টার্গেট কিলিংয়ের ঝুঁকি ও বিপন্ন জননিরাপত্তা

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তার প্রশ্নে ‘টার্গেট কিলিং’ বা লক্ষ্যভেদী হত্যাকাণ্ড একটি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক কর্মী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, মুক্তমনা লেখক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক- কেউই যেন এই চোরাগোপ্তা হামলার হাত থেকে নিরাপদ বোধ করছেন না। একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এ ধরনের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড শুধু আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতার ওপর এক বড় ধরনের চপেটাঘাত।

টার্গেট কিলিং সাধারণ অপরাধের চেয়ে ভিন্নধর্মী। এখানে অপরাধীর মূল লক্ষ্য থাকে নির্দিষ্ট কোনো আদর্শ, গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার মাধ্যমে সমাজে একটি ভীতিকর বার্তা পৌঁছে দেওয়া। গত কয়েক দশকে আমরা দেখেছি, যখনই দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ক্রান্তিকাল উপস্থিত হয়, তখনই কোনো না কোনো অদৃশ্য শক্তি এই মরণঘাতী খেলায় মেতে ওঠে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও ঘনীভূত হয়েছে। অপরাধীরা এখন অনেক বেশি সুসংগঠিত এবং প্রযুক্তিবান্ধব। তারা নিভৃতে ছক কষছে এবং জনসমক্ষে আক্রমণ চালিয়ে মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এটি আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং মাঠ পর্যায়ের পুলিশের সক্ষমতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

টার্গেট কিলিং বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অতীতে সংঘটিত অনেক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাচ্ছে অথবা তদন্তের দুর্বলতায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। যখন অপরাধীরা দেখে যে একটি সুপরিকল্পিত খুন করেও পার পাওয়া সম্ভব, তখন তাদের আস্ফালন বেড়ে যায়। বিচারহীনতা শুধু অপরাধীকেই উৎসাহিত করে না, বরং সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার ওপর অনাস্থা তৈরি করে। আর এই অনাস্থা থেকেই সমাজে চরমপন্থা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।

একটি দেশে যখন টার্গেট কিলিং নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়, তখন সমাজে এক ধরনের ‘অঘোষিত আতঙ্ক’ বিরাজ করে। মুক্তচিন্তার মানুষ কথা বলতে ভয় পান, ভিন্নমতের মানুষ কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকরা দেশবিমুখ হন। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি জাতির মেধাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে পঙ্গু করে দেয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা দানা বাঁধে, যা প্রকারান্তরে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো টেকসই উন্নয়নই অর্থবহ হয় না।

এটা সত্য যে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ করছে। কিন্তু টার্গেট কিলিং ঠেকাতে শুধু প্রথাগত টহল বা তদন্ত যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব, উন্নত সাইবার নজরদারি এবং তৃণমূল পর্যায়ে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা। প্রায়শই দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, কিন্তু সেই কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না অথবা জনসমক্ষে আনা হয় না। পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। অপরাধী যে দলের বা যে মতাদর্শেরই হোক না কেন, তার পরিচয় শুধুই ‘খুনি’। এই কঠোর বার্তাটি প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসা জরুরি।

টার্গেট কিলিংয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না, প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। রাজনৈতিক দলগুলোকে খুনি ও অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। অপরাধকে রাজনৈতিক রং দেওয়া বন্ধ না করলে এর রাশ টানা সম্ভব নয়। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে টার্গেট কিলিংয়ের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে যাতে জনমনে আস্থার প্রতিফলন ঘটে। অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। অধিকাংশ টার্গেট কিলিংয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। পাড়া-মহল্লায় বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অপরিচিত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির আনাগোনা সম্পর্কে স্থানীয়দের সজাগ থাকতে হবে।

একটি সভ্য সমাজে গুপ্তহত্যার কোনো স্থান থাকতে পারে না। টার্গেট কিলিং শুধু প্রাণের বিনাশ নয়, বরং এটি মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া তার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। আমরা চাই না দেশ আবার কোনো অন্ধকার সময়ের দিকে ধাবিত হোক। এখন সময় এসেছে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতি গ্রহণ করে খুনি ও তাদের নেপথ্যের মদদদাতাদের খুঁজে বের করার। নতুবা এই টার্গেট কিলিংয়ের আগুন একদিন পুরো সমাজব্যবস্থাকেই গ্রাস করে ফেলবে।