নির্মাণকাজে অবহেলাজনিত মৃত্যুর দায় কার

প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের অগ্রগতির দৃশ্যমান প্রতিফলন ঘটে তার অবকাঠামোগত উন্নয়নে। চারিদিকে মাথা তুলে দাঁড়ানো বহুতল ভবন, ফ্লাইওভার আর মেগা প্রকল্পগুলো আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার জানান দেয়। কিন্তু এই উন্নয়নের চাকচিক্যের নিচে যখন শ্রমিকের রক্ত কিংবা সাধারণ পথচারীর প্রাণ ঝরে পড়ে, তখন প্রশ্ন জাগে- এই উন্নয়ন কি জীবনের চেয়েও বড়? সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোতে নিরাপত্তা ঘাটতির কারণে প্রাণহানির ঘটনা যে হারে বাড়ছে, তাতে একে শুধু ‘দুর্ঘটনা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং এগুলো স্পষ্টতই ‘অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড’।

নির্মাণকাজে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে সবসময়ই নিরাপত্তার অভাবকে চিহ্নিত করা হয়। আইন অনুযায়ী, প্রতিটি নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের জন্য হেলমেট, সেফটি বেল্ট, বুট জুতা এবং নেটের ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। আবার পথচারীদের সুরক্ষায় ভারী নির্মাণ এলাকায় বেষ্টনী দেওয়া এবং সতর্কবার্তা প্রদর্শন করার কথা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে চিত্রটি পুরো ভিন্ন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, খরচ বাঁচাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তার সরঞ্জাম ছাড়াই শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামিয়ে দেয়। আকাশচুম্বী ভবনের মাচায় ঝুলে থাকা শ্রমিকের কোনো নিরাপত্তা দড়ি থাকে না, অথচ নিচে হাজার হাজার মানুষ চলাচল করছে। এই উদাসীনতা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন একে অপরের ওপর দোষ চাপানোর এক নোংরা খেলা শুরু হয়। মালিকপক্ষ দায় চাপায় ঠিকাদারের ওপর, ঠিকাদার দাবি করেন শ্রমিক অসতর্ক ছিল, আর তদারকি সংস্থাগুলো তদন্ত কমিটির দোহাই দিয়ে সময় পার করে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, এই মৃত্যুর দায় মূলত ত্রিপক্ষীয়-

ঠিকাদারি ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান : মুনাফার লোভে নিরাপত্তার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ সাশ্রয় করা তাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মানহীন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর দায় তাদেরই নিতে হবে।

তদারকি সংস্থা : রাজউক, সিটি কর্পোরেশন বা সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগগুলোর দায়িত্ব হলো নিয়মিত নির্মাণ সাইট পরিদর্শন করা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অর্থের বিনিময়ে বা প্রভাবের কারণে তারা নিরাপত্তা ত্রুটিগুলোকে এড়িয়ে যান। এই তদারকির অভাবই মূলত নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়।

আইনি সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োগের অভাব : বিদ্যমান আইনে অবহেলাজনিত মৃত্যুর জন্য যে শাস্তির বিধান রয়েছে, তা অনেক সময় অপরাধের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। আবার মামলা হলেও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ভুক্তভোগী পরিবার বিচার পায় না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সাহস পায়।

একটি নির্মাণাধীন ভবনের ওপর থেকে ইট পড়ে পথচারীর মৃত্যু কিংবা ক্রেন থেকে গার্ডার পড়ে পুরো পরিবারের সলিল সমাধি- এই দৃশ্যগুলো আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। প্রতিটি মৃত্যুর পর শোকের মাতম ওঠে, ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু সেই অর্থ কি একটি অমূল্য প্রাণের বিকল্প হতে পারে? শ্রমিকের জীবনের বিনিময়ে পাওয়া দালান কিংবা সাধারণ মানুষের লাশের ওপর দিয়ে চলা ফ্লাইওভার আধুনিক সভ্যতার কলঙ্ক ছাড়া আর কিছুই নয়। এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে আমাদের শুধু শোক প্রকাশ করলে চলবে না, প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহিতা।

জিরো টলারেন্স নীতি : প্রতিটি নির্মাণ প্রকল্পে ‘সেফটি ফাস্ট’ নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়া কোনো কাজ শুরু করার অনুমতি দেওয়া যাবে না।

কঠোর শাস্তি নিশ্চিতকরণ : নির্মাণে অবহেলার কারণে প্রাণহানি ঘটলে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারাদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাধীন তদারকি সেল : রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন সংস্থা গঠন করতে হবে যারা আকস্মিকভাবে নির্মাণ সাইটগুলো পরিদর্শন করবে এবং ত্রুটি পেলে তাৎক্ষণিক কাজ বন্ধ করে দেবে।

শ্রমিক ও পথচারীর বিমা : প্রতিটি নির্মাণ কাজের জন্য বাধ্যতামূলক বিমা ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে না পড়ে।

উন্নয়ন দরকার, কিন্তু তা মানুষের জীবনের বিনিময়ে নয়। একটি সভ্য সমাজে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। নির্মাণকাজে অবহেলাজনিত মৃত্যুকে ‘দুর্ঘটনা’ বলে আড়াল করার সংস্কৃতি বন্ধ করার এখনই সময়। আজ যদি আমরা এই অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আওয়াজ না তুলি এবং দায়ীদের কাঠগড়ায় না দাঁড়াই, তবে আগামীকালের শিকার আপনি বা আপনার পরিবারও হতে পারে। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে প্রতিটি ইট গাঁথা হবে নিরাপত্তার চাদরে, রক্তের কালিতে নয়।