গণমাধ্যমের ওপর ‘পা’ উঠলে রাষ্ট্র দাঁড়াবে কীভাবে?

এম মহাসিন মিয়া

প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক- তা বোঝা যায় সে রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের অবস্থান দেখে। যেখানে সাংবাদিক স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারেন, তথ্য অনুসন্ধান করতে পারেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার তুলে ধরতে পারেন- সেখানেই গণতন্ত্র কার্যকর থাকে।

কিন্তু যখন সেই গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত হন, শারীরিকভাবে আক্রান্ত হন, এমনকি কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পুলিশের হেফাজতে থাকা আসামি কর্তৃকও লাথির শিকার হন- তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, রাষ্ট্রের ভিত কোথাও মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি বরিশালে দুর্নীতির দায়ে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বিআরটিএ’র সাবেক বিতর্কিত সহকারী পরিচালক শাহ আলম কর্তৃক দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের লাথি মারার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক আচরণ নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এক ধরনের ঔদ্ধত্য, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এবং দুর্নীতিবাজ মানসিকতার প্রকাশ। এই ঘটনা প্রমাণ করে- এদেশে স্বাধীন ও সুষ্ঠু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার পরিবেশ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।

দুর্নীতিবাজদের প্রধান বাধা গণমাধ্যম : দুর্নীতি ও অনিয়ম যেখানেই বাসা বাঁধে, সেখানেই গণমাধ্যম হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শত্রু। কারণ সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, নথি খোঁজেন, অসঙ্গতি তুলে ধরেন এবং জনস্বার্থে সত্য প্রকাশ করেন। এ কারণেই দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রভাবশালী মহলের চোখে সাংবাদিকরা হয়ে ওঠেন- অস্বস্তিকর, বিপজ্জনক কিংবা শত্রু। শাহ আলমের আচরণ সেই চিরাচরিত বাস্তবতারই নগ্ন প্রতিফলন। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত, কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা যখন সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি গণমাধ্যমকে ভয় দেখানোর, প্রশ্নহীন পরিবেশ তৈরি করার একটি প্রবণতার অংশ। শাহ আলমণ্ড একাধিক জেলার দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি: বিআরটিএ’র সাবেক সহকারী পরিচালক শাহ আলমের নাম দুর্নীতির সঙ্গে আজ বা গতকাল জড়ায়নি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ এবং ভয়াবহ। বরিশাল বিআরটিএ কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে ৩৪৪টি বাস ও ট্রাকের ভুয়া রেজিস্ট্রেশন প্রদান, ঝালকাঠিতে ৯৩৩টি এবং পিরোজপুরে ১,০৮১টি বাস ও ট্রাকের ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের অভিযোগ রাষ্ট্রীয় নথিতেই লিপিবদ্ধ। এ ধরনের অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক দুর্নীতি নয়; এটি সড়ক নিরাপত্তা, জনজীবনের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্বের ওপর সরাসরি আঘাত। ভুয়া বা অসংগতিপূর্ণ রেজিস্ট্রেশন মানেই অযোগ্য, অনিরাপদ যানবাহন সড়কে নামার সুযোগ পাওয়া- যার পরিণতি প্রাণহানি পর্যন্ত হতে পারে।

২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বরিশাল বিআরটিএ এবং ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিআরটিএতে সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় ৯০০ থেকে ১,০০০ অবৈধ গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ২০২২ সালে তাকে পুনরায় বরিশাল বিআরটিএতে যোগদানের সুযোগ দেওয়া হয়- যা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার চরম ব্যর্থতার উদাহরণ। তদন্ত কমিটি- দায় এড়ানোর পুরোনো কৌশল: তথ্যমতে, ২০২২ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর- মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে শাহ আলম ২৫৫টি গাড়ি অবৈধ ও অসংগতিপূর্ণভাবে রেজিস্ট্রেশন দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই তদন্তের পর কী হয়েছে? তদন্ত কমিটি গঠন কি দুর্নীতি বন্ধের কার্যকর হাতিয়ার, নাকি সময়ক্ষেপণের কৌশল? বাস্তবতা হলো, তদন্ত চলাকালীন ও পরবর্তী সময়েও শাহ আলমের অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ হয়নি। এতে স্পষ্ট হয়- সমস্যা শুধু একজন কর্মকর্তার নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার।

কারাগার চত্বরে সাংবাদিক লাঞ্ছনা- আইনের শাসনের চরম অবমাননা: সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো- এই জঘন্য ঘটনা ঘটেছে বরিশাল কারাগারের চত্বরে, পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায়। কারাগার যেখানে আইনের শাসনের প্রতীক, সেখানে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি সাংবাদিকদের লাথি মারতে পারেন, তাহলে আইনের মর্যাদা কোথায় দাঁড়ায়? সাংবাদিকরা সেখানে ছিলেন তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে, কোনো উসকানি বা বেআইনি কর্মকাণ্ডে নয়। তাদের ওপর হামলা মানে জনগণের জানার অধিকারকে পদদলিত করা, রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়া।

রাষ্ট্রের নীরবতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি : বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ করা যায়- প্রথমে নীরবতা, পরে দায়সারা বক্তব্য, আর শেষ পর্যন্ত- তদন্তের আশ্বাস। এতে অপরাধীরা উৎসাহ পায়, আর সাংবাদিকরা আরও অনিরাপদ হয়ে পড়েন। রাষ্ট্র যদি এই ধরনের ঘটনায় কঠোর অবস্থান না নেয়, তবে বার্তা যায় একটাই- ক্ষমতাবানরা যা খুশি করতে পারে, আর গণমাধ্যমকে তার মূল্য দিতে হবে। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই দুর্নীতিকে আরও গভীরে প্রোথিত করে।

গণমাধ্যম দুর্বল হলে গণতন্ত্রও দুর্বল হয় : গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হওয়া মানে গণতন্ত্রের শ্বাসরোধ হওয়া। সাংবাদিকরা যদি ভয়ের কারণে সত্য প্রকাশ না করতে পারেন, তবে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার অদৃশ্য হয়ে যাবে না- বরং আরও ভয়ংকর রূপ নেবে। আজ সাংবাদিকদের লাথি মারা হচ্ছে, কাল হয়তো তাদের কলম ভাঙা হবে, পরশু কণ্ঠরোধ করা হবে। ইতিহাস বলে- এভাবেই ধীরে ধীরে একটি রাষ্ট্র অগণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ও সরকারের করণীয় অত্যন্ত স্পষ্ট- সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, শাহ আলমের মতো বিতর্কিত কর্মকর্তারা কীভাবে একাধিকবার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন- তার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন, সাংবাদিক সুরক্ষা আইন কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে- যাতে পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকরা নিরাপত্তা পান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে, কাগজে-কলমে নয়।

সর্বোপরি বলা যায়- গণমাধ্যমের ওপর “পা” তুলে দেওয়ার এই ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে- আমরা কোন পথে হাঁটছি? সাংবাদিকদের লাথি মারা মানে রাষ্ট্রের বিবেককে লাথি মারা। আজ যদি এই ঘটনার সঠিক বিচার না হয়, তবে আগামীকাল আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া আইনের শাসন শুধু স্লোগান হয়ে থাকে। দুর্নীতিবাজদের হাত শক্তিশালী হয়, আর সাধারণ মানুষের কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে যায়। রাষ্ট্র যদি সত্যিই গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করে, তবে এখনই সময়- গণমাধ্যমের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর। অন্যথায় ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে- গণমাধ্যম যখন লাথির শিকার হয়েছিল, তখন রাষ্ট্র কোথায় ছিল?

এম মহাসিন মিয়া

সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা