ইরানে ধেয়ে আসছে জায়নবাদী-মার্কিন হানাদার
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান ও সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর যে নব্য-উপনিবেশবাদী ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে, তা শুধু একটি ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়, বরং এটি মানব ও ইসলামি সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যখনই কোনো মুসলিম রাষ্ট্র স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও সার্বভৌমত্বের পথে হেঁটেছে, তখনই জায়নবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সম্মিলিতভাবে তাদের টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা করেছে। আজকের ইরান সেই একই পরিস্থিতির সম্মুখীন। এই সংকটময় মুহূর্তে মুসলিম বিশ্বের ভূমিকা শুধু মৌখিক নিন্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং সমাজতাত্ত্বিক, বৈজ্ঞানিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং সামরিক- প্রতিটি স্তরে একটি অভিন্ন প্রাচীর গড়ে তোলা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে আমাদের এমন এক চেতনার জন্ম দিতে হবে যেখানে ‘বাঁচলে সবাই একসঙ্গে বাঁচবো, মরলে সবাই একসঙ্গে’- এই আদর্শই হবে মূল চালিকাশক্তি।
মুসলিম বিশ্বের প্রথম এবং প্রধান পদক্ষেপ হতে হবে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি)-কে একটি সক্রিয় সামরিক ও রাজনৈতিক জোটে রূপান্তর করা। শুধুমাত্র বার্ষিক সম্মেলন বা কাগুজে বিবৃতির দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন সময় এসেছে ওআইসি-র অধীনে একটি ‘ইসলামিক জয়েন্ট কমান্ড সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করার, যা ন্যাটোর আদলে কাজ করবে। যদি ইরানের আকাশসীমায় কোনো বিদেশি যুদ্ধবিমান প্রবেশ করে, তবে তা যেন রিয়াদ, কায়রো বা আঙ্কারার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হয়। এই ধরনের সামরিক একতা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেবে। যখন একটি শক্তি জানবে যে তারা শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে লড়ছে না, বরং ৫৭টি রাষ্ট্রের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে, তখন তাদের আগ্রাসী মনোভাবে চির ধরা স্বাভাবিক।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ময়দানে আমাদের নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা এবং আল্লামা ইকবালের ‘খুদি’ বা আত্মোপলব্ধির দর্শনকে পুনরায় জাগ্রত করতে হবে। ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ বা ‘উদ্বোধন’ কবিতার প্রতিটি পঙক্তি আজ ইরানি ও মুসলিম তরুণদের রক্তে নাচন ধরানোর জন্য যথেষ্ট। পশ্চিমা মিডিয়া ইরানকে একটি ‘আক্রমণাত্মক’ রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করে যে বয়ান তৈরি করেছে, তাকে ছিন্নভিন্ন করতে আমাদের নিজস্ব গ্লোবাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। শত্রুর প্রধান অস্ত্র হলো ভয় এবং বিভ্রান্তি; এই দুইয়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইকবালের সেই দর্শন প্রচার করতে হবে যে, মুমিন কখনো অন্যের দাসত্ব কবুল করে না। এই মনস্তাত্ত্বিক জয়ই হবে যুদ্ধের অর্ধেক বিজয়।
অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রাকৃতিক সম্পদকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি। মুসলিম দেশগুলো যদি ঐক্যবদ্ধভাবে ঘোষণা করে যে, ইরানের ওপর কোনো প্রকার সামরিক আঘাত আসলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে, তবে পশ্চিমা অর্থনীতির মেরুদণ্ড ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে পড়বে। এটি কোনো নিছক হুমকি নয়, বরং এটি একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা যে আজ অবধি পশ্চিমা সভ্যতা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। তাদের পণ্য বর্জন এবং তাদের মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব ‘ইসলামিক গোল্ডেন দিনার’ বা ডিজিটাল কারেন্সির প্রচলন করা গেলে পশ্চিমা আধিপত্যের মূলে কুঠারাঘাত করা সম্ভব। সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলোর আকাশসীমা এবং ভূখণ্ডকে শত্রুর জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো শুধু ওই দেশগুলোর জন্য নয়, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর নিরাপত্তার জন্য হুমকি। প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্রের উচিত তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এই ঘাঁটিগুলো বন্ধ করে দেওয়া অথবা সেগুলোকে অকার্যকর ঘোষণা করা। ইরানের চারপাশের রাষ্ট্রগুলো যদি তাদের আকাশসীমা ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘না’ বলে দেয়, তবে কোনো দূরপাল্লার আক্রমণ পরিচালনা করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। ভূ-রাজনৈতিক এই অবস্থানটিই হবে ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা বর্ম।
বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে মুসলিম বিশ্বকে একটি সম্মিলিত গবেষণাগারে পরিণত হতে হবে। তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি, ইরানের মিসাইল সক্ষমতা এবং অন্যান্য মুসলিম দেশের সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একত্রিত করে একটি ‘প্যান-ইসলামিক ডিফেন্স নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক যুদ্ধ এখন আর শুধু তলোয়ার বা কামানের নয়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার স্পেসের যুদ্ধ। মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের একত্রিত করে এমন সব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে যা শত্রুর রাডার ব্যবস্থা এবং পরমাণুবাহী রণতরীগুলোকে মাঝসমুদ্রেই অকেজো করে দিতে সক্ষম। শক্তির বিপরীতে অধিকতর বৈজ্ঞানিক শক্তি প্রদর্শনই পারে আগ্রাসনের পথ রুদ্ধ করতে। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বকে ইরান ও মুসলিম বিশ্বের চূড়ান্ত তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। যদি আগ্রাসন অনিবার্য হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ববাণিজ্যের শ্বাসরোধ করে দিতে হবে। এটি একটি কঠোর সিদ্ধান্ত হলেও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এর বিকল্প নেই।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন, লেখক ও প্রাবন্ধিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল
