ধূমপানের বিষবাষ্পে বিপন্ন তারুণ্য

চাই এখনই কঠোর প্রতিরোধ

প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম এক নীরব ঘাতকের নাম ধূমপান। এটি শুধু একটি বদভ্যাস নয়, বরং একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি যা তিল তিল করে নিঃশেষ করে দিচ্ছে আমাদের আগামীর সম্পদ- যুবসমাজকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর বিশ্বে কয়েক মিলিয়ন মানুষ তামাকজনিত রোগে অকালে প্রাণ হারায়। উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশে এই মৃত্যুর মিছিলে তরুণদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। যে তরুণদের কাঁধে উন্নত রাষ্ট্র গঠনের গুরুদায়িত্ব, আজ তাদের একটি বড় অংশ তামাকের নীল নেশায় আসক্ত হয়ে নিজেদের জীবনীশক্তি নষ্ট করছে।

তরুণ প্রজন্মের ধূমপানে আসক্ত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ কাজ করে। প্রথমত, পরিবেশগত প্রভাব। বন্ধু-বান্ধব বা সমবয়সিদের পাল্লায় পড়ে কৌতূহলবশত অনেকেই প্রথম টানটি দেয়। অনেক ক্ষেত্রে তরুণরা মনে করে ধূমপান করা মানেই ‘স্মার্টনেস’ বা আধুনিকতা। দ্বিতীয়ত, পারিবারিক সচেতনতার অভাব। পরিবারের বড়দের দেখে অনেক সময় ছোটরা ধূমপানে উদ্বুদ্ধ হয়। আবার একাকিত্ব, বিষণ্ণতা বা পড়াশোনার চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি খুঁজতেও অনেকে তামাকের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া সিনেমা বা নাটকে ধূমপানকে বীরত্ব বা আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা তরুণ মনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে।

ধূমপান শুধু ফুসফুসের ক্যান্সারই নয়, বরং শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ধ্বংস করে দেয়। তামাকের ধোঁয়ায় থাকা নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড এবং টার সরাসরি রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এবং হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে- ফুসফুস, মুখগহ্বর, গলা এবং পাকস্থলীর ক্যান্সারের প্রধান কারণ ধূমপান। এটি ব্রঙ্কাইটিস এবং এমফিসিমার মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। ধূমপান সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ ও অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো পরোক্ষ ধূমপান। একজন ব্যক্তি ধূমপান করলে তার আশপাশের নিরপরাধ মানুষগুলোও সমানভাবে ক্ষতির শিকার হয়। ঘরের শিশু বা গর্ভবতী মায়েরা এতে সবথেকে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন।

ধূমপান শুধু স্বাস্থ্যগত ক্ষতিই করে না, এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক অপচয়ও বটে। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের কোনো তরুণ যখন নেশায় আসক্ত হয়, তখন পরিবারের আয়ের একটি বড় অংশ ধোঁয়ায় উড়ে যায়। পরবর্তীতে যখন এই তরুণ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন তার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। দেশের উৎপাদনশীল যুবশক্তি যখন অসুস্থতায় পঙ্গু হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্র হারায় তার চালিকাশক্তি।

সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মাঝে ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অনেক কোম্পানি একে ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে প্রচার করলেও এটি মূলত একটি নতুন ফাঁদ। ই-সিগারেটের কেমিক্যালগুলো ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। অনেক তরুণ মনে করে এটি নেশা নয়, বরং ফ্যাশন; যা তাদের ধীরে ধীরে কঠিন মাদকের পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই ভয়াবহতা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে শুধু আইন দিয়ে কাজ হবে না, প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন।

সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে মিশছে- সেদিকে অভিভাবকদের তীক্ষণ্ণ নজর রাখতে হবে। পরিবারের কেউ সন্তানের সামনে ধূমপান করবেন না। স্কুল-কলেজে নিয়মিত তামাকবিরোধী প্রচার ও কাউন্সেলিং করতে হবে। তামাকের কুফল সম্পর্কে পাঠ্যপুস্তকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩০০ গজের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করা এবং পাবলিক প্লেসে ধূমপানের জরিমানা বাড়ানো দরকার। তামাকের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ করতে হবে যাতে এটি সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যায়। সিনেমা বা নাটকে ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। তারকারা যেন এই বিষকে কোনোভাবেই উৎসাহিত না করেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তরুণরা একটি জাতির মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ড যদি তামাকের বিষে ক্ষয়ে যায়, তবে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ধূমপানমুক্ত সমাজ গঠন এখন আর শুধু স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় দাবি। আসুন, আমরা আমাদের তরুণদের হাতে তামাকের বদলে বই আর খেলার সামগ্রী তুলে দিই। তাদের স্বপ্ন দেখতে শেখাই, ধোঁয়ায় স্বপ্ন বিলীন করতে নয়। আজ যদি আমরা কঠোর না হই, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।