বাবার অবর্তমানে মা-ই নীরব যোদ্ধা

সাজেদা আক্তার (সাজু)

প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে নারী সহিংসতার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে বাবার অবর্তমানে মায়ের যখন একাই সামলিয়ে নিতে হয় সবকিছু। সমাজ অনেকাংশে তাদের অলক্ষ্মী বলে আখ্যায়িত করে। তাদের করুণার চোখের চাইতে সন্দেহের চোখে বেশি দেখে। তাদের মধ্যে শুধু স্বামীহারা, কেউ পরিত্যক্ত আর কেউ বা পরিস্থিতির শিকার। তাদের প্রতিদিনকার নীরব যুদ্ধ পরাজয়কে গ্রাস করে নতুন ভোরের আলোয় প্রস্ফুটিত হয়।

আমি জন্মের পর বটবৃক্ষ তথা বাবার ছায়া পাইনি। মাকে দেখেই বড় হয়েছি। মাকেই বাবা, মাকেই মা বলে চিনেছি, সেই জীবনের শুরু থেকে। মা একা হাতে আমাকে মানুষ করেছেন শতা বাঁধা বিপত্তি ডিঙিয়ে। তিনি শুধু দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার খুব কাছের বন্ধু, নিরাপত্তা, আশ্রয় ও ভবিষ্যতের ভরসা। নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে কীভাবে সন্তানের স্বপ্ন পূরণে ছুটেছেন, তা মায়ের কাছেই শেখা।

মানুষ যখন আমায় হেয়, তামাশায় তুচ্ছতাচ্ছিল্যে ভাসাচ্ছিল, পরিচয় নিয়ে আঙুল তুলছিল, তখন মা বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন আমায় বটবৃক্ষের মতো। সমাজের কটূকথা, অবহেলা আর উপহাস যখন আমাকে অস্থির করে তুলছিল, তখন আমার মা নীরবে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আমাকে শক্ত হতে শিখিয়েছেন, কঠিন সময়ে ধৈর্য ধরতে বলেছেন, অথচ নিজে ভেঙে পড়লেও তা কখনও আমার সামনে প্রকাশ করেননি। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মা উপার্জন করেছেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। দিনের পর দিন ক্লান্ত শরীর নিয়েও কাজ করে গেছেন, যাতে আমার মুখে খাবার ওঠে, পড়াশোনায় কোনো ঘাটতি না থাকে। নিজের প্রয়োজন, নিজের অসুস্থতা, নিজের বিশ্রাম, নিজের স্বপ্ন সবকিছুই তিনি ত্যাগ করেছেন আমার জন্য। অনেক রাতেই দেখেছি, সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে তিনি চুপচাপ বসে থাকতেন। কখনও চোখের কোণে জল জমে থাকত, কখনও গভীর নিঃশ্বাস। কিন্তু আমাকে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে সেই মুখ বদলে নিয়ে উপস্থাপন করতেন হাসি, সাহস আর আশ্বাসে ভরা একটি মুখ। হয়তো নিজের ভেতরের ভয়, অনিশ্চয়তা আর একাকিত্ব তিনি লুকিয়ে রাখতেন সন্তানের শক্ত হয়ে ওঠার প্রয়োজনে।

আমি বড় হয়েছি কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেই সংগ্রামের ভার মা কখনও আমার কাঁধে চাপাননি। অভাবকে আড়াল করেছেন ভালোবাসা দিয়ে মুড়িয়ে, ক্লান্তিকে ঢেকে রেখেছেন হাসির পূর্ণতা দিয়ে। আজ বুঝি কতটা অসীম শক্তি থাকলে একজন মানুষ এমনটা করতে পারেন। আমাকে ভালো স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করানোর জন্য মা প্রতিদিন চার ঘণ্টারও বেশি অতিরিক্ত কাজ করেছেন।

সমাজ যেখানে আমার মাকে অবহেলিত দুর্বল ভাবতে অভ্যস্ত, সেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন একজন মা মানে একটি পরিবার, একটি বটবৃক্ষ, সন্তানের ভবিষ্যতের কারিগর। জীবনে এই চলার পথের সংগ্রামটা শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই। সমাজের নানা স্তরে তাকে প্রতিনিয়ত সন্দেহ, অবজ্ঞা ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়। আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে প্রতিবেশী অনেকে না বুঝেই কটুকথা ছুড়ে দেন। অথচ সেই কথাগুলো একজন মায়ের মনে কত গভীর ক্ষত তৈরি করে, তা খুব কম মানুষই ভাবতে চায়, বুঝতে চায়।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো এই আঘাতগুলোর বড় একটি অংশ আসে নিজের কাছের মানুষদের কাছ থেকেই। সাহায্যের বদলে প্রশ্ন, সহমর্মিতার বদলে বিচার, সমর্থনের বদলে অবিশ্বাস এসব নিয়েই নীরব যোদ্ধার এগোতে হয়। তবুও তিনি থেমে যাননি। কারণ তার সামনে থাকে সন্তানের মুখ, সন্তানের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ। আমার মায়ের মতো অনেকে সমাজ ও পরিবারের ভেতর প্রতিনিয়ত লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার শিকার হন। তবুও তিনি হার না মেনে লড়াই করে যান। তার সংগ্রামের শক্তির জোগান আসে ভালোবাসা থেকে, দায়িত্ববোধ থেকে এবং অদম্য সাহস থেকে। পৃথিবীর সব অবহেলিত ও নীরব যোদ্ধা মায়ের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা। আমাদের উচিত তাদের প্রতি আরও সংবেদনশীল হওয়া। তাদের জীবন সংগ্রামকে করুণার চোখে নয়, সম্মানের চোখে দেখা। তারা সন্তানই নয়, পাশাপাশি নীরবে সমাজকেও শক্তিশালী করে তুলছেন।

সাজেদা আক্তার (সাজু)

শিক্ষার্থী, ফেনী সরকারি কলেজ