আদিবাসী নাগরিক পরিচয় ও বাংলাদেশি জাতিসত্তা
এম মহাসিন মিয়া
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। সময়ের পরিক্রমায় এই বিতর্ক কখনও তীব্র হয়েছে, কখনও নীরব থেকেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পারমিতা চাকমার ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এই বিতর্ক নতুন করে রাষ্ট্রীয় পরিচয়, নাগরিক অধিকার এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিছক কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়। বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, সংবিধানিক কাঠামো এবং নাগরিকত্বের দর্শন নিয়ে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান। তার বক্তব্যের সারমর্ম অত্যন্ত পরিষ্কার- ‘আমরা সবাই বাংলাদেশি। পাহাড় ও সমতল- সবখানে সবার নাগরিক অধিকার সমান। এই পরিচয়ের বাইরে আর কোনো আলাদা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রয়োজন নেই।’ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন- বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তি কী হবে? গোষ্ঠী, নৃগোষ্ঠী কিংবা ভৌগোলিক অবস্থান, নাকি একটি অভিন্ন বাংলাদেশি জাতিসত্তা?
সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তি : বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, যেখানে পাহাড়-সমতল, সকল জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সব মানুষ অংশ নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সেই ঐক্যই রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি। এই দর্শনের সাংবিধানিক প্রতিফলন পাওয়া যায় সংবিধানের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ ‘বাংলাদেশি’ বলিয়া পরিচিত হইবেন।’
এই একটি বাক্যের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এখানে কোনো আলাদা জাতিগত বা নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। তারেক রহমানের বক্তব্য মূলত এই সংবিধানিক বাস্তবতার রাজনৈতিক প্রতিফলন। তিনি যে ‘আমরা সবাই বাংলাদেশি’ কথাটি বলেছেন, তা কোনো আবেগী স্লোগান নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দর্শন।
‘আদিবাসী’ শব্দ- ইতিহাস, বাস্তবতা ও বিতর্ক : ‘আদিবাসী’ শব্দটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মূলত ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের ফলে যেসব জনগোষ্ঠী নিজ ভূমিতে বঞ্চিত ও প্রান্তিক হয়ে পড়েছিল, তাদের বোঝাতে এই শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতা এই উপনিবেশিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুরোপুরি সাযুজ্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশে কেউ উপনিবেশ স্থাপনকারী ছিল না, আবার কেউ উপনিবেশের ফলে উচ্ছেদ হয়ে আগতও নয়। এ ভূখণ্ডে বসবাসরত সব জনগোষ্ঠীই ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এখানে বসতি স্থাপন করেছে এবং দীর্ঘকাল ধরে এই দেশের অংশ হয়ে আছে। এ কারণেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দলিল, আদালতের ব্যাখ্যা এবং সংবিধানিক চর্চায় ‘আদিবাসী’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি।
তারেক রহমান এই ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতাকেই সামনে এনেছেন। তিনি কোনো জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ভাষা বা ঐতিহ্য অস্বীকার করেননি; বরং রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নে বিভাজনমূলক শব্দ ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকির দিকটি তুলে ধরেছেন। পাহাড় ও সমতল- পরিচয়ের নয়, অধিকার বাস্তবায়নের প্রশ্ন : পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অঞ্চল। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, পরিচয়ের প্রশ্ন সামনে এনে অনেক সময় মূল সমস্যাগুলো আড়াল করা হয়। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষের প্রধান সমস্যাগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত। এসব সমস্যার সমাধান কোনো পরিচয় পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকর রাষ্ট্রীয় নীতি, সুশাসন ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
তারেক রহমানের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি পরিচয় রাজনীতির বদলে ‘সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।’ পাহাড়ে বা সমতলে বসবাসের কারণে নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় কোনো বৈষম্য থাকা উচিত নয়- এই বার্তাই তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
পরিচয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি : বিশ্ব রাজনীতির অভিজ্ঞতা বলে দেয়, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি বহু দেশে সামাজিক বিভাজন, সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। জাতিগত বা নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানালে রাষ্ট্র দুর্বল হয় এবং জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের মতো একটি বহুবৈচিত্র্যময় সমাজে এই ঝুঁকি আরও বেশি। এখানে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য একটি শক্তি; কিন্তু সেই বৈচিত্র্য যদি রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের জায়গায় বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। তারেক রহমানের বক্তব্য এই প্রেক্ষাপটে একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা : একজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; তা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার দিকনির্দেশনা দেয়। তারেক রহমানের অবস্থান থেকে বোঝা যায়, তিনি বাংলাদেশকে একটি ‘সমানাধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখতে চান, যেখানে পাহাড় ও সমতল, জাতি ও নৃগোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ পাবে। এটি এমন এক রাষ্ট্রচিন্তা, যেখানে সাংস্কৃতিক পরিচয় থাকবে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিচয় হবে অভিন্ন- বাংলাদেশি।
গঠনমূলক পথ ও করণীয় : এই বিতর্ক থেকে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যেতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি- সব জাতিগোষ্ঠীর বাস্তব সমস্যার কার্যকর ও টেকসই সমাধান, শিক্ষা ও উন্নয়নে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, গণমাধ্যম ও শিক্ষাঙ্গনে বিভাজনমূলক শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল ভূমিকা। তারেক রহমানের বক্তব্য এই গঠনমূলক পথের দিকেই ইঙ্গিত করে। সবশেষে বলা যায়- ‘আদিবাসী’ প্রশ্নটি আবেগপ্রবণ হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগ দিয়ে নয়- সংবিধান, যুক্তি ও বাস্তবতা দিয়ে হয়। তারেক রহমান যে বার্তাটি দিয়েছেন- ‘আমরা সবাই বাংলাদেশি’ এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দর্শনের মূল কথা। পাহাড় হোক বা সমতল, চাকমা হোক বা বাঙালি- সবার অধিকার, মর্যাদা ও দায়িত্ব সমান। এই সমতার মধ্যেই বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ নিহিত। এই বার্তা সময়োপযোগী, প্রাসঙ্গিক এবং একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।
এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা
