ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ জনপদজুড়ে গণতন্ত্রের নবজাগরণ

ওসমান গনি

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলার আকাশে শীতের মিষ্টি রোদের সঙ্গে এবার মিশে আছে এক অন্যরকম উত্তাপ। তবে এ উত্তাপ কোনো সংঘাতের নয়, এ উত্তাপ উৎসবের। ২০২৬ সালের এই ফেব্রুয়ারি মাসে এসে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র আজ যে প্রাণের স্পন্দন দেখা যাচ্ছে, তা কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনালগ্ন। বিগত কয়েক দশকের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সাধারণ মানুষ আজ আবারও ভোট দেওয়ার স্বতঃস্ফূর্ত অধিকার ফিরে পেয়েছে। মেঠোপথ থেকে শুরু করে পিচঢালা রাজপথ, চায়ের দোকান থেকে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ড্রয়িংরুম, সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু একটিই, ভোট। এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় এক বিশেষ মাইলফলক হয়ে থাকবে, কারণ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জনমানুষের মধ্যে সেই হারানো ‘ভোটের উৎসব’ ফিরে এসেছে। ১২ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে সারা দেশের প্রতিটি প্রান্ত এখন যেন এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

গ্রামাঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায় এক অপূর্ব দৃশ্য। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে যখন কৃষাণ-কৃষানিরা ঘর থেকে বের হচ্ছেন, তাদের কথোপকথনে ফসলের খবরের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে প্রার্থীর গুণাগুণ। গ্রামের হাটগুলো এখন পরিণত হয়েছে অঘোষিত নির্বাচনি কার্যালয়ে।

ডালিম তলা কিংবা বটতলার পুরোনো বেঞ্চগুলোতে বসে বয়োজ্যেষ্ঠরা হিসেব মেলাচ্ছেন আগামীর দিনবদলের। গ্রামীণ জনপদে প্রার্থীরা যখন পায়ে হেঁটে জনসংযোগ করছেন, তখন তাদের পেছনে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আনন্দধ্বনি মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ভোট মানে শুধু ব্যালট পেপার নয়, ভোট মানে সাধারণ মানুষের মিলনমেলা। মহিলারা ঘরের কাজ সেরে উঠোনে বসে আলোচনা করছেন কার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবসম্মত। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনে তৃণমূল পর্যায়ে প্রার্থীদের জবাবদিহিতার বিষয়টি বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামের মানুষ এখন আর শুধু প্রতীকে নয়, বরং প্রার্থীর সততা আর জনসেবার মানসিকতাকে বড় করে দেখছে। এই যে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, এটিই প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এ উৎসবের ছোঁয়া লেগেছে। ছাপাখানাগুলোতে দিনরাত কাজ চলছে পোস্টার আর লিফলেট তৈরির, মাইকের শব্দে মুখরিত হচ্ছে জনপদ। নির্বাচনি প্রচারণার এই রঙিন আবহে গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো যেন আবারও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

শহরের চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন হলেও উদ্দীপনায় কোনো কমতি নেই। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে যেখানে প্রতিবেশী প্রতিবেশীর খবর রাখার সময় পায় না, সেখানেও এখন নির্বাচনের হাওয়া লেগেছে। সুউচ্চ দালানের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে ঘিঞ্জি বস্তি- সবখানেই এখন ভোটের আড্ডা। তবে শহরের ভোটযুদ্ধ এবার রাজপথের চেয়েও বেশি সরব হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। ফেসবুক, টিকটক আর ইউটিউবে প্রার্থীদের ছোট ছোট ভিডিও, নীতিমালার ব্যাখ্যা আর সৃজনশীল প্রচারণার ছড়াছড়ি। শহরের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এবার অন্যরকম এক সচেতনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তারা শুধু আবেগ নয়, বরং তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বিশ্লেষণ করছে প্রার্থীদের অতীত ও বর্তমান। তরুণ ভোটারদের এই সক্রিয়তা এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই বাংলাদেশে জেনারেশন জেড বা ‘জেন-জি’ ভোটাররা নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। শহরের মোড়ে মোড়ে চায়ের টং দোকানে গভীর রাত অবধি চলছে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, যানজট নিরসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন—এসব বিষয় এখন সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি। শহর আর গ্রামের এই যে মেলবন্ধন, যেখানে সবার লক্ষ্য একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়া, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

২০২৬ সালের এই নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতের প্রক্রিয়া ভোটারদের মধ্যে এক বড় ধরনের আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।

নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা মানুষের মনে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সাহস জোগাচ্ছে। সীমানা পুনর্নির্ধারণে ডিজিটাল ম্যাপের ব্যবহার এবং নির্বাচনি রোডম্যাপের স্পষ্টতা জনমনে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘ বিরতির পর এমন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের সাক্ষী হতে পেরে সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক স্পষ্ট। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি এবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ইতিবাচক পরিবর্তন। মিছিলগুলোতে কোনো ভীতি নেই, বরং আছে স্লোগান আর দেশাত্মবোধক গানের সুর। প্রার্থীরা যখন একে অপরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি না করে নিজের কর্মপরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরছেন, তখন সাধারণ মানুষও বিচারবুদ্ধি দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই সংস্কৃতি যদি বজায় থাকে, তবে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে একটি পরিপক্ব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। এবারের নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ এবং বিপুল সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে অংশগ্রহণের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত হয়েছে।

তবে এই উৎসবের অন্তরালে কিছু গভীর চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব আর দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো ভোটারদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

সাধারণ মানুষ এখন কেবল মুখের কথায় বিশ্বাস করতে নারাজ; তারা চায় কাজের প্রমাণ। তাই প্রার্থীদের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা এবার আকাশচুম্বী। প্রান্তিক কৃষকের সার ও বীজের সমস্যা থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের আবাসন সংকট, সবই উঠে আসছে নির্বাচনী ইশতেহারে। মানুষের এই যে দাবিদাওয়া আর প্রত্যাশা, তা পূরণ করা হবে আগামীর নির্বাচিত সরকারের প্রধান কাজ। নির্বাচনের ঠিক আগে আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং ‘ডিপফেক’ ভিডিওর মতো প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটারদের সচেতনতা এবং নির্বাচন কমিশনের কঠোর তদারকিই পারে এই ডিজিটাল ঝুঁকি মোকাবেলা করতে। ভোটের উৎসবে যখন পুরো দেশ মেতে আছে, তখন জনগণের মনের সুপ্ত বাসনা হলো এমন এক নেতৃত্ব, যারা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বরং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে প্রকৃত ভূমিকা রাখবে। এই নির্বাচন শুধু পাঁচ বছরের জন্য একজন প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নয়, এটি হলো আগামীর সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাহেন্দ্রক্ষণ।

গণতন্ত্রের এই উৎসবে সব শ্রেণির মানুষের সমান অংশগ্রহণ আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতিফলন ঘটায়। আমরা দেখেছি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ থেকে শুরু করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী পর্যন্ত সবাই এই ভোটাধিকার প্রয়োগে উন্মুখ। দেশের ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি প্রবাসী ভাই-বোনেরাও এবার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন, যা আমাদের নির্বাচনী কাঠামোয় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তারা সুদূর পরবাস থেকে দেশের এই পরিবর্তনের হাওয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ব্যালটের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে শরিক হতে চাইছেন। দেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি আজ রাজনীতির রসে জারিত। এই প্রাণচাঞ্চল্যই প্রমাণ করে যে, এদেশের মানুষ গণতন্ত্রপ্রিয়। কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি যে জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ততাকে দাবিয়ে রাখতে পারে না, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনের আমেজই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। উৎসবের এই দিনগুলোতে মানুষ তার পুরনো বিভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা সামাজিক সংহতির এক অনন্য উদাহরণ।

উপসংহারে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় এক স্বর্ণালী অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে। এই নির্বাচন আমাদের রাষ্ট্র মেরামতের এক বড় সুযোগ। গ্রাম আর শহরের এই অভূতপূর্ব মিলনমেলা বলে দিচ্ছে যে, এদেশের মানুষ শান্তি চায়, প্রগতি চায় এবং নিজের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকার চায়। ২০২৪-এর বিপ্লবের পর এটিই প্রথম বড় পরীক্ষা যেখানে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। ভোটের এই উৎসব যেন কেবল নির্বাচনের দিনেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং নির্বাচনের পরেও বিজয়ী এবং বিজিতদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে, এটাই সাধারণ মানুষের কামনা। এই উৎসবের মাধ্যমে যে নতুন সূর্যের উদয় হতে যাচ্ছে, তা যেন প্রতিটি নাগরিকের জীবনে নিয়ে আসে অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক মর্যাদা।

মেঠোপথ আর শহরের পিচঢালা পথ পেরিয়ে ভোটের এই জয়গান ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বের প্রতিটি কোণে। আমরা বিশ্বাস করি, এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে এবং একটি স্বাধীন, স্বাবলম্বী ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথে বিশ্বকে পথ দেখাবে। জয় হোক জনগণের, জয় হোক গণতন্ত্রের, জয় হোক বাংলাদেশের।

ওসমান গনি

লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট