পেশাজীবীদের নৈতিক স্খলন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি উন্নত ও আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নাগরিকদের পেশাগত সততা ও নৈতিকতা। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে সবচেয়ে বড় সংকটের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পেশাগত অনৈতিকতা’। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি স্তরে আজ নৈতিকতার চরম অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, লোভ এবং সিস্টেমের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ নিজ নিজ পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছে, যার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।
নৈতিকতা হলো মানুষের অন্তরের সেই অদৃশ্য চালিকাশক্তি, যা তাকে ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে শেখায়। যখন কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো পেশায় নিয়োজিত হন, তখন সেই পেশার প্রতি তার কিছু দায়বদ্ধতা তৈরি হয়।
পেশাগত নৈতিকতা মানে কেবল কাজ শেষ করা নয়, বরং সততা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়পনিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করা। যখনই কোনো পেশাজীবী তার ব্যক্তিগত লাভকে জনস্বার্থের উপরে স্থান দেন, তখনই সেখানে নৈতিকতার স্খলন ঘটে। সেবা ও মানবতার মহান ব্রত নিয়ে যে চিকিৎসা পেশার যাত্রা, সেখানেও আজ বাণিজ্যের কালো ছায়া স্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অপ্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক টেস্টের মাধ্যমে রোগীদের পকেট কাটা হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করে প্রাইভেট ক্লিনিকে সময় দেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লিখতে কমিশন নেওয়া এখন ওপেন সিক্রেট। মুমূর্ষু রোগীকে আইসিইউতে আটকে রেখে ব্যবসা করার মতো ভয়াবহ অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। এই অনৈতিকতা শুধু একটি পেশার অবক্ষয় নয়, বরং এটি সরাসরি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে খেলা।
শিক্ষকরা হলেন জাতির বিবেক। কিন্তু বর্তমান সময়ে শিক্ষা বাণিজ্যের প্রসারে শিক্ষাগুরুর মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ। ক্লাসে ঠিকমতো না পড়িয়ে কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ার ঘটনাগুলো শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। যখন একজন শিক্ষক অনৈতিক পথে পা বাড়ান, তখন তার ছাত্ররাও আদর্শহীন হয়ে বেড়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, আমরা একটি মেধাবী প্রজন্ম পেলেও একটি নীতিবান প্রজন্ম পেতে ব্যর্থ হচ্ছি। দেশের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকৌশলীদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু পেশাগত নৈতিকতার অভাবে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার কিংবা পিচ ঢালাইয়ের কয়েকদিন পরেই রাস্তা ধসে পড়ার মতো ঘটনা নিয়মিত সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে। টেন্ডারবাজি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং প্রকল্পের বাজেট বাড়িয়ে আত্মসাৎ করার প্রবণতা জাতীয় সম্পদ অপচয় করছে এবং জনজীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। সরকারি দপ্তরে ঘুষ ছাড়া ফাইল না নড়া কিংবা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্যের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে সাধারণ মানুষ আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যখন রক্ষকই ভক্ষক হয়, তখন সাধারণ মানুষের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না। পেশাগত সততার অভাবে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হচ্ছে এবং সমাজে বৈষম্য বাড়ছে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমেও পেশাগত অনৈতিকতা ছড়িয়ে পড়ছে। হলুদ সাংবাদিকতা, ভুয়া খবর প্রচার এবং কোনো পক্ষকে সুবিধা দিতে তথ্য গোপন করার প্রবণতা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করছে। সত্যের সন্ধানে যে কলম লড়ার কথা ছিল, তা অনেক সময় ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। পেশায় নৈতিকতার অভাবের পেছনে প্রধানত কাজ করে দ্রুত ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, জবাবদিহিতার অভাব এবং কঠোর শাস্তির অনুপস্থিতি। এছাড়া ধর্মীয় ও পারিবারিক শিক্ষার অভাবও এর জন্য দায়ী। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন ‘সিস্টেম’ বা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন।
প্রতিটি পেশায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অনৈতিক কাজের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া পাঠ্যপুস্তকে নৈতিকতা শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
পেশাগত নৈতিকতা কোনো চাপিয়ে দেওয়া বিষয় নয়, এটি অন্তরের সংস্কার। একজন মানুষ যখন তার কাজকে উপাসনা মনে করবেন এবং নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন, তখনই সমাজ থেকে অনৈতিকতা দূর হবে। অর্থ ও প্রতিপত্তি সাময়িক সুখ দিতে পারে, কিন্তু পেশাগত সততা একজন মানুষকে অমরত্ব দান করে।
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে প্রতিটি পেশায় নৈতিকতার জয়গান গাইতে হবে। অন্যথায়, বাহ্যিক চাকচিক্য বাড়লেও সমাজ ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়বে।
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
