অপরিকল্পিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও জনদুর্ভোগ
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি আধুনিক নগরজীবনে সুষ্ঠু যাতায়াত ব্যবস্থা ও উন্নত নাগরিকসেবা অপরিহার্য। কিন্তু আমাদের দেশের নগরগুলোর চিত্র বর্তমানে এর ঠিক উল্টো। উন্নয়নমূলক কাজের দোহাই দিয়ে বছরের অধিকাংশ সময় রাস্তাঘাট যেভাবে খুঁড়ে রাখা হয়, তাতে জনদুর্ভোগ চরম সীমায় পৌঁছেছে। বর্ষা মৌসুম আসুক বা না আসুক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বা টেলিফোন লাইনের সংযোগের নামে শহরের রাস্তাগুলো এখন যেন এক একটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মূলে রয়েছে বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থার মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা এবং প্রশাসনের তদারকির অভাব।
রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির প্রধান সমস্যাটি হলো সেবামূলক সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের কোনো সমন্বয় নেই। দেখা যায়, সিটি কর্পোরেশন একটি রাস্তা চমৎকারভাবে কার্পেটিং করার কয়েকদিন পরেই ওয়াসা বা তিতাস গ্যাস সেই রাস্তা আবার খুঁড়ে ফেলছে। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের বিপুল অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় কষ্ট। একটি রাস্তা বারবার খোঁড়ার ফলে এর স্থায়িত্ব নষ্ট হচ্ছে এবং বৃষ্টির সময় কাদা ও ধুলোবালিতে পথচারীদের নাভিশ্বাস উঠছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি মহানগরে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সমন্বয় কমিটি থাকা প্রয়োজন।
সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, তিতাস, পিডিবি এবং টেলিকম সংস্থাগুলো বছরের কোন সময়ে কী কাজ করবে, তার একটি বার্ষিক ক্যালেন্ডার বা মহাপরিকল্পনা থাকতে হবে। এক সংস্থার কাজ শেষ হওয়ার আগে অন্য সংস্থা কাজ শুরু করবে না এবং একবার কার্পেটিং করার পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রাস্তা খোঁড়া নিষিদ্ধ করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ঠিকাদাররা কাজ শুরু করে তা মাসের পর মাস ফেলে রাখে। কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। রাস্তা খোঁড়া চলাকালীন বিকল্প যাতায়াতের সুব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়া খোঁড়া স্থানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী, রাতে চলাচলের জন্য লাল বাতি এবং সতর্কতা সংকেত রাখা আবশ্যক, যাতে দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। এখন বিশ্বে অনেক দেশে ‘ট্রেনচলেস’ বা রাস্তা না খুঁড়েই ভূগর্ভস্থ লাইন সংস্কারের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের দেশেও বড় প্রকল্পগুলোতে এই ধরনের আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে যাতে রাস্তার উপরিভাগ অক্ষত থাকে। বর্ষা মৌসুমে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি মানেই সাধারণ মানুষের জন্য অভিশাপ। প্রশাসনের উচিত এটি নিশ্চিত করা যে, বর্ষা শুরুর অন্তত এক মাস আগে যেন সব ধরনের খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শেষ হয়।
জনদুর্ভোগ কমাতে সরকারের নীতিমালায় কোনো ঘাটতি নেই, ঘাটতি শুধু বাস্তবায়নে ও কঠোর তদারকিতে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে যে, উন্নয়ন শুধু বড় বড় দালান বা পিচঢালা রাস্তায় নয়; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সার্থক হয় যখন তা নাগরিকের স্বস্তি নিশ্চিত করে। দায়সারাভাবে কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাস্তার মান নিয়ন্ত্রণে এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিতে প্রকৌশলীদের নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন জরুরি।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অবশ্যই চলবে, কিন্তু তা জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে না। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে প্রশাসনের এই দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতা আর মেনে নেওয়া যায় না। নাগরিকরা ট্যাক্স দেয় একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নগরীতে বসবাসের আশায়, দুর্ভোগ পোহানোর জন্য নয়। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জেগে উঠবে এবং একটি সমন্বিত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থার মাধ্যমে নগরবাসীকে এই অসহনীয় দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দেবে। উন্নয়নের সুফল যেন সাধারণ মানুষের কাছে অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হিসেবে ধরা দেয়।
