বাংলাদেশে কৃষকের আত্মহত্যার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা

মুহিবুল হাসান রাফি

প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এই কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত থাকলেও, দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য যে দেশের অর্থনীতির এই মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ কৃষকদের পেশাগত সুরক্ষা দেওয়ার কোনো আইনি কাঠামো এখনও অব্দি তৈরি হয়নি। জমি চাষের উপযোগী করা থেকে শুরু হয় অক্লান্ত পরিশ্রম। এছাড়া বীজ বপন থেকে শুরু করে বাজারে ফসল বিক্রি করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কৃষককে পার করতে হয় হয়রানির শিকারের একেকটা ধাপ। এর ফলস্বরূপ, ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা কিংবা ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে এবং মানসিক হতাশা থেকে অনেক কৃষকপথ বেছে নিচ্ছেন, আত্মহত্যার। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা অধিক হারে বৃদ্ধি বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থার ভঙ্গুর দশাকেই তুলে ধরছে।

সংবাদপত্র খুললেই প্রায়শই দেখা মিলে ‘ঋণের দায়ে কৃষকের আত্মহত্যা’র মতো হৃদয়বিদারক শিরোনাম। যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের কৃষিব্যবস্থার গভীর সংকটেরই পরিণতি। সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ থেকে শুরু করে ফসল উত্তোলন, সংগ্রহ এবং বাজারে বিক্রি- সব ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নজরদারি ও অবকাঠামোর অভাবে মধ্যস্বত্বভোগীরা অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এর ফলে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোতে ঋণ ব্যবস্থার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে কৃষকরা বাধ্য হয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক চড়া সুদের ঋণের দ্বারস্থ হতে। এভাবে ঋণের জালে জড়িয়ে অনেকে সহায়-সম্বল হারিয়ে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন, আর অনেকেই চূড়ান্ত হতাশায়, এই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

বাংলাদেশে কৃষিজমির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জমি তুলনামূলক হারে হ্রাস পেয়েছে ১% (যা বিগত দশকে সর্বোচ্চ)। মোট আবাদযোগ্য জমি ৩,৬২,২৯,০০০ একর (৮৮.২৯ লক্ষ হেক্টর)। মোট সেচকৃত জমি ৭৯.৪৪ হেক্টর ও আবাদযোগ্য পতিত জমি ৪.৫২ হেক্টর। এছাড়া মাথাপিছু আবাদি জমি ০. ২৬ একর/ ০.১০ হেক্টর। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণসহ নানা কারণে প্রতিবছর প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন কমছে প্রায় ২১৯ হেক্টর আবাদি জমি। প্রতিবছর প্রায় ১% হারে কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে।

কৃষকদের এই দূরাবস্থা দূর করতে এবং আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধে অবিলম্বে একটি কৃষি কমিশন গঠন করা এবং খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। একটি কৃষি কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হলে তা কৃষকের সার্বিক কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি ও নীতিগত কাঠামো তৈরি করতে পারবে। এই কমিশন কৃষি উৎপাদন, সরবরাহ শৃঙ্খলা, মূল্য নির্ধারণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও পদক্ষেপ গ্রহণে মূল ভূমিকা পালন করবে।

একইসঙ্গে, খাদ্য অধিকার আইন কার্যকর করা হলে তা শুধু দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বরং কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির আইনি ভিত্তি তৈরি করবে, যা তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনধারণের অধিকার নিশ্চিত করবে। এই দুটি আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলেই কৃষকদের পেশাগত সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে এবং ঋণের বোঝা ও হতাশার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে তারা আত্মহত্যার পথ পরিহার করতে পারবে।

মুহিবুল হাসান রাফি

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ