ মারা যাচ্ছে, যা বাঘ ও হরিণের মতো প্রাণীদের খাদ্যশৃঙ্খল নষ্ট করছে। শুধু বনেই নয়, আমাদের চারপাশের পরিচিত পাখপাখালি এবং দেশি মাছের জাতগুলোও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জলাশয় ভরাটের ফলে বাস্তুসংস্থানের যে ‘ফুড চেইন’ বা খাদ্যচক্র ছিল, তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। মৌমাছি বা প্রজাপতির মতো পরাগায়নকারী পতঙ্গ কমে যাওয়ায় ফসলের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবেশের আরেক অভিশাপের নাম ‘প্লাস্টিক দূষণ’। প্রতিদিন টন টন ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক ও পলিথিন আমাদের ড্রেন, খাল এবং নদীতে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। এগুলো মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করছে, ফলে অল্প বৃষ্টিতেই শহরে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। আরও ভয়ানক বিষয় হলো ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’, যা মাছের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে ক্যান্সারসহ নানাবিধ মরণব্যাধি ছড়াচ্ছে। সমুদ্রের বিশাল নীল জলরাশি আজ প্লাস্টিকের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে, যা সামুদ্রিক প্রাণীদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই প্লাস্টিক শুধু পরিবেশ নয়, বরং আমাদের জনস্বাস্থ্যকেও এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো গাছ। একটি গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না, বরং বায়ুমণ্ডল থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন শোষণ করে পৃথিবীর তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু নগরায়নের দোহাই দিয়ে আমরা নির্বিচারে গাছ কেটে কংক্রিটের জঙ্গল গড়ে তুলছি। একটি দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন থাকলেও আমাদের দেশে তা অর্ধেকেরও কম। বর্তমান পরিস্থিতিতে সামাজিক বনায়ন এবং বাড়ির ছাদে বাগান করার মতো উদ্যোগগুলো আরও জোরালো করতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল গড়ে তোলা জরুরি, যা প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে আমাদের রক্ষা করবে। ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিতে হবে। সৌর শক্তি, বায়ু শক্তি এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা সম্ভব।
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
