পোশাকশিল্পে শিশুশ্রমের ছায়া

আরশী আক্তার সানী

প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে। স্বাধীনতার পর কয়েক দশকে যে শিল্পখাত সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে, কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা বদলে দিয়েছে, তা হলো তৈরি পোশাক শিল্প। গ্রামীণ নারীশক্তির কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সব দিকেই এ শিল্পের অবদান অসাধারণ। কিন্তু এই বিশাল সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক অন্ধকার, যা বহু বছর ধরে নীরবে বেড়ে উঠেছে, আর সেটি হলো শিশু শ্রমের ছায়া। উন্নয়নের আলো যতই উজ্জ্বল হোক, এর ভেতরকার এই অন্ধকার আমাদের ব্যথিত করে, প্রশ্ন জাগায় আমরা কি সত্যিই উন্নত হওয়ার পথে এগোচ্ছি, নাকি কিছু শিশুদের শৈশবকে বলি দিয়ে স্বস্তি খুঁজছি?

শিশু শ্রমের বিষয়টি বাংলাদেশের নতুন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই দরিদ্রতার বোঝা বহন করা পরিবারগুলো সন্তানের ছোট বয়স থেকেই আয়ের উৎস খুঁজতে বাধ্য হয়। মজুরির আকর্ষণ, পরিবারের প্রয়োজন, শিক্ষার অপ্রাপ্তি সব মিলিয়ে শিশুদের শ্রমবাজারে ঠেলে দেয়। কিন্তু পোশাক শিল্পে শিশু শ্রমের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব রাখে, কারণ এটি একদিকে অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তির প্রধান বাহক। বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড, মানবাধিকার সংস্থা, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা সবার নজর এই শিল্পের প্রতিটি স্তরে। ফলে এখানে শিশু শ্রম শুধু মানবিক সমস্যা নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে একটি বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।

কারখানাগুলোর বাস্তব চিত্র সবসময় একই রকম নয়। উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থা, শ্রমবিধি মেনে চলা, সুশৃঙ্খল পরিবেশ অনেক কারখানায় এগুলো এখন গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু তারপরও এমন অনেক ছোট ও অনিবন্ধিত কারখানা রয়েছে যেখানে নিয়মের তোয়াক্কা নেই; তারা কম খরচে দ্রুত উৎপাদনের লক্ষ্যেই শিশুদের কাজে লাগায়। কারণ শিশুদের মজুরি কম, তারা সহজে প্রতিবাদ করে না, আর কোনো দাবি রাখতে না পারায় তাদের দিয়ে ইচ্ছেমতো সময় ধরে কাজ করানো যায়। এভাবে শিশু শ্রম এক ধরনের অঘোষিত ব্যবসায়িক কৌশল হয়ে দাঁড়ায় যা প্রকৃতপক্ষে নির্মম শোষণ ছাড়া কিছুই নয়।

শিশুদের জীবনে এর প্রভাব গভীর। নরম বয়সে কারখানার শব্দ, ধুলাবালু, তাপ, ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতি এসবের মধ্যে কাজ করলে তাদের শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হয়। অনিয়মিত খাবার, দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকা, ভারী মাল ওঠানো, রাতভর অতিরিক্ত কাজ করা এসবের ফলে রক্তশূন্যতা, ফুসফুসের সমস্যা, দৃষ্টি ক্ষীণ হওয়া, পেশী দুর্বলতা ইত্যাদি সমস্যা নিয়মিত দেখা যায়। শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, মানসিকভাবে শিশুরা চাপে থাকে তাদের শৈশব, খেলা, বিদ্যালয়, বন্ধু সবকিছু ধীরে ধীরে মুছে যায়। তারা বড় হতে থাকে বঞ্চনার ভিতর দিয়ে, হারিয়ে যায় কল্পনা, সৃজনশীলতা বা নিরাপদ বেড়ে ওঠার স্বপ্ন।

একজন শিশু যখন সকালবেলায় বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার বদলে সেলাই মেশিনের শব্দে দিন শুরু করে, তখন বুঝতে হবে যে আমরা সমাজ হিসেবে একটি বড় ব্যর্থতার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় ভবন, রপ্তানির সংখ্যা, বা জিডিপি বৃদ্ধির হার নয়; উন্নয়ন মানে প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা কি তা করতে পেরেছি?

পোশাক শিল্পে শিশু শ্রমের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দরিদ্রতা হলো প্রধান সমস্যা। অনেক পরিবার দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল; তাদের কাছে সন্তানের শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখার মতো সামর্থ্য নেই। বরং দ্রুত আয় করার প্রয়োজনীয়তা তাদের বাধ্য করে শিশুকে কাজে পাঠাতে। অন্যদিকে, কিছু কারখানা মালিকও এ চাহিদার সুযোগ নেয়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের চাপ এলে বা পরিদর্শন হলে তারা শিশুদের আড়ালে রাখে অথবা ট্রেনি বা হেলপার নাম দিয়ে তাদের শ্রমকে বৈধ দেখানোর চেষ্টা করে।

তবে এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। দরিদ্র পরিবারে স্কুলে যাওয়ার চেয়ে কাজ করা বেশি লাভজনক মনে হয়, কারণ স্কুলে যাওয়ার পরও শিক্ষার বাস্তব সুবিধা বা চাকরির নিশ্চয়তা তারা দেখতে পায় না। শিক্ষাব্যবস্থা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শিশুবান্ধব না হলে শিশু শ্রম কমানো কঠিন। এখন প্রশ্ন হলো সরকার, সমাজ, শিল্পমালিক, আন্তর্জাতিক সংস্থা সবাই কি এই সমস্যাটি জানে? অবশ্যই জানে। শ্রম আইনেও শিশু শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। অনেক কারখানা শিশু শ্রমমুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু বাস্তবে এসব ব্যবস্থা প্রায়ই যথেষ্ট নয়। কারণ যে বড় চেইনে আমরা পোশাক তৈরি করি, সেই চেইনের নিচের স্তরে—সাব-কন্ট্রাক্টর, ছোট কারখানা, বাসাভিত্তিক ওয়ার্কশপ এসব জায়গায় নজরদারি দুর্বল। আর সেখানেই শিশু শ্রম সবচেয়ে বেশি ঘটে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমাগত মূল্যহ্রাসের প্রতিযোগিতা চলছে। বিদেশি ক্রেতারা কম দামে পোশাক চায়; ফলে অনেক কারখানা মালিক খরচ কমানোর চেষ্টা করে, আর এর ফলে শ্রমিকদের মজুরি কম থাকে, কাজের পরিবেশ অনিয়মিত হয়, আর শিশু শ্রমের মতো অনৈতিক পদ্ধতি লালিত হয়। অর্থাৎ, বৈশ্বিক অর্থনীতির চাপও এই সমস্যা বাড়ায়।

এ অবস্থায় সমাধান কী? প্রথমত, দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা বাড়াতে হবে শিক্ষাবৃত্তি, স্কুলে বিনামূল্য মধ্যাহ্নভোজন, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, বিকল্প আয়ের পথ এসব বাস্তবে সম্প্রসারিত করতে হবে। একজন মা যদি তার সন্তানের পড়াশোনার খরচ নিয়ে চিন্তামুক্ত থাকেন, তবে তিনি কখনোই তাকে কারখানায় পাঠাবেন না। দ্বিতীয়ত, কারখানা মালিকদের কঠোরভাবে আইন মানাতে হবে। শুধু বড় কারখানা নয়, ক্ষুদ্র ও অনিবন্ধিত ইউনিটগুলোকেও নিয়মের আওতায় আনতে হবে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে তাদের শুধু শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিলেই হবে না, বরং স্বচ্ছ উৎপাদন চেইন তৈরি করতে হবে। তারা কম মূল্যে পোশাক কিনলে কারখানা মালিকদের ওপর চাপ পড়ে, এবং সেই চাপের ফল শিশু শ্রমে গিয়ে ঠেক।

ব্র্যান্ডগুলোর উচিত ন্যায্য বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করা।

চতুর্থত, আমাদের সমাজের ভূমিকা। আমরা যতদিন শিশু শ্রমকে স্বাভাবিক বা অপরিহার্য সমস্যা মনে করব, ততদিন এ সমস্যা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ এ কথা শুধু বক্তৃতায় বলা নয়, বাস্তবেও মানতে হবে।

পোশাক শিল্পে শিশু শ্রম বন্ধ করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয় এটি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রয়োজনও। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু এর ওপর নির্ভর করে। একবার যদি কোনো বড় ব্র্যান্ড শিশু শ্রমের অভিযোগে চুক্তি বাতিল করে, তাহলে হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই আমাদের স্বার্থেই এই সমস্যা দূর করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে শিশুরা শ্রমিক নয়, তারা ভবিষ্যতের নাগরিক। তাদের হাতের সুঁই-সুতা বা ভারী বস্তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বই-খাতা, খেলাধুলা, নিরাপদ ঘুম ও স্বপ্ন দেখার সুযোগ। একটি দেশ তখনই উন্নত হয়ে ওঠে, যখন তার শিশুরা ভয়ের মধ্যে নয়, সম্ভাবনার মধ্যে বেড়ে ওঠে।

পোশাক শিল্প আমাদের গর্বের জায়গা কিন্তু সেই গর্ব অপূর্ণ থাকবে যদি এর নিচে শিশু শ্রমের অন্ধকার লুকিয়ে থাকে। শৈশবের বিনিময়ে অর্জিত উন্নয়ন কোনো উন্নয়ন নয়; এটি দুঃখ, বেদনা ও শোষণের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা ভঙ্গুর অট্টালিকা। তাই এখনই সময় এই অন্ধকার দূর করার। শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দেওয়া শুধু দায়িত্ব নয় এটি মানবিকতার মৌলিক শপথ। আমরা যদি সত্যিই উন্নত ভবিষ্যৎ চাই, তবে প্রতিটি শিশুকে তার স্বপ্ন ফেরত দিতে হবে কারখানার শব্দ থেকে দূরে, নিরাপদ স্বপ্নের আকাশে।

আরশী আক্তার সানী

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়