বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ যখন পশ্চিমের পকেটে
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি রূঢ় সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে- পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণরেখা মূলত পশ্চিমা বিশ্বের হাতে। গত কয়েক শতাব্দী ধরে শিল্প বিপ্লব, উপনিবেশবাদ এবং পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা (বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে আসছে। অর্থনীতি থেকে শুরু করে সংস্কৃতি, এমনকি আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নেও তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কি বিশ্বকে সুশৃঙ্খল করছে, নাকি তৈরি করছে নতুন কোনো সংকট।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্ব দুই মেরুতে বিভক্ত হলেও স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বর্তমানে ন্যাটো (NATO)-র মতো সামরিক জোটের মাধ্যমে পশ্চিমারা বিশ্বের নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশল নিয়ন্ত্রণ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার অস্থিরতা- সবখানেই পশ্চিমা শক্তির পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সংকট নিরসনে বা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পশ্চিমা দেশগুলোর অনুমোদন বা হস্তক্ষেপ আজ এক প্রকার অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি এখনও পশ্চিমাদের পকেটে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর মতো সংস্থাগুলোর নীতি মূলত পশ্চিমা স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়। তার ওপর রয়েছে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র রাজত্ব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অধিকাংশ লেনদেন ডলারে হওয়ার কারণে যেকোনো দেশের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা (Sanction) প্রদানের ক্ষমতা পশ্চিমাদের হাতে ন্যস্ত। উন্নত প্রযুক্তির স্বত্ব বা পেটেন্ট এবং বৈশ্বিক পুঁজি বাজারের সিংহভাগ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে এখনও তাদের ওপর নির্ভরশীল।
একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবী যার তথ্য তার। আধুনিক এই ডিজিটাল বিপ্লবের পুরোটাই পশ্চিমা বিশ্বের আবিষ্কার। গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল কিংবা মাইক্রোসফটের মতো টেক জায়ান্টগুলো শুধু ব্যবসা করছে না, তারা বিশ্ববাসীর চিন্তা ও তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা- সবখানেই পশ্চিমারা নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা- সবই কোনো না কোনোভাবে পশ্চিমা সার্ভারে জমা হচ্ছে, যা তাদের হাতে এক অদৃশ্য কিন্তু প্রচণ্ড শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দিয়েছে।
পশ্চিমাদের সবচেয়ে বড় জয় হলো তাদের সাংস্কৃতিক বিস্তার। হলিউড সিনেমা, ইংরেজি ভাষা এবং পশ্চিমা পোশাক-আশাক আজ বিশ্বজনীন। একে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘কালচারাল ইম্পেরিয়ালিজম’ বা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ বলে অভিহিত করেন। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের তরুণ প্রজন্ম আজ পশ্চিমা জীবনধারার প্রতি আকৃষ্ট। তাদের খাবার, ফ্যাশন এবং বিনোদন মাধ্যমগুলো স্থানীয় সংস্কৃতিকে গ্রাস করে নিচ্ছে। এই ‘সফট পাওয়ার’ ব্যবহার করে তারা সহজেই অন্য দেশের জনগণের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হচ্ছে।
জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে পশ্চিমা দেশগুলোর ভেটো ক্ষমতা বা প্রভাব প্রশ্নাতীত। তবে অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ‘দ্বিমুখী নীতি’ বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের অভিযোগ ওঠে। নিজেদের স্বার্থে তারা মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কথা বললেও, অন্য অনেক স্থানে একই সমস্যা নিয়ে তারা নীরব থাকে। আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থা ও আইন অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চিমাদের প্রতি নমনীয় বলে সমালোচকরা মনে করেন। এই বৈষম্য বিশ্বজুড়ে এক ধরনের ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। পৃথিবী আজ পশ্চিমাদের হাতে থাকলেও, এই একক আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার সামরিক দৃঢ়তা এবং ভারত ও ব্রাজিলের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট (যেমন- BRICS) বিশ্বকে আবারও বহুমেরুকেন্দ্রিক (Multipolar) ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তির বাজারে চীনের ভাগ বসানো এবং বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার চিন্তা পশ্চিমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা কাঠামোগতভাবে এখনও পশ্চিমাদের হাতেই বন্দি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ক্ষমতার এই ভারসাম্য পরিবর্তিত হওয়া অনিবার্য। পৃথিবী আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিমা শক্তির একক আধিপত্য কি বজায় থাকবে, নাকি এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্ম হবে যেখানে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সমান অংশীদারিত্ব থাকবে- তা সময়ই বলে দেবে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি মূলত ওয়াশিংটন, লন্ডন আর ব্রাসেলসের নিয়ন্ত্রণেই থাকছে।
