ডিম ছোড়ার রাজনীতি : ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ
ড. মো. আনোয়ার হোসেন, প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতির ময়দান যেমন উত্তপ্ত, তেমনি এর প্রতিবাদের ভাষাগুলোও বিচিত্র। কখনও মিছিলে স্লোগান, কখনও কালো পতাকা, আবার কখনও ঝাড়ু মিছিল। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে বস্তুটি সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব রাজনীতি ও বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রেক্ষাপটকে ‘সরগরম’ করে তুলেছে, সেটি হলো একটি নগণ্য পোল্ট্রি পণ্য- ডিম। আপাতদৃষ্টিতে একটি পুষ্টিকর খাদ্য উপাদান হলেও রাজনীতির মাঠে এর ভূমিকা এখন বিস্ফোরক। কেউ একে দেখছেন শোষিতের শেষ অস্ত্র হিসেবে, আবার কেউ একে দেখছেন গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের চূড়ান্ত অবক্ষয় হিসেবে। ডিম ছোড়া কি শুধু একটি তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে কোনো মনস্তাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার?
ডিম ছোড়ার ইতিহাস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে রোমান সাম্রাজ্যের দিনগুলোতে। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রকাশ্য জনসভায় কোনো বক্তার ওপর পচা ডিম বা সবজি ছোড়ার রীতি কয়েকশ বছরের পুরনো। মধ্যযুগীয় ইউরোপে অপরাধীদের যখন ‘পিলরি’ বা জনসমক্ষে বেঁধে রাখা হতো, তখন সাধারণ মানুষ তাদের ওপর পচা ডিম ছুড়ে ঘৃণা প্রকাশ করত। আধুনিক যুগে ব্রিটিশ রাজনীতিতে এটি একটি অলিখিত রীতিতে পরিণত হয়েছে। এমনকি খোদ উইনস্টন চার্চিল থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের জনসন বা হ্যারল্ড উইলসন- সবাইকে কোনো না কোনো সময় এই ‘ডিম্ব-বর্ষণ’ সইতে হয়েছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নেই। কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে নির্বাচনি জনসভা, সবখানেই ডিম এখন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ডিম ছোড়া হলো এক ধরনের ‘সিম্বলিক ভায়োলেন্স’ বা প্রতীকী সহিংসতা। একজন মানুষ যখন অনুভব করে যে প্রচলিত গণতান্ত্রিক উপায়ে- যেমন ভোট বা আলোচনা- সে তার ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারছে না, তখন সে এমন কিছু বেছে নেয় যা প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে বড় কোনো আঘাত না দিলেও মানসিকভাবে চরমভাবে পর্যুদস্ত করে। ডিমের খোসা ভাঙার শব্দ এবং এর ভেতরের আঠালো তরল যখন একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তির দামি স্যুট বা পাঞ্জাবিতে লাগে, তখন সেটি তার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের চেয়ে বেশি তার ‘ইগো’ বা অহংবোধে আঘাত করে। এটি মূলত একটি ‘পাওয়ার গেম’, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ মুহূর্তের জন্য হলেও একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে জনসমক্ষে অসহায় করে তোলে।
সামাজিকভাবে ডিম ছুড়ে মারাকে চূড়ান্ত অপমান হিসেবে গণ্য করার পেছনে এর ‘অপরিছন্নতা’ একটি বড় কারণ। ডিমের ভেতরের অংশটি যখন শরীরে লাগে, তা শুধু নোংরাই করে না, বরং এক ধরনের উৎকট গন্ধ ছড়ায় যা সহজে যায় না। এই ‘দুর্গন্ধ’ মূলত সেই নেতার রাজনৈতিক আদর্শ বা আচরণের প্রতি জনসাধারণের ঘৃণার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি একটি সামাজিক বর্জনের প্রাথমিক ধাপ। যখন সমাজ কাউকে তার কর্মকাণ্ডের জন্য আদর্শিক স্তরে প্রত্যাখ্যান করে, তখন তার প্রতিফলন ঘটে এই ধরনের কাঁচা বা পচা ডিম ছোড়ার মাধ্যমে। এটি শিষ্টাচার লঙ্ঘনের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় তখন, যখন তা গণমানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের একটি শৈল্পিক বা নাটকীয় রূপ পায়।
বৈজ্ঞানিক ও বিবর্তনমূলক তত্ত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানুষের আদিম প্রবৃত্তি হলো কোনো কিছু ছুড়ে মেরে বিপদ তাড়ানো। কিন্তু‘ আধুনিক সভ্যতায় পাথর বা তীরের বদলে ডিম বেছে নেওয়া হয়েছে এর ‘অহিংস হিংস্রতা’র কারণে। ডিম ছুড়লে মানুষ মারা যায় না, কিন্তু লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিটি যে বিড়ম্বনায় পড়েন, তা তাকে জনসমক্ষে হাস্যস্পদ করে তোলে।
বিজ্ঞান বলে, হিউমিলিয়েশন বা অপমান মানুষের মস্তিষ্কের সেই অংশকে উদ্দীপ্ত করে যা শারীরিক ব্যথার সময় সক্রিয় হয়। ফলে একটি ডিম যখন কারও কপালে ফাটে, তখন তার মস্তিষ্কে যে যন্ত্রণার সংকেত যায়, তা কোনো লাঠির আঘাতের চেয়ে কম নয়। এটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ কৌশল, যেখানে বুলেট ছাড়াই প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে রক্তাক্ত করা হয়।
রাজনীতিতে ডিম এখন একটি ‘ভাইরাল কন্টেন্ট’। ডিজিটাল যুগে যে কোনো বড় নেতার গায়ে ডিম পড়ার দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ডিম ছোড়ার উদ্দেশ্য শুধু প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি একটি প্রচারণামূলক স্ট্যান্টে পরিণত হয়।
গণমাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য ডিমের চেয়ে সহজলভ্য আর কিছু নেই। এর মাধ্যমে হামলাকারী রাতারাতি বীর বনে যান একাংশের কাছে। এই ভাইরাল হওয়ার সংস্কৃতি ডিম ছোড়াকে একটি সস্তা অস্ত্রে রূপান্তরিত করেছে, যা অনেক সময় মূল রাজনৈতিক ইস্যু থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেয়।
আদালত প্রাঙ্গণে ডিম ছোড়ার ঘটনাগুলো আইনি ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের চরম অনাস্থার প্রতীক। যখন বিচারপ্রার্থী বা সাধারণ মানুষ মনে করে যে ন্যায়ের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বেশি কাজ করছে, তখন তারা আদালতের পবিত্রতা ভুলে গিয়ে ডিমের আশ্রয় নেয়। এটি বিচারিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে। আইন অনুসারে এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও, অনেক সময় এর বিচার হয় না। এতে আইনের শাসনের পরিবর্তে পেশিশক্তির জয়জয়কার শুরু হয়। আদালত প্রাঙ্গণে ডিম ছোড়া মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে অপমান করা নয়, বরং দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর ডিমের প্রলেপ লাগিয়ে দেওয়া, যা দীর্ঘমেয়াদে বিচারিক মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে।
নির্বাচনি প্রচারণায় ডিম ছোড়া এখন একটি ভীতিকর সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ভোটারদের মুখোমুখি হওয়া বা জনসভা করা যখন কোনো প্রার্থীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো নেই। ডিম ছোড়া অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে করানো হয় যাতে প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে অযোগ্য বা জনবিজিচ্ছন্ন প্রমাণ করা যায়।
খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকে দেখলে, ডিম ছোড়া একটি চরম অপচয়। ডিম ছোড়ার এই সংস্কৃতি এক ধরনের ‘এলিটিস্ট’ বা সুবিধাবাদী মানসিকতারও পরিচয় দেয়, যেখানে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সম্পদ নষ্ট করাকে তুচ্ছ মনে করা হয়। অথচ একটি ডিমের পেছনে যে শ্রম এবং উৎপাদন খরচ জড়িয়ে থাকে, তা রাজনৈতিক হঠকারিতার কারণে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
ডিম ছোড়া শুধু ডিমেই সীমাবদ্ধ থাকবে কিনা, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আজ যা ডিম, কাল তা পাথর বা আরও মারাত্মক কিছু হতে পারে। ফলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে এটি একটি অ্যালার্ম বেল। ডিম ছোড়ার ঘটনাগুলো নিরাপত্তা বাহিনীকে আরও কঠোর হতে বাধ্য করে, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরায় বাধা সৃষ্টি করে। এতে জনগণের সাথে নেতার দূরত্ব আরও বেড়ে যায়, যা গণতান্ত্রিক সংযোগের জন্য মোটেও সুখকর নয়।
বিদ্বেষমূলক রাজনীতির বিস্তারে ডিম একটি জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। যখন এক রাজনৈতিক দল অন্য দলের নেতাকে ডিম ছুড়ে অপমান করে, তখন শুরু হয় ‘প্রতিশোধমূলক রাজনীতি’। আজ আপনার নেতাকে ডিম মারা হয়েছে, কাল আমাদের কর্মীরা আপনাদের নেতাকে পচা ডিমে চুবিয়ে ছাড়বে- এই মানসিকতা রাজনৈতিক সৌজন্যবোধকে বিনাশ করছে। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পেশিশক্তির চর্চা বাড়ে। ডিম ছোড়াকে ‘হিরোইজম’ বা বীরত্ব হিসেবে প্রচার করার ফলে সহিংসতাকে রোমান্টিকীকরণ করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছে, যারা মতপার্থক্য মেটানোর জন্য সংলাপের চেয়ে প্রক্ষিপ্ত বস্তুর ওপর বেশি ভরসা করে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। কেউ কেউ দাবি করেন, যখন স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে বা একদলীয় আধিপত্যে মানুষের কণ্ঠরোধ করা হয়, তখন ডিম ছোড়া হলো একটি ‘সেফটি ভালভ’। এটি জনগণকে তাদের ক্ষোভ একটি অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর উপায়ে প্রকাশের সুযোগ দেয়। যদি এই সুযোগটুকুও না থাকত, তবে ক্ষোভ হয়তো আরও হিংস্র কোনো রূপ নিত। কিন্তু এই যুক্তি কতটুকু ধোপে টিকে? একটি সভ্য সমাজে প্রতিবাদের ভাষা কি শুধুই ‘অপরিচ্ছন্ন’ হতে হবে? সুস্থ রাজনীতিতে পোস্টার, লিফলেট, ব্যঙ্গচিত্র বা শান্তিপূর্ণ সমাবেশই কি যথেষ্ট নয়? ডিম ছোড়া আসলে প্রতিবাদের বিকল্প নয় বরং প্রতিবাদের বিকৃতি।
ডিম ছোড়ার মত নাটকীয়তা অনেক সময় মূল সংকটকে আড়াল করে দেয়। দেশের অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি বা দুর্নীতির মতো বড় বড় ইস্যুগুলো চাপা পড়ে যায় ‘অমুক নেতাকে ডিম মারা হয়েছে’- এই হেডলাইনের নিচে। গণমাধ্যমও অনেক সময় এই রসালো সংবাদ পরিবেশনে ব্যস্ত থাকে, ফলে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অবহেলিত থেকে যায়।
